'ডিগবাজি' নামটা শুনলেই নিখিলেশ বাবুর বুকের ভেতরটা কেমন যেন গুড়গুড় করে ওঠে। এর কারণ অবশ্য শারীরিক কোনো কসরত নয়, বরং তার দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের কেরানির জীবনের শেষ দিনটি।
নিখিলেশ বাবু অবসর নিচ্ছেন। অফিস জুড়ে বিদায়ের একটা মৃদু সুর, টেবিলে রজনীগন্ধার তোড়া, আর কলিগদের মুখে হালকা প্রশংসা। নিখিলেশ বাবু সারাজীবন ফাইল আর নিয়মের আবর্তে বন্দী ছিলেন। টেবিলের ডান পাশ থেকে ফাইল বাম পাশে সরানো আর বড় সাহেবের হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মেলানো—এই ছিল তার জীবন। অফিসের সবাই তাকে ডাকত 'সোজা মানুষ' বলে। কারণ, সে কখনো নিয়মের বাইরে পা বাড়ায়নি, কোনো 'ডিগবাজি' দেয়নি।
কিন্তু বিদায়বেলার ঠিক আধ ঘণ্টা আগে, বড় সাহেব শাহেদ সাহেব তাকে নিজের রুমে ডাকলেন। শাহেদ সাহেব মানুষ হিসেবে বেশ ধুরন্ধর, প্রয়োজনে গিরগিটির মতো রঙ বদলাতে ওস্তাদ।
শাহেদ সাহেব চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বললেন, "নিখিলেশ বাবু, আপনার তো আজ শেষ দিন। যাওয়ার আগে এই বিশেষ ফাইলে একটা সই করে দিয়ে যান। পুরনো একটা অডিট রিপোর্ট, একটু এদিক-ওদিক আছে। আপনি সইটা করলে ঝামেলা মিটে যায়, আপনার অবসরের ফান্ডের টাকাটাও জলদি রিলিজ করে দেব।"
ফাইলটা দেখেই নিখিলেশ বাবুর মাথাটা ঘুরে গেল। আর্থিক জালিয়াতির ফাই। বড় সাহেব নিজের দোষটা নিখিলেশ বাবুর ঘাড়ে চাপিয়ে পার পেয়ে যেতে চাইছেন। আজ সই না করলে পেনশনের টাকা আটকে যাবে, আর সই করলে সারাজীবনের সততা ধুলোয় মিশে যাবে।
নিখিলেশ বাবু ফাইলে হাত না দিয়ে শান্ত গলায় বললেন, "স্যার, পঁয়ত্রিশ বছর সোজা পথে হেঁটেছি। আজ শেষ দিনে এসে ডিগবাজি খেতে পারব না।"
শাহেদ সাহেবের মুখটা কালো হয়ে গেল। তিনি হুমকি দিয়ে বললেন, "মনে রাখবেন নিখিলেশ বাবু, সোজা আঙুলে ঘি ওঠে না। এই যুগে যারা ডিগবাজি দিতে জানে না, তারা ছিটকে যায়। আপনার পেনশনের ফাইল কিন্তু আমার টেবিলেই পড়ে থাকবে!"
নিখিলেশ বাবু আর কোনো কথা না বলে রুম থেকে বেরিয়ে এলেন। বিদায় অনুষ্ঠান শেষ করে যখন তিনি গেট দিয়ে বের হচ্ছেন, তখন বুকটা বেশ হালকা লাগছিল। জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে তিনি অন্তত নিজের কাছে হেরে যাননি।

ঠিক তখনই তার ফোনে একটা মেসেজ এল। তার ব্যাংকের মেসেজ। পেনশনের পুরো টাকাটা তার অ্যাকাউন্টে ঢুকে গেছে! নিখিলেশ বাবু অবাক হয়ে ভাবলেন, এটা কীভাবে সম্ভব?
মোবাইলটা পকেটে পুরতেই পেছন থেকে তাদের অফিসের তরুণ অফিসার সায়মুল এসে হাত ধরল। সায়মুল ফিসফিস করে বলল, "স্যার, বড় সাহেব ভাবতেও পারেননি যে আজকের দিনটাই তার শেষ দিন হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গত এক মাস ধরে ওনার ওপর নজর রাখছিল। আপনি রুম থেকে বের হওয়ার ঠিক দশ মিনিট পর ওনার রুমে রেইড হয়েছে। উনি এখন দুদকের গাড়িতে!"
নিখিলেশ বাবু স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। শাহেদ সাহেব সারাজীবন অন্যদের ডিগবাজি খাইয়ে এসেছেন, কিন্ত উলোটপুরাণ ডিগবাজি খেল যে বড় সাহেব সোজা শ্রীঘরে চলে গেলেন।
নিখিলেশ বাবু রিকশায় উঠে বসলেন। বিকেলের নরম আলোয় তার মনে হলো, সততার পথটা হয়তো একটু আঁকাবাঁকা আর কঠিন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জীবনের আসল ডিগবাজিটা কিন্তু নিয়তিই খেলে দেয়।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!