প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসশ্মশানঘাটের শেষ চিতা "একটি লোমহর্ষক ভৌতিক গল্প" পর্ব-২

গল্প ও উপন্যাস

শ্মশানঘাটের শেষ চিতা "একটি লোমহর্ষক ভৌতিক গল্প" পর্ব-২

শ্মশানঘাটের শেষ চিতা "একটি লোমহর্ষক ভৌতিক গল্প" পর্ব-২

শ্মশানঘাটের শেষ চিতা-পর্ব-২


বিজ্ঞাপন

একটি লোমহর্ষক ভৌতিক গল্প

চরিত্র: শরিফ, টিটু ও রুমি




যে নামটি লেখা ছিল পাথরে


শরিফ টর্চের আলো কবরটির দিকে ফেলল।


কবরটি মাটির ওপর অর্ধেক ভাঙা। কোনো নাম লেখা নেই। শুধু একটি পাথর পড়ে আছে।


কিন্তু টর্চের আলো পড়তেই পাথরের ওপর অক্ষরগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল।


শরিফ।


শরিফের বুকের ভেতর যেন কেউ বরফ ঢেলে দিল।


—এটা... এটা কীভাবে সম্ভব?


টিটু কাঁপতে কাঁপতে বলল,


—তোর নাম কেন এখানে?


রুমি চোখ মুছে পাথরের দিকে তাকাল।


—না... এটা হতে পারে না।


পাথরের নিচে আরও কিছু লেখা ছিল।


জন্ম: ১৯৯৮

মৃত্যু: আজ রাত


শরিফ পিছিয়ে গেল।


—আমি মরিনি! আমি বেঁচে আছি!


নারীটি হেসে বলল,


—এখনো।


তারপর কবরের মাটি ফেটে গেল।


ভেতর থেকে একটা হাত বেরিয়ে এল।


হাতটা শরিফের পায়ের গোড়ালি চেপে ধরল।


শরিফ চিৎকার করে উঠল।


—আমাকে বাঁচা!


টিটু আর রুমি তাকে টেনে ধরল।


কিন্তু হাতটা অস্বাভাবিক শক্তিশালী।


মাটি থেকে আরও কয়েকটি হাত বেরিয়ে এল।


একটি টিটুর পা ধরল।


আরেকটি রুমির পা।


তিনজন একসঙ্গে পড়ে গেল।


শরিফের মুখ মাটিতে ঠেকে গেল।


সে চোখের সামনে দেখল, কবরের ভেতর একটা মানুষ শুয়ে আছে।


তার মুখ শরিফের মতো।


একই চোখ। একই নাক। একই চেহারা।


শরিফ চিৎকার করে উঠল,


—ওটা কে?


রুমি কাঁদতে কাঁদতে বলল,


—শরিফ... ওটা তুই!


শরিফের মাথা ঘুরে গেল।


সে দেখল, কবরের ভেতর শুয়ে থাকা মানুষটি ধীরে ধীরে চোখ খুলছে।


তারপর ঠোঁট নাড়ল।


—তুই দেরি করেছিস...


শরিফ আর্তনাদ করে উঠল।


ঠিক তখনই টিটু তার পকেট থেকে মোবাইল বের করে টর্চ জ্বালাল।


আলো পড়তেই হাতগুলো একটু ঢিলে হয়ে গেল।


টিটু চিৎকার করে বলল,


—রুমি! দৌড়!


তিনজন প্রাণপণে ছুটল।


পেছনে নারীটির হাসি ভেসে আসতে লাগল।


—শরিফ... টিটু... রুমি...


কিন্তু তারা আর পেছনে তাকাল না।



---

বাঁশঝাড়ের ভেতর


তারা শ্মশানঘাট থেকে বেরিয়ে বাঁশঝাড়ের দিকে ছুটছিল।


কুয়াশায় পথ দেখা যাচ্ছিল না।


শরিফ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,


—এই রাস্তা দিয়েই তো এসেছিলাম!


টিটু বলল,


—হ্যাঁ, সামনে বাঁশঝাড়!


কিন্তু বাঁশঝাড়ের কাছে গিয়ে তারা থেমে গেল।


কারণ পথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একজন বৃদ্ধ।


গায়ে সাদা ধুতি। হাতে একটা লাঠি। মুখে অদ্ভুত শান্ত হাসি।


বৃদ্ধ বলল,


—এত রাতে কোথায় যাচ্ছ?


