প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসকুয়াশার রাতে শ্মশানঘাট

গল্প ও উপন্যাস

কুয়াশার রাতে শ্মশানঘাট

কুয়াশার রাতে শ্মশানঘাট

কুয়াশার রাতে শ্মশানঘা

রাত সাড়ে বারোটারও বেশি।

বিজ্ঞাপন

শীতের রাত। চারপাশে ঘন কুয়াশা এমনভাবে নেমেছে যে, পাঁচ-দশ হাত দূরের জিনিসও ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না। গ্রামের মেঠোপথটা দিনের বেলায় যতটা পরিচিত, রাতে সেটাই যেন অচেনা হয়ে যায়।

রহিম সেদিন বাড়ি ফিরছিল এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে। আড্ডা একটু বেশি জমে যাওয়ায় সময়ের দিকে খেয়ালই ছিল না। বাড়ি ফিরতে এখনো প্রায় দুই কিলোমিটার পথ।

তার ওপর সামনে সেই পুরোনো কাঁচা রাস্তা।

আর রাস্তার মাঝামাঝি পড়বে গ্রামের বহু বছরের পুরোনো শ্মশানঘাট।

ছোটবেলা থেকেই রহিম জায়গাটার গল্প শুনে এসেছে। গ্রামের বুড়োরা বলত, বহু বছর আগে নাকি এক বউ রাতের বেলা ওই শ্মশানঘাটের পাশের পুকুরে পড়ে মারা গিয়েছিল। তারপর থেকে পূর্ণিমার রাতে নাকি সাদা কাপড় পরা এক নারীকে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

রহিম এসব কখনো বিশ্বাস করেনি।

বরং বন্ধুরা ভয় দেখালে সে বলত,

“ভূত-প্রেত কিছু নাই রে! মানুষই মানুষের সবচেয়ে বড় ভয়।”

কিন্তু সেদিন কুয়াশার মধ্যে একা হাঁটতে হাঁটতে কথাটা নিজের কাছেই খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য লাগছিল না।

হঠাৎ—

ঝনঝন... ঝনঝন...

পেছন থেকে যেন কারও পায়ের নূপুরের শব্দ ভেসে এল।

রহিম থেমে গেল।

শব্দটাও থেমে গেল।

সে পেছনে তাকাল।

কেউ নেই।

চারদিকে শুধু সাদা কুয়াশা।

রহিম নিজেকে বোঝাল, হয়তো বাঁশঝাড়ে শুকনো ডাল নড়েছে।

আবার হাঁটা শুরু করল।

কয়েক কদম যেতেই আবার—

ঝনঝন... ঝনঝন...

এবার শব্দটা আরও কাছে।

রহিমের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

সে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।

পেছন থেকে এবার একটা মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এল—

“ভাই... একটু দাঁড়াবেন?”

রহিমের পা যেন মাটিতে আটকে গেল।

গলার স্বরটা অদ্ভুত মায়াবী।

সে ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল।

কুয়াশার ভেতর একটা সাদা অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে।

লম্বা চুল।সাদা শাড়ি।মাথাটা একটু নিচু।

রহিমের গলা শুকিয়ে গেল।সে কোনোমতে বলল,

“কে... কে আপনি?”

মেয়েটা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

“আমি... এই রাস্তা দিয়ে বাড়ি যেতে পারছি না। একটু এগিয়ে দেবেন?”

রহিমের মনে হলো, তার শরীরের সমস্ত রক্ত যেন বরফ হয়ে গেছে।

কারণ মেয়েটার পা দেখা যাচ্ছে না।

সাদা শাড়ির নিচটা কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে আছে।

সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না।

দৌড় দিল।

পেছন থেকে মেয়েটার হাসির শব্দ শুনতে পেল—

“এত ভয় পান কেন... রহিম?”

রহিমের বুক কেঁপে উঠল।

সে তার নাম জানে কীভাবে?

দৌড়াতে দৌড়াতে সামনে তাকিয়ে হঠাৎ দেখল—রাস্তার পাশে সেই পুরোনো শ্মশানঘাট।

আর তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই মেয়েটা।

রহিম থমকে গেল।পেছনে তাকাল।কেউ নেই।

সামনে তাকাল।

মেয়েটা ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে।

এবার তার মুখটা পরিষ্কার দেখা গেল।

ফ্যাকাশে মুখ।চোখ দুটো অস্বাভাবিক কালো।

আর ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত হাসি।

মেয়েটা বলল,

“আমাকে চিনতে পারছেন না?”

রহিম কাঁপতে কাঁপতে মাথা নাড়ল।

মেয়েটা ফিসফিস করে বলল,

“বিশ বছর আগে... এই শ্মশানঘাটের পুকুরে আমি মারা গিয়েছিলাম। সেদিন রাতেও এমন কুয়াশা ছিল।”রহিমের শরীর অবশ হয়ে আসছিল।

মেয়েটা আরও কাছে এসে বলল,

“অনেক বছর ধরে আমি অপেক্ষা করছি... কেউ একজন আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে।”

হঠাৎ দূরে মসজিদের মাইকে ফজরের আজানের প্রথম ধ্বনি ভেসে এল।

আল্লাহু আকবার... আল্লাহু আকবার...

এক মুহূর্তে চারপাশের কুয়াশা যেন কেঁপে উঠল।

মেয়েটা পেছনে সরে গেল।

তারপর ধীরে ধীরে কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে যেতে যেতে বলল,

“আজও বাড়ি যাওয়া হলো না...”

রহিম আর কিছু মনে করতে পারল না।

সকালে গ্রামের কয়েকজন লোক তাকে শ্মশানঘাটের পাশের রাস্তা থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করল।

জ্ঞান ফেরার পর সবাই তাকে জিজ্ঞেস করল কী হয়েছিল।

রহিম সব খুলে বলল।

বৃদ্ধ কাদের চাচা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

“তুই ভাগ্যবান, বাবা।”

রহিম অবাক হয়ে তাকাল।

“কেন?”

চাচা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

“বিশ বছর আগে যে মেয়েটা মারা গেছিল, তার নামও ছিল রহিমা।”

“আর তুই যে মেয়েটাকে দেখছিস...”

চাচা একটু থামলেন।

“তার বাবার নাম ছিল রহিম।”

রহিমের বুকের ভেতরটা আবার কেঁপে উঠল।

সে কাঁপা গলায় বলল,

“কিন্তু... আমার নাম রহিম জানল কীভাবে?”

কাদের চাচা কোনো উত্তর দিলেন না।

শুধু শ্মশানঘাটের কুয়াশায় ঢাকা রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

সেদিনের পর রহিম আর কোনোদিন রাতে ওই রাস্তা দিয়ে একা হাঁটেনি।

তবে গ্রামের মানুষ আজও বলে—

শীতের গভীর রাতে, ঘন কুয়াশার মধ্যে ওই রাস্তা দিয়ে কেউ একা গেলে মাঝে মাঝে নূপুরের শব্দ শোনা যায়।

আর তারপর একটা মেয়েলি কণ্ঠ খুব কাছে এসে ফিসফিস করে—

“ভাই... একটু দাঁড়াবেন?”


০ মন্তব্য · ২৯০ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!