শ্মশানঘাটের শেষ চিতা
একটি লোমহর্ষক ভৌতিক গল্প
চরিত্র: শরিফ, টিটু ও রুমি
শেষ চিতা
পরদিন সকাল।
শরিফ, টিটু আর রুমি তিনজনই সিদ্ধান্ত নিল, তারা আর কখনো শ্মশানঘাটে যাবে না।
কিন্তু দুপুরের দিকে শরিফের বাড়ির সামনে একজন অচেনা বৃদ্ধ এসে দাঁড়াল।
বৃদ্ধ বলল,
—তোমাদের সঙ্গে একটু কথা আছে।
শরিফ বাইরে এসে দাঁড়াল।
বৃদ্ধ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুই মায়ার ছেলে?
শরিফ চমকে উঠল।
—আপনি কীভাবে জানেন?
বৃদ্ধ বলল,
—আমি ওই শ্মশানঘাটের পুরোনো পুরোহিত। বহু বছর আগে মায়ার দেহ আমি পোড়িয়েছিলাম। তার ছেলেকে নদীর ধারে পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু আমি জানতাম, সে মারা যায়নি।
রুমি বলল,
—তাহলে সে কোথায় ছিল?
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বলল,
—ওই শ্মশানঘাটে।
তিনজনের বুক কেঁপে উঠল।
বৃদ্ধ বলল,
—মায়া তার ছেলেকে খুঁজতে খুঁজতে নিজের আত্মা হারিয়ে ফেলেছিল। সে বিশ্বাস করত, তার ছেলে একদিন ফিরে আসবে। আর যেদিন সে ফিরে আসবে, সেদিন তার শেষ চিতা জ্বলবে।
শরিফ কাঁপতে কাঁপতে বলল,
—শেষ চিতা?
বৃদ্ধ বলল,
—মায়ার আত্মা মুক্তি পাবে না, যতক্ষণ না তার ছেলে তার সঙ্গে যায়।
টিটু চিৎকার করে উঠল,
—আপনি কী বলতে চান?
বৃদ্ধ কোনো উত্তর দিল না।
শুধু শরিফের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আজ রাতে সে আবার আসবে।
---
রাতের শেষ ডাক
সেদিন রাত।
শরিফের বাড়ির সব দরজা-জানালা বন্ধ। ঘরের ভেতর তিন বন্ধু বসে আছে।
শরিফের মা পাশের ঘরে দোয়া পড়ছেন।
রাত বাড়তে লাগল।
বারোটা বাজল।
তারপর একটার ঘন্টা।
হঠাৎ বাইরে থেকে নূপুরের শব্দ ভেসে এল।
ঝনঝন...
ঝনঝন...
টিটু ফিসফিস করে বলল,
—ও এসেছে।
রুমি বলল,
—কেউ দরজা খুলবি না।
শরিফ চুপ করে বসে ছিল।
তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল সেই কবর।
তার নিজের মুখ।
তার নিজের নাম।
হঠাৎ দরজায় ধাক্কা পড়ল।
ঠক... ঠক... ঠক...
বাইরে থেকে নারীকণ্ঠ ভেসে এল,
—শরিফ...
শরিফ চোখ বন্ধ করে ফেলল।
আবার ডাক।
—শরিফ...
টিটু তার হাত ধরে বলল,
—কিছু বলিস না।
রুমি দরজার দিকে তাকিয়ে ছিল।
হঠাৎ জানালার কাঁচে একটা মুখ ভেসে উঠল।
পুড়ে যাওয়া মুখ।
কালো চোখ।
লাল শাড়ি।
মায়া।
সে জানালার ওপাশ থেকে ফিসফিস করে বলল,
—তুই কি আমাকে চিনতে পারছিস না?
শরিফ চোখ খুলে তাকাল।
নারীটি হাসল।
—আমি তোকে নদীর ধারে রেখে গিয়েছিলাম। তুই আমাকে ছেড়ে চলে গেলি কেন?
শরিফ কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—আমি তো কিছুই জানি না!
মায়া জানালার কাঁচে হাত রাখল।
তার আঙুলের ছাপ কাঁচের ভেতর দিয়ে ঘরে ছড়িয়ে পড়ল।
—চল। আজ আমার চিতা জ্বলবে।
হঠাৎ ঘরের সব বাতি নিভে গেল।
টিটু চিৎকার করে উঠল।
রুমি শরিফকে জড়িয়ে ধরল।
অন্ধকারে মায়ার কণ্ঠ ভেসে এল,
—একজনকে নিয়ে যাব।
তারপর শরিফের শরীর ধীরে ধীরে মাটি থেকে উঠে গেল।
টিটু আর রুমি তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করল।
কিন্তু শরিফ যেন অদৃশ্য কোনো শক্তিতে টেনে নেওয়া হচ্ছে।
তার গলা থেকে বেরিয়ে এল করুণ চিৎকার।
—আমাকে বাঁচাও!
রুমি কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—শরিফ!
ঠিক তখনই শরিফের মা দৌড়ে এসে দরজার সামনে দাঁড়ালেন।
তিনি উচ্চস্বরে দোয়া পড়তে শুরু করলেন।
মায়া প্রচণ্ড চিৎকার করে উঠল।
তারপর সবকিছু থেমে গেল।
বাতি জ্বলে উঠল।
শরিফ মাটিতে পড়ে আছে।
টিটু আর রুমি তার পাশে বসে কাঁদছে।
কিন্তু শরিফের গলায় তখন সেই লাল শাড়ির আঁচল বাঁধা।
আর তার হাতে ছিল একটি রুপোর নূপুর।
---
ভোরের পর
পরদিন ভোরে শরিফ, টিটু আর রুমি গ্রামের এক বয়স্ক আলেমের কাছে গেল।
সব কথা শুনে তিনি বললেন,
—ওই জায়গায় আর যেও না। মৃত মানুষের আত্মা নিয়ে খেলা করা ঠিক নয়। আর যে জিনিস তোমরা পেয়েছ, সেগুলো শ্মশানঘাটে রেখে আসতে হবে।
শরিফ বলল,
—কিন্তু যদি সে আবার আসে?
