তারপর এক সকালে জালালের জ্বর এলো।
১০৪ ডিগ্রি।
সালমা ভয় পেয়ে গেলেন।
—“হাসপাতালে যাবা?”
জালাল মাথা নেড়ে বললেন,
—“না।”
—“কেন?”
—“যদি করোনা হয়?”
ঘরে কেউ কথা বলল না।
সবাই ভয় পাচ্ছিল।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জ্বর বেড়ে গেল।
কাশি শুরু হলো।
শ্বাস নিতে কষ্ট।
রাকিব মোবাইল হাতে নিয়ে একের পর এক হাসপাতালে ফোন করতে লাগল।
কোথাও বেড নেই।
কোথাও অক্সিজেন নেই।
কোথাও বলা হলো—
“রোগী নিয়ে আসবেন না।”
শেষ পর্যন্ত অনেক কষ্টে একটি হাসপাতালে জায়গা পাওয়া গেল।
কিন্তু জালাল সাহেব যাওয়ার আগে ছেলেকে বললেন,
—“রাকিব…”
—“জি আব্বু?”
—“মায়ার কাছে যাস না।”
রাকিব থমকে গেল।
—“কেন?”
—“ওকে আমার কাছে আসতে দিস না।”
তারপর মেয়ের দিকে তাকালেন।
মায়া দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল।
—“আব্বু, তুমি কোথায় যাবে?”
জালাল সাহেব মুখে হাসি এনে বললেন,
—“হাসপাতালে যাচ্ছি মা। দুইদিন পরেই ফিরে আসব।”
মায়া দৌড়ে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরতে চাইল।
সালমা তাকে থামিয়ে দিলেন।
—“না মা… কাছে যাস না।”
মায়া অবাক হয়ে বলল,
—“কেন?”
কেউ উত্তর দিল না।
হাসপাতালে নেওয়ার পর জালালের অবস্থা আরও খারাপ হলো।
ফোনে কথা বলার শক্তিও কমে গেল।
এক রাতে রাকিবের ফোন বেজে উঠল।
ওপাশ থেকে ডাক্তার বললেন,
—“আপনার বাবার অবস্থা খুব সংকটজনক।”
রাকিবের হাত কাঁপতে লাগল।
—“ডাক্তার সাহেব… আব্বুর সাথে একটু কথা বলা যাবে?”
কিছুক্ষণ পর ফোনটা জালালের হাতে দেওয়া হলো।
দুর্বল কণ্ঠ ভেসে এলো—
—“রাকিব…”
—“জি আব্বু।”
—“মায়া কাঁদে?”
রাকিব চোখ মুছে বলল,
—“না আব্বু।”
সে মিথ্যা বলল।
মায়া তখন পাশের ঘরে বসে বাবার পুরোনো শার্টটা বুকে জড়িয়ে কাঁদছিল।
জালাল বললেন,
—“ওকে বলিস… চকোলেটটা আমি ভুলে যাই নাই।”
রাকিব আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
—“আব্বু…”
—“আর শোন…”
—“জি।”
—“তুই… তোর আম্মুর খেয়াল রাখিস।”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর খুব আস্তে—
—“আর মায়াকে… পড়াশোনা করাস।”
ফোনের ওপাশে আর কোনো শব্দ নেই।
সকাল ছয়টা।
হাসপাতাল থেকে ফোন এলো।
জালাল সাহেব আর নেই।
রাকিব ফোনটা হাতে নিয়ে বসে রইল।
কেউকে কিছু বলতে পারল না।
সালমা বুঝে গেলেন।
মায়ের কান্না খুব অদ্ভুত।
তিনি চিৎকার করেননি।
শুধু দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“মানুষটা তো বলছিল দুইদিন পরেই আসবে…”
মায়া দৌড়ে এসে বলল,
—“আম্মু, আব্বু কবে আসবে?”
সালমা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে শুধু বললেন,
—“তোর আব্বু… আর আসবে না মা।”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—“কেন?”
সালমার কোনো উত্তর ছিল না।
মায়া বাবার ভেজা চকোলেটের খালি মোড়কটা হাতে নিয়ে বলল,
—“আব্বু তো বলছিল… সে পৃথিবীর সেরা আব্বু।”
এইবার সালমা আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।
কয়েক মাস পর।
লকডাউন ধীরে ধীরে শেষ হলো।
দোকান খুলল।
গাড়ি চলল।
মানুষ রাস্তায় ফিরল।
শহর আবার ব্যস্ত হয়ে উঠল।
কিন্তু সাভারের সেই ছোট্ট বাড়িটায় একটা চেয়ার আর কখনো ভরেনি।
জালালের চেয়ার।
মায়া প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার আগে সেই চেয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে বাবাকে সালাম করত।
একদিন সে মাকে জিজ্ঞেস করল,
—“আম্মু, করোনা কি শুধু মানুষকে মারে?”
সালমা মেয়ের দিকে তাকালেন।
—“কেন মা?”
মায়া বলল,
—“করোনা তো আব্বুকে নিয়ে গেছে।”
তারপর একটু থেমে বলল,
—“কিন্তু আব্বু তো অসুস্থ হওয়ার আগেই আমাদের জন্য সবকিছু দিয়ে দিছিল।”
সালমা চুপ করে রইলেন।
মায়া আবার বলল,
—“তাহলে ভাইরাসটা কি শুধু শরীরে ছিল?”
সালমা মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।
কোনো উত্তর দিলেন না।
কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর শব্দে দেওয়া যায় না।
শেষ কথা
বছর কেটে গেল।
মায়া বড় হলো।
একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলো।
মায়া মেধাতালিকায় জায়গা পেয়েছে।
সেদিন সে বাবার পুরোনো সেই চেয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে একটা কাগজ রাখল।
কাগজে লেখা—
“আব্বু, আমি পেরেছি।”
তার পাশে ছিল একটা চকোলেট।
সালমা দূর থেকে মেয়ের দিকে তাকিয়ে কাঁদছিলেন।
মায়া চেয়ারের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
—“আব্বু, আজকে আমি তোমার জন্য চকোলেট আনছি।”
তারপর সে চকোলেটটা চেয়ারের ওপর রেখে দিল।
বাইরে তখন আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
টিনের চালে টুপটাপ শব্দ।
সেই একই শব্দ—
যে শব্দ শুনে একদিন একজন বাবা ভিজে শরীরে বাড়ি ফিরেছিলেন, হাতে ছিল মাত্র তিনশ টাকা আর মেয়ের জন্য একটা চকোলেট।
করোনাভাইরাস হয়তো তার শরীর কেড়ে নিয়েছিল।
কিন্তু তার ভালোবাসাকে পারেনি।
কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর ভাইরাসটা সবসময় জীবাণু নয়।
কখনো কখনো সেটা হয়—
ক্ষুধা।
দারিদ্র্য।
অসহায়ত্ব।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর—
প্রিয় মানুষকে বাঁচাতে না পারার অপরাধবোধ।
সেই রাতের পর মায়া একটা কথা কোনোদিন ভুলতে পারেনি—
“আব্বু তো বলেছিল, দুইদিন পরেই ফিরে আসবে…”
কিছু মানুষ ফিরে আসে না।
শুধু তাদের রেখে যাওয়া ভালোবাসা—
সারা জীবন আমাদের ভেতরে বেঁচে থাকে।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!