ব্যস্ত মতিঝিল মেট্রো স্টেশনের তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন সকাল ঠিক ৮টা ৪৫ মিনিটে একটা অদ্ভুত নীরব প্রেম উঁকি দিত।
সেখানে কোনো কথা হতো না, কারণ শুভ ও রাইসার ভাষা ছিল একদম আলাদা। রাইসা জন্ম থেকেই কথা বলতে বা শুনতে পারে না। আর শুভ এক বহুজাতিক কোম্পানির ব্যস্ত সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, যে প্রতিদিন ওই একই ট্রেনে অফিসে যায়।
তাদের পরিচয়ের শুরুটা ছিল এক বৃষ্টির সকালে। রাইসার হাতের ছাতাটা আচমকা বাতাসে উড়ে লাইনে পড়ে গিয়েছিল। শুভ নিজের ছাতাটা রাইসার মাথায় এগিয়ে দিয়ে আলতো হেসেছিল। রাইসা তার জবাবে দুই হাত জোড় করে বুকে ঠেকিয়ে মাথা নিচু করেছিল—ইশারা ভাষার সেই 'ধন্যবাদ' শুভুর বুকে এক অদ্ভুত দোলা দিয়ে যায়।
এরপর থেকে প্রতিদিন সকালে প্ল্যাটফর্মে তাদের দেখা হতো। শুভ ট্রেনের ভিড়েও দূর থেকে রাইসাকে খুঁজত। রাইসা ট্রেন থেকে নেমে যাওয়ার আগে শুভর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি একটা হাসি দিত। ব্যাস, এটুকুই। কোনো ফোন নম্বর আদান-প্রদান হয়নি, কোনো ফেসবুক আইডির খোঁজ নেওয়া হয়নি। শুধু চোখের ভাষায় একটা গভীর নির্ভরতা তৈরি হয়েছিল।
শুভ রাইসার সাথে কথা বলার জন্য ইন্টারনেটে ইশারা ভাষা (Sign Language) শিখতে শুরু করল। প্রতি রাতে সে ইউটিউব দেখে আঙুলের মুদ্রাগুলো মুখস্থ করত। সে অপেক্ষা করছিল একটা বিশেষ দিনের, যেদিন সে রাইসাকে তার মনের কথা জানাবে।
অবশেষে সেই দিনটা এল। বসন্তের এক সকালে শুভ প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দেখল রাইসা একটি নীল শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে। আজ সে একা নয়, তার সাথে তার মা-ও আছেন। রাইসার মা শুভর দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন, যেন তিনি সব জানেন।
শুভ একটু এগিয়ে গিয়ে বুকভরা সাহস নিয়ে রাইসার সামনে দাঁড়াল। তারপর নিজের হাত দুটো বাতাসে তুলে ইশ"তুমি কি প্রতিদিন আমার সাথে এই ট্রেনে সফর করবে? সারাজীবনের জন্য?"
রাইসা স্তব্ধ হয়ে গেল। সে ভাবতেও পারেনি এই ব্যস্ত শহরের একটা ছেলে শুধু তার জন্য ইশারা ভাষা শিখবে। তার চোখের কোণ দিয়ে আনন্দের জল গড়িয়ে পড়ল। সে হাত দিয়ে শুভর হাত দুটো জড়িয়ে ধরে নিজের চিবুকে ছোঁয়াাল, যার অর্থ—"হ্যাঁ, হাজার বার।
প্ল্যাটফর্মে তখন ট্রেনের হুইসেল বাজছিল, কিন্তু সেই শব্দ ছাপিয়ে দুটি নীরব হৃদয়ের প্রেমের গল্প এক অন্যরকম পূর্ণতা পেয়ে গেল।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!