শরিফ বলল,


—চাচা, আমাদের বাড়ি যেতে হবে। পথটা দেখিয়ে দিন।


বৃদ্ধ ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।


—বাড়ি? তোমাদের বাড়ি তো ওইদিকে না।


সে বাঁশঝাড়ের ভেতরের দিকে আঙুল তুলল।


টিটু বলল,


—না, আমরা ওই দিক থেকে এসেছি।


বৃদ্ধ হেসে বলল,


—তোমরা কোথা থেকে এসেছ, সেটা তোমরা জানো না।


রুমি বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ চিৎকার করে উঠল।


—আপনি... আপনি তো মারা গেছেন!


বৃদ্ধের হাসি থেমে গেল।


শরিফ আর টিটু তার দিকে তাকাল।


রুমি কাঁপতে কাঁপতে বলল,


—উনি আমার দাদার বন্ধু ছিলেন। তিন বছর আগে মারা গেছেন।


বৃদ্ধ ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে রুমির দিকে তাকাল।


তারপর বলল,


—তুই আমাকে চিনতে পেরেছিস?


রুমি কোনো উত্তর দিল না।


বৃদ্ধের মুখের চামড়া ধীরে ধীরে খুলে পড়তে লাগল। তার চোখের ভেতর থেকে কালো ধোঁয়া বের হতে লাগল।


সে ফিসফিস করে বলল,


—তাহলে তুইও আমার সঙ্গে চল।


রুমি পিছিয়ে গেল।


শরিফ তাকে ধরে দৌড় দিল।


বৃদ্ধের কণ্ঠ পেছন থেকে ভেসে এল,


—তোমরা তিনজনই তো আমার ঘাটে এসেছ!



---

ঘরে ফিরেও মুক্তি নেই


অনেকক্ষণ দৌড়ানোর পর তারা গ্রামের প্রথম বাড়ির কাছে পৌঁছাল।


দূরে মসজিদের মাইকে ফজরের আজান শুরু হয়েছে।


তিনজনের মুখে কোনো কথা নেই।


তারা সোজা শরিফের বাড়িতে ঢুকে দরজা বন্ধ করল।


শরিফের মা ঘুম থেকে উঠে অবাক হয়ে বললেন,


—এত রাতে কোথায় গিয়েছিলি তোরা?


শরিফ কিছু বলতে পারল না।


টিটু হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,


—আমরা... শ্মশানঘাটে গিয়েছিলাম।


শরিফের মা থমকে গেলেন।


—কী বললি?


রুমি কাঁদতে কাঁদতে সবকিছু খুলে বলল।


শরিফের মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,


—তোরা ওই ঘাটে গিয়েছিলি?


তারপর তিনি ঘরের ভেতর থেকে একটা পুরোনো কাঠের বাক্স বের করলেন।


বাক্স খুলে একটি পুরোনো ছবি বের করলেন।


ছবিতে এক নববধূ দাঁড়িয়ে আছে। গায়ে লাল শাড়ি। পায়ে রুপোর নূপুর।


শরিফের মা বললেন,


—এই মেয়েটার নাম ছিল মায়া। ওর বিয়ের রাতেই ওর স্বামী ওকে শ্মশানঘাটে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছিল। তারপর ওর দেহ পোড়ানো হয়। কিন্তু ওর ছেলেকে কেউ খুঁজে পায়নি।


টিটু কাঁপতে কাঁপতে বলল,


—ওর ছেলে?


শরিফের মা বললেন,


—ওর একটা ছোট ছেলে ছিল। সবাই বলেছিল, সে নদীতে ডুবে মারা গেছে। কিন্তু মায়া কখনো সেটা বিশ্বাস করেনি। সে নাকি প্রতি অমাবস্যায় শ্মশানঘাটে ফিরে এসে ছেলেকে খুঁজত।


রুমি ফিসফিস করে বলল,


—তাহলে আজ...


শরিফের মা ছবির দিকে তাকিয়ে বললেন,


—আজ তোদের তিনজনকে সে দেখেছে।


হঠাৎ ঘরের বাইরে নূপুরের শব্দ শোনা গেল।


ঝনঝন...


ঝনঝন...


তিনজনের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।


শরিফের মা ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।


—কে?


বাইরে কোনো উত্তর নেই।


শুধু দরজার নিচ দিয়ে লাল শাড়ির আঁচল ভেতরে ঢুকে পড়ল।


রুমি চিৎকার করে উঠল।


টিটু পিছিয়ে গেল।


শরিফের মা আঁচলটা দেখে ফিসফিস করে বললেন,


—মায়া...


