প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসঝড়ের রাতে পিশাচ

গল্প ও উপন্যাস

ঝড়ের রাতে পিশাচ

ঝড়ের রাতে পিশাচ

রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা।

আকাশের অবস্থা বিকেল থেকেই খারাপ ছিল। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসটা আরও ভারী হয়ে উঠেছিল। মাঝে মাঝে দূরে কোথাও মেঘ গর্জে উঠছিল, তারপর কয়েক সেকেন্ডের জন্য চারপাশ একেবারে নিস্তব্ধ।

বিজ্ঞাপন

তারপর—

ঝলক!

আকাশের বুক চিরে বিদ্যুৎ চমকে উঠছিল।

সেই আলোয় গ্রামের কাঁচা রাস্তা, বাঁশঝাড় আর দূরের গাছগুলোকে কয়েক মুহূর্তের জন্য দেখা যাচ্ছিল। তারপর আবার অন্ধকার।

বৃষ্টি খুব বেশি ছিল না। ঝিরিঝিরি করে পড়ছিল। কিন্তু সেই বৃষ্টির সঙ্গে বাতাসের শব্দটা এমন ছিল যে, মনে হচ্ছিল কেউ যেন অন্ধকারের ভেতর দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে কথা বলছে।


মাহিন, টফি, হিমেল, আরাফাত, ফারুক আর মান্নান—ছয় বন্ধু।


সন্ধ্যার পর তারা সবাই মান্নানদের পুরোনো বাড়ির উঠানে বসেছিল। বাড়িটা গ্রামের একেবারে শেষ মাথায়। বাড়ির পেছনে একটা বিশাল বাঁশঝাড়, তার পরেই পুরোনো একটা পরিত্যক্ত কবরস্থান।

লোকজন জায়গাটাকে এড়িয়ে চলত।

কারণ, ওই কবরস্থান নিয়ে গ্রামের মানুষের মুখে একটা পুরোনো কথা প্রচলিত ছিল।

ওখানে রাতে একটা পিশাচ ঘোরে।

অবশ্য ছয় বন্ধুর কেউ এসব বিশ্বাস করত না।

ফারুক হেসে বলেছিল,

—“পিশাচ যদি সত্যিই থাকে, তাহলে এতদিনে তো আমাদের কাউকে খেয়ে ফেলত!”

টফি হেসে উঠেছিল।

—“পিশাচও তো মানুষ দেখে ভয় পায়!”

সবাই হেসেছিল।

শুধু মান্নান হাসেনি।

সে চুপচাপ বসে ছিল।

মাহিন খেয়াল করে বলল,

—“কী হলো তোর?”

মান্নান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—“তোরা হাসিস না। আমার দাদা ওই জায়গার কথা বলত।”

হিমেল বলল,

—“আবার শুরু করলি?”

মান্নান মাথা নাড়ল।

—“দাদা বলত, ঝড়ের রাতে ওই কবরস্থানের পাশ দিয়ে কেউ গেলে পেছন থেকে ডাক শুনতে পায়।”

আরাফাত বলল,

—“তারপর?”

মান্নান নিচু গলায় বলল,

—“পেছনে তাকালে... মানুষটাকে আর পাওয়া যায় না।”

কথাটা বলার পর হঠাৎ একটা প্রচণ্ড বজ্রপাত হলো।

ধড়াম!

সবাই চুপ।

তারপর আবার বৃষ্টি।

ঝিরিঝিরি...

ঝিরিঝিরি...

কিছুক্ষণ পর হিমেল উঠে দাঁড়াল।

—“আমি বাড়ি যাচ্ছি।”

ফারুক বলল,

—“এখন?”

—“হ্যাঁ। বেশি রাত করলে মা দরজা খুলবে না।”

মাহিনও উঠে দাঁড়াল।

—“চল, আমরাও যাই।”

ছয়জন একসঙ্গে বের হলো।

মান্নানদের বাড়ি থেকে মাহিনদের বাড়ি যেতে হলে কবরস্থানের পাশ দিয়ে যেতে হয়।

রাস্তাটা সরু।

একদিকে বাঁশঝাড়, অন্যদিকে ঝোপঝাড়।

বাতাসে বাঁশগুলো একে অপরের সঙ্গে ঘষা খেয়ে অদ্ভুত শব্দ করছিল।

শররর... শররর...

টফি হঠাৎ বলল,

—“শুনছিস?”

