প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসলাশকাটাঘর — একটি লোমহর্ষক ভৌতিক গল্প

গল্প ও উপন্যাস

লাশকাটাঘর — একটি লোমহর্ষক ভৌতিক গল্প

লাশকাটাঘর — একটি লোমহর্ষক ভৌতিক গল্প

রাত তখন প্রায় বারোটা। শহর থেকে অনেক দূরে, নদীর ধারে একটি পরিত্যক্ত বাড়ি—স্থানীয় মানুষের কাছে যার নাম ‘লাশকাটাঘর’।

কেউ জানত না বাড়িটির আসল ইতিহাস। শুধু শোনা যেত, বহু বছর আগে সেখানে এক জমিদার পরিবারের শেষ সদস্য মারা যাওয়ার পর বাড়িটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারপর থেকে মাঝরাতে ওই বাড়ির জানালায় আলো জ্বলত, আর ভেতর থেকে ভেসে আসত কারও কান্না।

বিজ্ঞাপন

রাফি এসব গল্পে বিশ্বাস করত না। এক বর্ষার রাতে সে বন্ধুর সঙ্গে বাজি ধরে বাড়িটির ভেতরে ঢোকার সিদ্ধান্ত নিল।

বাড়ির দরজা ঠেলতেই কড়কড়ে শব্দ হলো। ভেতরে ঘন অন্ধকার, দেওয়ালে ছত্রাক আর মেঝেতে ধুলোর আস্তরণ। ঘরের এক কোণে একটি পুরোনো আয়না দাঁড়িয়ে ছিল।

রাফি টর্চের আলো আয়নার ওপর ফেলতেই দেখল, তার পেছনে একজন বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন।

সে চমকে ঘুরে তাকাল।

কেউ নেই।

আবার আয়নার দিকে তাকাতেই বৃদ্ধটি আরও কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর চোখ দুটো অস্বাভাবিক কালো।

রাফি দ্রুত পেছনে সরে গেল। তখনই আয়নার ভেতর থেকে ক্ষীণ একটি কণ্ঠ ভেসে এল—

“এত দেরি করে এলে কেন?”

রাফির হাত থেকে টর্চ পড়ে গেল।

সে দরজার দিকে ছুটল। কিন্তু দরজা বন্ধ। যতই টানল, খুলল না।

ঠিক তখন পাশের ঘর থেকে কারও হাঁটার শব্দ শোনা গেল।

ধীরে ধীরে।

খস... খস... খস...

রাফি সাহস করে শব্দের দিকে এগোল। ঘরটির দরজা আধখোলা। ভেতরে একটি পুরোনো কাঠের টেবিল, তার ওপর একটি মরচে ধরা তালা আর একটি ছোট্ট লকেট।

লকেটটি হাতে নিতেই ঘরের বাতাস বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল।

দেওয়ালে ঝোলানো একটি ছবির দিকে তার চোখ আটকে গেল।

ছবিতে এক তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। গলায় ঠিক সেই লকেট।

আর ছবির নিচে লেখা—

“মৃত্যুর পরেও সে অপেক্ষা করে।”

হঠাৎ ছবির ভেতরের তরুণী চোখ মেলে তাকাল।

রাফি পিছিয়ে গিয়ে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।

ছবির তরুণী ধীরে ধীরে হাত তুলল। তার আঙুল সরাসরি রাফির পেছনের দিকে নির্দেশ করল।

রাফি কাঁপতে কাঁপতে ঘুরে দাঁড়াল।

তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে সেই বৃদ্ধ।

কিন্তু এবার বৃদ্ধের মুখে কোনো চোখ-মুখ নেই। শুধু একটি অন্ধকার গর্তের মতো শূন্যতা।

বৃদ্ধ ফিসফিস করে বললেন—

“তুমি তো আমার ছেলের মতো দেখতে...”

রাফি দৌড়ে পাশের জানালা দিয়ে বেরিয়ে গেল। কাঁটাঝোপে পড়ে হাত কেটে গেল, তবু সে থামল না।

বাড়ির বাইরে এসে সে হাঁপাতে হাঁপাতে পেছনে তাকাল।

লাসশকাটাঘরের সব জানালায় আলো জ্বলছে।

প্রতিটি জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন করে মানুষ।

তাদের মুখ নেই।

শুধু শেষ জানালায় দাঁড়িয়ে থাকা তরুণীটি হাত নেড়ে বলছে—

“আবার এসো... লকেটটা তো আমার কাছে রেখে গেলে।”

রাফি নিজের গলায় হাত দিল।

লকেটটি নেই।

তারপর সে বুঝতে পারল, যে লকেটটি সে ঘর থেকে তুলে নিয়েছিল, সেটি আসলে তার নিজের গলায় ঝুলছে।

আর লকেটের ভেতরের ছবিটি তার নিজের।

পরদিন সকালে গ্রামের লোকেরা রাফিকে বাড়ির সামনে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখল। তার হাতে শক্ত করে ধরা ছিল সেই লকেট।

কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, লকেটের ভেতরের ছবিটি রাতের অন্ধকারে বদলে গেছে।

এবার ছবিতে রাফি একা নয়।

তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই তরুণী।

আর ছবির নিচে নতুন করে লেখা—

“পরের অতিথির অপেক্ষায়...”

আজও নাকি গভীর রাতে লাশকাটাঘরের জানালায় আলো জ্বলে। কেউ কাছে গেলে ভেতর থেকে ভেসে আসে একটি কণ্ঠ—

“লকেটটা নিয়ে এসেছ তো?”

০ মন্তব্য · ৫২ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!