দরজায় তিনবার ধাক্কা পড়ল।


ঠক... ঠক... ঠক...


তারপর বাইরে থেকে নারীকণ্ঠ ভেসে এল,


—আমার ছেলে কোথায়?


শরিফের মা কাঁপতে কাঁপতে বললেন,


—ও চলে গেছে... অনেক বছর আগে...


বাইরে থেকে উত্তর এল,


—মিথ্যা!


দরজাটা কেঁপে উঠল।


—আমার ছেলে এখানে আছে!


তিনজন একসঙ্গে শরিফের দিকে তাকাল।


শরিফের মুখ সাদা হয়ে গেছে।


সে ধীরে ধীরে বলল,


—আমি তো... আমি তো তার ছেলে নই!


ঠিক তখনই ঘরের বাতি নিভে গেল।


অন্ধকারে কেউ শরিফের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,


—তুই আমার ছেলে...



---

শরিফের জন্মের রহস্য


বাতি আবার জ্বলে উঠল।


শরিফের মা মেঝেতে বসে কাঁদছিলেন।


শরিফ তার মায়ের কাছে ছুটে গেল।


—মা, তুমি কী জানো?


তার মা মাথা নিচু করে বললেন,


—তুই আমার ছেলে না।


শরিফের মুখ শুকিয়ে গেল।


—কী বলছ?


—তুই আমার কাছে এসেছিলি এক রাতের বেলা। তোর বাবা তোকে নদীর ধারে পেয়েছিল। তুই তখন খুব ছোট। তোর গলায় একটা লাল কাপড় বাঁধা ছিল।


রুমি ধীরে ধীরে টিটুর দিকে তাকাল।


টিটু কোনো কথা বলল না।


শরিফের মা বললেন,


—তোর বাবা বলেছিল, তোকে কেউ নদীর ধারে ফেলে গেছে। কিন্তু তোর গলায় একটা নাম লেখা ছিল।


শরিফ কাঁপতে কাঁপতে বলল,


—কী নাম?


তার মা চোখ তুলে তাকালেন।


—মায়া।


ঘরের ভেতর যেন হঠাৎ বাতাস থেমে গেল।


শরিফের চোখের সামনে ভেসে উঠল শ্মশানঘাটের সেই নারী।


তার পুড়ে যাওয়া মুখ।


তার কালো চোখ।


তার কণ্ঠ।


তুই আমার ছেলে।


হঠাৎ দরজাটা নিজে থেকেই খুলে গেল।


বাইরে কেউ নেই।


শুধু উঠানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সেই সাদা কাপড়ের নারী।


তার হাতে লাল শাড়ির আঁচল।


সে শরিফের দিকে তাকিয়ে বলল,


—চল।


শরিফ পিছিয়ে গেল।


—তুমি কে?


নারীটি ধীরে ধীরে চুল সরাল।


—আমি তোর মা।


তারপর সে টিটু আর রুমির দিকে তাকাল।


—তোমরা আমার ছেলেকে নিয়ে গিয়েছিলে কেন?


রুমি কাঁদতে কাঁদতে বলল,


—আমরা জানতাম না!


নারীটি হাসল।


—এখন জানো।


তারপর সে শরিফের দিকে হাত বাড়াল।


শরিফ যেন অদৃশ্য কোনো শক্তিতে টেনে নেওয়া হচ্ছে।


তার পা মাটি ছেড়ে উঠল।


টিটু আর রুমি তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করল।


কিন্তু শরিফের শরীর ধীরে ধীরে দরজার দিকে ভেসে যেতে লাগল।


শরিফ চিৎকার করে উঠল,


—আমাকে বাঁচাও!


রুমি শরিফের হাত শক্ত করে ধরে বলল,


—তুই কোথাও যাবি না!


ঠিক তখনই শরিফের মা ঘরের ভেতর থেকে কোরআন শরিফ এনে দোয়া পড়তে শুরু করলেন।


নারীটি চিৎকার করে উঠল।


তার মুখের চামড়া পুড়ে যেতে লাগল।


সে শরিফকে ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে গেল।


কিন্তু যাওয়ার আগে বলল,


—আজ না... কাল...


তারপর সে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।


------বাকি পরের পর্বে


০ মন্তব্য · ৩৯ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!