আলেম বললেন,
—আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো। নিয়মিত নামাজ পড়ো, দোয়া করো। ভয় পেয়ে কোনো অদ্ভুত কাজ করবে না।
সেদিন বিকেলে তারা তিনজন গ্রামের কয়েকজন বড় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে শ্মশানঘাটে গেল।
লাল শাড়ির আঁচল আর নূপুরটি চিতার পাশে রেখে তারা ফিরে এল।
কিন্তু যাওয়ার সময় শরিফ একবার পেছনে তাকিয়ে ফেলল।
চিতার ওপর তখন একটি নারী দাঁড়িয়ে আছে।
তার মুখে হাসি।
সে শরিফের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
—এবার আমি তোকে ছাড়লাম।
শরিফ চোখ বন্ধ করে ফেলল।
আবার চোখ খুলে দেখল, কেউ নেই।
শুধু চিতার ছাইয়ের ওপর পড়ে আছে একটি ছোট্ট কাঠের খেলনা।
খেলনাটি ছিল একটি কাঠের ঘোড়া।
শরিফ সেটি তুলে নিল।
আর তখনই তার কানে ভেসে এল একটি শিশুর হাসি।
---
কয়েক মাস পর
ঘটনার পর কয়েক মাস কেটে গেল।
শরিফ, টিটু আর রুমি আগের মতো একসঙ্গে ঘোরাফেরা করত না। টিটু আর কখনো ভূতের গল্প নিয়ে মজা করত না। রুমি রাত হলে জানালা বন্ধ করে দিত।
শরিফ মাঝে মাঝে অদ্ভুত স্বপ্ন দেখত।
সে দেখত, নদীর ধারে একটি ছোট্ট ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটির হাতে কাঠের ঘোড়া।
ছেলেটি বলছে,
—ভাইয়া, আমার মাকে দেখেছ?
শরিফ ঘুমের মধ্যে উত্তর দিত,
—না।
ছেলেটি তখন ধীরে ধীরে মাথা তুলত।
তার মুখে কোনো চোখ নেই।
শুধু একটা বড় কালো গর্ত।
আর সেই গর্তের ভেতর থেকে মায়ার কণ্ঠ ভেসে আসত,
—আমার ছেলে কোথায়?
একদিন রাতে শরিফ ঘুম থেকে উঠে দেখল, তার ঘরের দরজা খোলা।
বাইরে কুয়াশা।
দূরে নদীর শব্দ।
আর উঠানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট্ট ছেলে।
ছেলেটির হাতে কাঠের ঘোড়া।
শরিফ দরজার কাছে গিয়ে বলল,
—তুমি কে?
ছেলেটি মাথা তুলে তাকাল।
তারপর মৃদু হাসল।
—আমি তোমার ভাই।
শরিফের বুক কেঁপে উঠল।
—তুমি এখানে কীভাবে এলে?
ছেলেটি বলল,
—মা তোমাকে ডাকছে।
শরিফ এক পা পিছিয়ে গেল।
—আমি যাব না।
ছেলেটি ধীরে ধীরে বলল,
—তাহলে মা নিজেই আসবে।
হঠাৎ উঠানের চারপাশে নূপুরের শব্দ শুরু হলো।
ঝনঝন...
ঝনঝন...
শরিফ দরজা বন্ধ করতে গেল।
কিন্তু তার হাত দরজার হাতলে পৌঁছানোর আগেই বাইরে থেকে কেউ দরজাটা ধরে ফেলল।
একটি পুড়ে যাওয়া হাত।
শরিফ চিৎকার করে উঠল।
তারপর ঘরের বাতি নিভে গেল।
অন্ধকারে মায়ার কণ্ঠ ভেসে এল,
—শরিফ...
---
শেষ কথা
পরদিন সকালে শরিফের মা ঘরের দরজা খোলা অবস্থায় দেখতে পেলেন।
শরিফ নেই।
তার বিছানার ওপর পড়ে আছে লাল শাড়ির আঁচল আর একটি রুপোর নূপুর।
টিটু আর রুমি ছুটে এল।
তারা পুরো গ্রাম খুঁজল।
নদীর ধারে গেল।
বাঁশঝাড়ে গেল।
শ্মশানঘাটে গেল।
কিন্তু শরিফকে কোথাও পাওয়া গেল না।
শুধু পুরোনো চিতার পাশে ছাইয়ের ওপর লেখা ছিল তিনটি নাম।
শরিফ।
টিটু।
রুমি।
তার নিচে লেখা ছিল,
শেষ চিতা এখনো জ্বলছে না।
সেদিনের পর থেকে টিটু আর রুমি কখনো শ্মশানঘাটের কাছে যায়নি।
কিন্তু গ্রামের মানুষ বলে, অমাবস্যার রাতে নদীর ধারে গেলে এখনো তিনজনের কণ্ঠ শোনা যায়।
একজন চিৎকার করে বলে,
—আমাকে বাঁচাও!
আরেকজন কাঁদতে কাঁদতে বলে,
—আমরা তো জানতাম না!
আর তৃতীয়জন খুব আস্তে বলে,
—মা... তুমি কোথায়?
তারপর নূপুরের শব্দ ভেসে আসে।
ঝনঝন...
ঝনঝন...
আর শ্মশানঘাটের পুরোনো চিতায় জ্বলে ওঠে একটুখানি আগুন।
--------শেষ।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!