প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসভাইরাস -পর্ব ১

গল্প ও উপন্যাস

ভাইরাস -পর্ব ১

ভাইরাস -পর্ব ১

ঢাকা - সাভার

সাভারের একটি সরু গলির শেষ মাথায় টিনের চাল দেওয়া ছোট্ট একটা বাড়ি।

বিজ্ঞাপন

বাড়িটা খুব বড় নয়। দুটো ঘর, একটা ছোট রান্নাঘর, সামনে একচিলতে উঠান। বর্ষাকালে উঠানে পানি জমে থাকে, শীতকালে টিনের দেয়াল দিয়ে ঠান্ডা ঢুকে পড়ে। তবুও পাঁচজন মানুষের কাছে সেটাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।

পরিবারে বাবা, মা, দুই ছেলে আর এক মেয়ে।

বাবা জালাল সাহেব সাভারের একটি গার্মেন্টস কারখানায় হিসাবরক্ষকের কাজ করতেন। মাস শেষে যে বেতনটা হাতে আসত, সেটা দিয়ে কোনোভাবে সংসার চলত। বড় ছেলে রাকিব ঢাকার একটা ছোট প্রিন্টিং দোকানে কাজ করত। ছোট ছেলে রিফাত কলেজে পড়ত। আর সবার ছোট মেয়ে মায়া, মাত্র দশ বছর বয়স।

মায়া ছিল বাবার চোখের মণি।

প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে মায়া বাবার গলা জড়িয়ে বলত,

—“আব্বু, আজকে ফেরার সময় আমার জন্য একটা চকোলেট আনবা?”

জালাল সাহেব হেসে বলতেন,

—“চকোলেট একটা না এনে, যদি দুইটা আনি?”

মায়া চোখ বড় বড় করে বলত,

—“তাহলে তুমি পৃথিবীর সেরা আব্বু !!

এই কথাটার জন্যই হয়তো মানুষটা প্রতিদিন ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরেও হাসত২০২০ সালের মার্চ। টেলিভিশনে সারাদিন একটা শব্দ ঘুরছিল—করোনাভাইরাস। প্রথমে তারা খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। রিফাত বলেছিল,“আমাদের এখানে এসব হবে না আব্বু।”জালাল সাহেবও হেসে বলেছিলেন,“হ্যাঁরে, এসব বড়লোকদের রোগ। আমাদের মতো মানুষের আবার রোগের সময় কোথায়?”কথাটা বলতে বলতে তিনি হাসলেও, কথাটা যে কতটা নির্মম সত্য হয়ে দাঁড়াবে, তখন তিনি নিজেও জানতেন না। কয়েকদিন পর গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে গেল। রাকিবের প্রিন্টিং দোকানও বন্ধ। তারপর একদিন সরকারিভাবে ঘোষণা এলো—লকডাউন। রাস্তা ফাঁকা। দোকানপাট বন্ধ। কারখানার গেট বন্ধ। মানুষ ঘরে বন্দি। আর জালাল সাহেবের পকেটও যেন সেদিন থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।


প্রথম সপ্তাহটা কোনোভাবে কেটে গেল। দ্বিতীয় সপ্তাহে চালের বস্তা অর্ধেক হয়ে গেল। তৃতীয় সপ্তাহে বাজারের তালিকা ছোট হতে হতে শুধু— চাল। ডাল। আলু। এই তিনটায় এসে দাঁড়াল। মা সালমা বেগম একদিন দুপুরে হাঁড়ির ঢাকনা খুলে দেখলেন, ভাত খুব কম। মায়া পাশে দাঁড়িয়ে বলল,“আম্মু, আজকে কি ডিম হবে?”সালমা হাসলেন। “আজকে আলু ভর্তা খাবি?” মায়া মুখটা একটু বাঁকিয়ে বলল,“ডিম নেই?” “কালকে হবে।” সালমা জানতেন, কালকেও হবে না। তবু মায়ের মুখে “না” শব্দটা আসে না। সেদিন রাতে জালাল সাহেব চুপচাপ বিছানায় শুয়ে ছিলেন। মায়া তার পাশে এসে বলল, “আব্বু?” “হুম?” “তুমি কাঁদতেছ?” জালাল সাহেব সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। “না তো।” “তাহলে চোখ লাল কেন?”

