শহর থেকে অনেক দূরে, নদীর ধারে একটি ছোট্ট গ্রাম। গ্রামের শেষ প্রান্তে ছিল পুরোনো এক কবরস্থান। দিনের বেলায় জায়গাটি শান্ত, কিন্তু রাত নামলেই সেখানে কেমন যেন অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসত।
সেই গ্রামেই থাকত নীহার। আর তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ ছিল মেহরিন।
মেহরিনের হাসি ছিল নীহারের পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শব্দ। দুজনের ভালোবাসা ছিল খুব সাধারণ—বিকেলে নদীর ধারে বসে গল্প করা, বৃষ্টিতে ভেজা, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছোট ছোট স্বপ্ন দেখা।
কিন্তু সুখের দিনগুলো বেশিদিন স্থায়ী হলো না।
এক বর্ষার রাতে মেহরিন ভয়াবহ এক দুর্ঘটনায় মারা গেল। নীহার যেন এক মুহূর্তে তার পুরো পৃথিবী হারিয়ে ফেলল। মেহরিনকে গ্রামের পুরোনো কবরস্থানে দাফন করা হলো।
সেদিন কবরের পাশে বসে নীহার কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল,
“তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেলে, মেহরিন। কিন্তু আমি তোমাকে কোনোদিন ছেড়ে যাব না। যতদিন বেঁচে থাকব, প্রতি রাতে তোমার কাছে আসব।”
তারপর থেকে প্রতিদিন রাতেই নীহার মেহরিনের কবরে যেত। কখনো ফুল রাখত, কখনো চুপচাপ বসে থাকত। মাঝে মাঝে মনে হতো, মেহরিন বুঝি তার কথা শুনছে।
এক রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। গ্রামের সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু নীহার ছাতা হাতে কবরস্থানের দিকে হাঁটছিল।
মেহরিনের কবরের কাছে গিয়ে সে দেখল, কবরের ওপর রাখা ফুলগুলো ভেজেনি। বরং সেগুলো থেকে অদ্ভুত এক মিষ্টি গন্ধ ছড়াচ্ছে।
হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠস্বর—
“নীহার…”
নীহার জমে গেল।
এই কণ্ঠ সে হাজার মানুষের ভিড়েও চিনতে পারবে।
ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখল, সাদা পোশাক পরা মেহরিন দাঁড়িয়ে আছে। তার চুল বাতাসে উড়ছে, চোখে সেই চেনা মায়া।
নীহারের হাত থেকে ছাতা পড়ে গেল।
“মেহরিন! তুমি?”
মেহরিন মৃদু হেসে বলল,
“আমি তো কোথাও যাইনি। তুমি আমাকে ডাকলেই আমি তোমার কাছে আসি।”
নীহার কাঁদতে কাঁদতে তার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু মেহরিনের শরীর ছুঁতে গিয়ে সে অনুভব করল, তার হাতের ভেতর দিয়ে যেন ঠান্ডা বাতাস চলে যাচ্ছে।
“তুমি আমার সঙ্গে ফিরে চলো,” নীহার বলল।
মেহরিন মাথা নাড়ল।
“আমি ফিরতে পারব না, নীহার। আমার জায়গা এখন এখানে।”
“তাহলে আমি এখানেই থাকব।”
মেহরিনের চোখে জল জমল।
“না। তোমার জীবন এখনো বাকি। আমার জন্য তোমার জীবন থামিয়ে দিও না।”
সেই রাতের পর নীহার প্রতিদিন মেহরিনকে দেখতে পেত। কখনো কবরের পাশে, কখনো নদীর ধারে, কখনো তাদের পুরোনো বটগাছটির নিচে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ছিল, মেহরিন শুধু রাতেই আসত। আর প্রতিবার দেখা হওয়ার সময় সে নীহারকে একই কথা বলত—
“আমাকে ভালোবাসো, কিন্তু আমার জন্য কষ্ট পেও না।”
একদিন নীহার সিদ্ধান্ত নিল, সে মেহরিনকে শেষবারের মতো একটি কথা বলবে।
সেদিন ছিল মেহরিনের মৃত্যুর এক বছর পূর্তি। নীহার কবরের পাশে বসে বলল,
“মেহরিন, তুমি যদি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো, তাহলে আজ আমাকে তোমার একটা কথা শুনতে হবে।”
মেহরিন ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়াল।
“কী কথা?”