সবাই থেমে গেল।

—“কী?”

—“কেউ যেন হাঁটছে।”

কিছুক্ষণ সবাই কান পেতে রইল।

সত্যিই।

পেছনের দিক থেকে খুব আস্তে আস্তে শব্দ আসছে।

ছপ... ছপ... ছপ...

মনে হচ্ছিল কেউ ভেজা রাস্তার ওপর দিয়ে হাঁটছে।

মাহিন ঘুরে তাকাল।

কেউ নেই।

—“বৃষ্টির পানি,” মাহিন বলল।

ফারুক হেসে বলল,

—“তোদের পিশাচ এসে গেছে।”

কিন্তু মান্নান হাসল না।

সে বলল,

—“চল।”

সবাই হাঁটা শুরু করল।

কিছুদূর যাওয়ার পর আবার সেই শব্দ।

ছপ... ছপ... ছপ...

এবার শব্দটা আরও কাছে।

হিমেল ফিসফিস করে বলল,

—“পেছনে কেউ আসছে।”

আরাফাত বলল,

—“দৌড় দিবি?”

মাহিন বলল,

—“না। কেউ থাকলে থাকুক।”

ঠিক তখনই—

ঝলক!

বিদ্যুৎ চমকাল।


এক মুহূর্তের জন্য পুরো রাস্তা দিনের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল।

মাহিন সামনে তাকিয়েই ছিল।

আর সেই এক সেকেন্ডের আলোয় সে দেখল—

রাস্তার অনেক দূরে, কবরস্থানের পাশে একটা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।

লম্বা।

অস্বাভাবিক লম্বা।

মাথাটা নিচু।

আর তার দুটো হাত হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ঝুলে আছে।

বিদ্যুৎ নিভে গেল।

আবার অন্ধকার।

মাহিনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

—“ওখানে কে?”

কেউ উত্তর দিল না।

ফারুক বলল,

—“কোথায়?”

মাহিন আঙুল তুলে দেখাল।

—“ওখানে একজন দাঁড়িয়ে আছে।”

সবাই তাকাল।

অন্ধকার ছাড়া কিছু দেখা গেল না।

টফি বলল,

—“চল।”

এবার কেউ আর হাসছিল না।

ছয়জন দ্রুত হাঁটতে লাগল।

কিন্তু কিছুদূর যেতেই—

পেছন থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

খুব নিচু, কর্কশ একটা গলা।

—“মাহিন...”

মাহিন থেমে গেল।

তার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

কারণ গলাটা ছিল তার নিজের মায়ের গলা।

—“মাহিন... বাবা...”

হিমেল মাহিনের হাত চেপে ধরল।

—“পেছনে তাকাস না।”

মাহিন ফিসফিস করে বলল,

—“আমার মা তো বাড়িতে।”

মান্নান বলল,

—“আমি জানি।”

আবার ডাক এল।

এবার আরও কাছে।

—“মাহিন...”

কেউ পেছনে তাকাল না।

তারা হাঁটতেই থাকল।

তারপর কণ্ঠস্বর বদলে গেল।

এবার সেটা টফির মায়ের গলা।

—“টফি... দাঁড়া বাবা...”

টফির চোখ বড় হয়ে গেল।

সে প্রায় ঘুরেই যাচ্ছিল।

আরাফাত তাকে টেনে ধরল।

—“না!”


হঠাৎ পেছন থেকে একটা অদ্ভুত হাসির শব্দ এল।

হিহিহিহি...

তারপর—

একটা বিকট চিৎকার।

সবাই দৌড় দিল।

কিন্তু দৌড়ানোর মাঝখানে মাহিন হঠাৎ বুঝতে পারল—

তাদের সঙ্গে ছয়জন নয়...

পাঁচজন।

সে থেমে গেল।

—“ফারুক কোথায়?”

সবাই থামল।

ফারুক নেই।

হিমেল কাঁপা গলায় বলল,

—“ও তো আমার পেছনেই ছিল!”

মান্নান বলল,

—“না... ছিল না।”

—“মানে?”

মান্নান কিছু বলল না।

সে শুধু পেছনের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল।

দূরে কবরস্থানের পাশ থেকে ফারুকের গলা ভেসে এল।

—“এই! তোরা দাঁড়া!”

মাহিন চিৎকার করে বলল,

—“ফারুক! তুই কোথায়?”

—“আমি এখানে!”