তিনি মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন, “ধুলো ঢুকেছে মা।” মায়া তার চোখে ফুঁ দিয়ে বলল,“আমি ফুঁ দিলে ধুলো বের হয়ে যাবে।” জালাল সাহেব মেয়েকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। কারণ তিনি জানতেন—

চোখের ধুলোটা আসলে ধুলো ছিল না।


একদিন রাকিব বলল, “আব্বু, আমি বাইরে গিয়ে কিছু একটা কাজ দেখি?” জালাল সাহেব কঠিন গলায় বললেন,“না।”

“কিন্তু ঘরে চাল নেই। করোনা হয়েছে চারদিকে।” “ক্ষুধাও তো হয়েছে আব্বু। ”ঘরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। জালাল সাহেব ছেলের দিকে তাকালেন। কিছু বলতে পারলেন না। সেদিন রাতে তিনি নিজের পুরোনো আলমারি খুললেন। ভেতর থেকে একটা ছোট্ট টিনের বাক্স বের করলেন। বাক্সের মধ্যে ছিল কিছু টাকা। তার বহু বছরের জমানো সঞ্চয়। মায়ার স্কুলের ফি। রিফাতের কলেজের খরচ। বাড়ির ভাঙা ছাদ ঠিক করার টাকা। সব মিলিয়ে খুব বেশি নয়। কিন্তু একজন নিম্ন-মধ্যবিত্ত বাবার কাছে এই সামান্য টাকাটাই ছিল ভবিষ্যৎ। তিনি সব টাকা বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন। সালমা অবাক হয়ে বললেন,“এত টাকা কোথায় পেলে?” জালাল মৃদু হেসে বললেন, “তোমাদের জন্য জমাইছিলাম।” “সব শেষ করে দেবে?”

জালাল মেয়ের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকালেন। “ভবিষ্যৎ পরে দেখা যাবে। আগে ওদের আজকের দিনটা বাঁচুক।”


এরপর শুরু হলো আরেক যুদ্ধ। করোনার বিরুদ্ধে নয়। ক্ষুধার বিরুদ্ধে। জালাল সাহেব প্রতিদিন সকালে মাস্ক পরে বের হতেন। কাজ নেই। তবুও বের হতেন। কখনো বাজারে মাল নামানোর কাজ। কখনো কারও দোকানে হিসাব লেখা।

কখনো রিকশা ঠেলে দেওয়া। যে কাজ পেতেন, করতেন। বয়স তার পঞ্চাশের কাছাকাছি। কিন্তু সংসারের দায়িত্ব বয়সকে মানে না। একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে তিনি ভিজে বাড়ি ফিরলেন। সালমা দরজা খুলে বললেন,

“এভাবে ভিজে আসছ কেন?” তিনি হাসলেন। “আজকে তিনশ টাকা পাইছি।” মায়া দৌড়ে এসে বাবার পা জড়িয়ে ধরল।

“আব্বু! আমার চকোলেট?” জালাল সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর পকেট থেকে একটা ছোট্ট চকোলেট বের করলেন। ভেজা কাগজের মধ্যে মোড়ানো। মায়ার চোখ আনন্দে চকচক করে উঠল।“তুমি পৃথিবীর সেরা আব্বু!”

জালাল সাহেব হাসলেন। সেই হাসির আড়ালে কেউ দেখল না—

মানুষটা সেদিন নিজের জন্য দুপুরের খাবার খাননি।


চলবে....

০ মন্তব্য · ৩৪৭ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!