“তুমি আমাকে প্রতিশ্রুতি দাও, আমি যতদিন বাঁচব, তুমি আমার স্মৃতিতে থাকবে। কিন্তু আমি আর তোমার জন্য কাঁদব না। আমি তোমার অসমাপ্ত স্বপ্নগুলো পূরণ করব।”
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মৃদু হেসে বলল,
“এই তো আমার নীহার।”
সেই মুহূর্তে চারপাশের বাতাস বদলে গেল। কবরস্থানের অন্ধকারে যেন হাজার জোনাকি জ্বলে উঠল। মেহরিনের মুখ ধীরে ধীরে আলোয় মিশে যেতে লাগল।
নীহার ছুটে গিয়ে তাকে ধরতে চাইল।
“মেহরিন! যেও না!”
মেহরিনের কণ্ঠ ভেসে এলো,
“আমি তোমার কাছেই আছি। শুধু চোখ বন্ধ করলেই আমাকে দেখতে পাবে।”
তারপর সে আর দেখা দিল না।
পরদিন সকালে নীহার কবরের পাশে গিয়ে দেখল, সেখানে একটি সাদা গোলাপ ফুটে আছে। অথচ সেই জায়গায় কোনোদিন গোলাপ গাছ ছিল না।
গোলাপের নিচে ছোট্ট একটি কাগজ পড়ে ছিল। কাগজে লেখা—
“ভালোবাসা কখনো মরে না। শুধু এক জগত থেকে অন্য জগতে চলে যায়।”
তারপর বহু বছর কেটে গেল।
নীহার গ্রামের শিশুদের জন্য একটি ছোট্ট স্কুল তৈরি করল। স্কুলটির নাম রাখল “মেহরিনের স্বপ্ন”। সে জানত, মেহরিন বেঁচে থাকলে এমন একটি স্কুলই তৈরি করতে চাইত।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় স্কুলের কাজ শেষে নীহার সেই পুরোনো কবরস্থানে যেত। মেহরিনের কবরে ফুল রাখত। আর মনে মনে বলত,
“দেখো মেহরিন, তোমার স্বপ্নগুলো এখনো বেঁচে আছে।”
গ্রামের মানুষ বলত, নীহার নাকি এখনো রাতে কারও সঙ্গে কথা বলে। কেউ কেউ দূর থেকে দেখেছে, কবরের পাশে দুজন মানুষের ছায়া পাশাপাশি বসে আছে।
কিন্তু নীহার কখনো কাউকে কিছু বলেনি।
শুধু এক পূর্ণিমার রাতে, গ্রামের এক বৃদ্ধ তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন,
“তুমি কি এখনো মেহরিনকে দেখতে পাও?”
নীহার মৃদু হেসে উত্তর দিয়েছিল,
“যাকে সত্যি ভালোবাসা যায়, তাকে হারানো যায় না। সে হয়তো পাশে বসে থাকে না, কিন্তু হৃদয়ের ভেতর থেকে কখনো চলে যায় না।”
সেদিন রাতে নীহার কবরের পাশে বসে ছিল। হঠাৎ বাতাসে ভেসে এলো মেহরিনের সেই চেনা হাসি।
নীহার চোখ বন্ধ করল।
তার মনে হলো, কেউ খুব আস্তে করে তার হাতটি ধরে আছে।
সে আর চোখ খুলল না।
কারণ সে জানত, কিছু ভালোবাসা চোখ দিয়ে দেখা যায় না—শুধু হৃদয় দিয়ে অনুভব করা যায়।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!