গলাটা খুব স্বাভাবিক।

হিমেল বলল,

—“চল, ওকে নিয়ে আসি।”

মান্নান এবার তার হাত শক্ত করে ধরে বলল,

—“না।”

—“কেন?”

মান্নান কাঁপা গলায় বলল,

—“ওটা ফারুক না।”

সবাই চুপ।

ঠিক তখনই আবার বিদ্যুৎ চমকাল।

ঝলক!

দূরে কবরস্থানের পাশে একটা কালো অবয়ব দাঁড়িয়ে।

তার সামনে ফারুক।

ফারুক স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

আর তার ঠিক পেছনে—

একটা বিশাল কালো ছায়া।

ছায়াটার মাথা ফারুকের মাথার ওপর দিয়ে উঠে গেছে।

দুটো হাত ফারুকের কাঁধের ওপর।

মাহিন চিৎকার করে উঠল,

—“ফারুক! দৌড়!”

ফারুক ঘুরে তাকাল।

তার মুখ দেখা গেল।

কিন্তু সেটা ফারুকের মুখ ছিল না।

চোখ দুটো অস্বাভাবিক কালো।

মুখটা যেন কেউ অনেকক্ষণ ধরে টেনে রেখেছে।

তারপর সে হাসল।

খকখক...

একটা মানুষের মতো নয়।

একটা শুকনো, ভাঙা হাসি।

ফারুকের শরীরটা হঠাৎ পেছনের দিকে টেনে নেওয়া হলো।

সে চিৎকার করল—

—“মাহিন!”

তারপর অন্ধকার।

সবাই দৌড় দিল।

কেউ আর পেছনে তাকাল না।


সেই রাতের পর ফারুককে আর পাওয়া যায়নি।

গ্রামের মানুষ কবরস্থান, বাঁশঝাড়—সব জায়গায় খুঁজেছিল।

কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

শুধু কবরস্থানের শেষ মাথায় কাদার মধ্যে পাওয়া গিয়েছিল ফারুকের একটা স্যান্ডেল।

তারপর কয়েক মাস কেটে গেল।

সবাই ধীরে ধীরে ঘটনাটা ভুলে যেতে শুরু করল।

কিন্তু মাহিন ভুলতে পারেনি।

কারণ মাঝেমধ্যে গভীর রাতে তার ঘুম ভেঙে যেত।

জানালার বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি।

দূরে মেঘের গর্জন।

আর তখন সে শুনত—

ছপ... ছপ... ছপ...

কেউ যেন ভেজা রাস্তায় হাঁটছে।

তারপর জানালার বাইরে থেকে একটা গলা—

—“মাহিন...”

ফারুকের গলা।

এক রাতে মাহিন সাহস করে জানালার পর্দা সরিয়ে ফেলল।

বিদ্যুৎ ঠিক তখনই চমকাল।

ঝলক!

জানালার ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিল ফারুক।

কিন্তু তার মুখে কোনো চোখ নেই।

শুধু একটা বিশাল কালো ফাঁকা জায়গা।

আর ঠোঁটের কোণে সেই একই হাসি।


মাহিন চিৎকার করতে যাচ্ছিল।

ঠিক তখন ফারুক খুব আস্তে বলল—

—“তোরা পাঁচজন পালিয়ে গিয়েছিলি...”

এক মুহূর্ত থেমে সে বলল,

—“কিন্তু আমি একা ফিরিনি।”

তারপর বিদ্যুৎ নিভে গেল।

ঘর অন্ধকার।

মাহিন আর কোনো শব্দ শুনতে পেল না।

পরদিন সকালে তার ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল।

মাহিন বিছানায় বসে ছিল।

কিন্তু তার চুলগুলো পুরো ভেজা।

যেন সে সারারাত বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল।

আর তার ডান হাতের মুঠোয় ছিল—

একটা ভেজা, কালো মাটির দলা।

সেই মাটিতে ছোট করে আঁচড় কাটা ছিল একটা নাম—

“ফারুক”।

তার নিচে আরও পাঁচটা নাম।

মাহিন।

টফি।

হিমেল।

আরাফাত।

মান্নান।


সবশেষে একটা নাম তখনও ফাঁকা।

আর সেই ফাঁকা জায়গাটার নিচে লেখা ছিল—


“পরের ঝড়ের রাত।”


✍️------ নিষাদ ।।


০ মন্তব্য · ৪৬ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!