আমাদের দেশের বাড়ির পিছনে একটা পুকুর ছিল, নাম শাঁখপুকুর। শাঁখের মতো বাঁকা বলে নয়। শাঁখা পরা একজন থাকতেন বলে।
আপনি হাসবেন না মশাই। শাকচুন্নি ব্যাপারটা মোটেই লঘু নয়। পেত্নী আর শাকচুন্নিতে তফাত আছে এবং তফাতটা বিবাহঘটিত। মেয়ে অবিবাহিতা মরলে পেত্নী, সধবা ব্রাহ্মণী মরলে শাকচুন্নি। ফলে শাকচুন্নির লোভটা ভয় দেখানোর লোভ নয়, গেরস্তর লোভ। ও ভয় দেখাতে আসে না। ও সংসার চাইতে আসে।
জ্যাঠামশাই বলতেন, "যে ভূত ভয় দেখায় তাকে তাড়ানো সহজ। কিন্তু যে শুধু থাকার জায়গাটা চায়, তাকে তাড়াবি কী দিয়ে?"
তাই বাড়িতে তিনটে নিয়ম ছিল। জ্যৈষ্ঠের দুপুরে বাড়ির বউ একলা ঘাটে যাবে না। ভিজে শাঁখা হাতে ঘরে ঢুকবে না। আর বড় মাছের মুড়ো কাকে দেওয়া হবে, সে নিয়ে কোনও দিন তর্ক হবে না।
নতুন কাকিমা এই তিনটে নিয়মের একটাও মানেননি। কলকাতার মেয়ে, বি. এ. পাস, চশমা পরতেন, ছোট করে সিঁদুরের দাগ দিতেন। প্রথম দিন শুনেই বলেছিলেন, "পুকুরে আমার সতীন থাকে জানলে তো ভালোই। আপনাদের ছেলে সাবধানে থাকবে।"
জ্যাঠামশাই হাসেননি। বলেছিলেন, "সতীন ঘর ভাঙে, মা। শাকচুন্নি ঘর ভাঙে না। ঘরে ঢুকে বসে থাকে।"
কাকিমা মাছের মুড়ো ছুঁতেন না। বলতেন, ওই চোখ দুটোর দিকে তাকালে তাঁর গা গুলিয়ে ওঠে। বাড়িতে এই নিয়ে ঠাট্টা চলত, কলকাতার মেয়ে মাছের মাথা খায় না, অতএব বাঙালিয়ানায় খাদ আছে।
এক জ্যৈষ্ঠের দুপুরে উনি চুল ধুতে ঘাটে গিয়েছিলেন। একলা। শাঁখা দুটো খুলে সিঁড়ির উপর রেখেছিলেন, কাদা লেগে যেতে পারে বলে। ফিরলেন আধ ঘণ্টা পরে। শাঁখা হাতেই পরা। আমি উঠোনে বসে ছিলাম। দেখলাম, শাঁখা দুটো ভেজা, জল গড়াচ্ছে কনুই বেয়ে। আর চুল একেবারে শুকনো।
রাতেরবেলা ভাত বাড়া হল। কাকিমা মুড়োটা নিজের পাতে নিলেন। কারও দিকে তাকালেন না, কিছু বললেন না। খেলেন খুব ধীরে ধীরে, খুব যত্ন করে, দুটো চোখ আগে।
জ্যাঠামশাই সেদিন ভাত খেলেন না। থালায় জল ঢেলে উঠে গেলেন।
তারপর থেকে ছোটখাটো কিছু জিনিস চোখে পড়তে শুরু করলো। উঠোনের ধুলোয় ভিজে পায়ের ছাপ পড়ত রোজ, ঘাট থেকে ঘর অবধি। ছাপগুলো ঘরের দিকে আসছে, অথচ আঙুল বাইরের দিকে।
আর একটা শব্দ।
রাত্তিরে শাঁখার শব্দ। কাকিমা রান্নাঘরে হাত নাড়লে যেমন হয়, ঠিক তেমন,
ঠন্। ঠন্ ঠন্। ঠন্।
আমি একদিন জ্যাঠামশাইয়ের ঘরে গিয়ে বললাম, "শব্দটা শুনেছেন।"
উনি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, "শাঁখা জোড়ায় বাজে। দুটো হাত, দুটো শব্দ। কখনও যদি শুনিস তিনটে বাজছে, ভাত খেয়ে উঠে পড়বি, কথা বলবি না।"
আমি বললাম, "কিন্তু এই বাড়িতে শাঁখা তো....."
জ্যাঠামশাই বললেন, "তোর কাকিমা ভালোই আছে। ও তো ঘর ছেড়ে যায়নি।"
আমার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। কারণ আমি ঘর ছাড়ার কথা জিজ্ঞেস করিনি।
কাকিমা এরপর পঁয়ত্রিশ বছর বেঁচেছিলেন, কলকাতায় একবারও যাননি। কাকা এক দুবার বলার চেষ্টা করেছিল কিন্তু লাভ হয়নি। কিন্তু কাকিমা অতি লক্ষ্মী গিন্নি, অতুলনীয় রাঁধুনি, পাড়ার লোক তাঁর কচুর শাক খেতে লাইন দিত। শুধু দুটো জিনিস। উনি আর কোনও দিন ঘাটে নামেননি। আর কোনও দিন চশমা পরেননি, বলতেন, তাঁর চোখের দৃষ্টি এখন তেপান্তর পেরিয়ে যায়। বলে খিল খিল করে হাসতেন।
কাকিমা মারা যাওয়ার একবছরের মধ্যে কাকা মারা যান। শরীরটা পুকুর ঘাটে পাওয়া গেছিল। মুখ ভর্তি মাছের মাথা আর কাঁটা। বিয়ে বাড়ির মতন লোক জড়ো হয়েছিল কাকাকে দেখার জন্য।
পুকুরটা এখন বোজানো। জায়গাটায় ধান হয়।
এবার আসল কথাটা বলি শুনুন। শাকচুন্নির ব্যাপারে একটা সুবিধে আছে। ভয় দেখায় না, চিৎকার করে না, কাউকে টেনে জলে নামায় না। শুধু শরীরটা নিয়ে নেয়, তারপর সংসারটাকে ভালোবাসে। বড্ড বেশি ভালোবাসে। আর সবাইকে সেই ভালোবাসা ঘোরের মতন আপন করে নেয়।
অসুবিধেটা এই যে, বাড়ির লোক কোনদিনও টের পায় না কে রইল আর কে গেলো।
আজ রাতে রান্নাঘরে শব্দ হলে একবার কান পাতবেন। শাঁখা জোড়ায় বাজছে কি না গুনবেন। আর যদি বাড়িতে কেউ শাঁখা না পরে, তাহলে শব্দটা কোথা থেকে আসছে, সেটা ভুলেও খোঁজ করতে যাবেন না।
~✍️নিষাদ
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!