প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসভালোবাসার রহস্য

গল্প ও উপন্যাস

ভালোবাসার রহস্য

ভালোবাসার রহস্য

রাত তখন প্রায় বারোটা। শহরের শেষ প্রান্তে পুরোনো সেই বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল রায়হান। তিন বছর ধরে একই স্বপ্ন দেখছে সে—একটি মেয়ে, নীল চোখ, লাল শাড়ি, আর হাতে একটি পুরোনো চিঠি।


বিজ্ঞাপন

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, স্বপ্নের মেয়েটিকে রায়হান কখনো বাস্তবে দেখেনি।


একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে হঠাৎ তার হাতে আসে একটি পুরোনো খাম। খামের ওপর লেখা—


“তুমি যদি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো, তাহলে আজ রাত বারোটায় পুরোনো বাড়িটায় এসো।”


নিচে কোনো নাম নেই।


কিন্তু চিঠির হাতের লেখা দেখে রায়হানের বুক কেঁপে উঠল। এই একই হাতের লেখা সে প্রতিরাতে স্বপ্নে দেখেছে!


বারোটা বাজার কয়েক মিনিট আগে সে বাড়িটিতে পৌঁছাল। দরজা অল্প খোলা। ভেতরে ঢুকতেই পুরোনো কাঠের দরজা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।


হঠাৎ অন্ধকারের ভেতর থেকে ভেসে এল একটি মেয়ের কণ্ঠ—


“রায়হান... তুমি সত্যিই এসেছ?”


রায়হান থমকে গেল।


“তুমি কে?”


ধীরে ধীরে মেয়েটি সামনে এল।


নীল চোখ।


লাল শাড়ি।


ঠিক সেই মেয়েটি!


রায়হানের মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হলো না।


মেয়েটি মৃদু হেসে বলল,

“তুমি আমাকে চিনতে পারছ না?”


“না... কিন্তু আমি তোমাকে প্রতিরাতে স্বপ্নে দেখি।”


মেয়েটির চোখে পানি জমল।


“কারণ তুমি আমাকে ভুলে গিয়েছিলে।”


সে একটি পুরোনো ছবি রায়হানের হাতে তুলে দিল।


ছবিতে রায়হান আর সেই মেয়েটি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।


ছবিটির পেছনে লেখা—


“রায়হান ও মায়া—ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি, ২০১৯।”


রায়হানের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।


“মায়া...?”


মেয়েটি মাথা নাড়ল।


“হ্যাঁ। আমি মায়া। পাঁচ বছর আগে এই বাড়ির সামনে আমাদের শেষ দেখা হয়েছিল। সেদিন দুর্ঘটনায় তুমি সব স্মৃতি হারিয়েছিলে।”


রায়হানের চোখে পানি চলে এল।


“তাহলে তুমি এতদিন কোথায় ছিলে?”


মায়া জানালার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,


“আমি কোথাও যাইনি।”


রায়হান এগিয়ে গেল।


“তাহলে?”


মায়া তার হাত ধরল।


হাতটি বরফের মতো ঠান্ডা।


“আমি এই বাড়ি ছেড়ে যেতে পারিনি।”


হঠাৎ জানালার কাঁচে বজ্রপাতের আলো পড়ল।


রায়হান দেখল—মায়ার পেছনে কোনো ছায়া নেই।


সে ভয়ে এক পা পিছিয়ে গেল।


মায়া মৃদু হেসে বলল,


“আমি তোমাকে ডাকিনি ফিরে আসার জন্য... তোমাকে সত্যিটা জানানোর জন্য ডেকেছি।”


“কী সত্য?”


মায়া তার হাতে শেষ চিঠিটা দিল।


চিঠিতে লেখা—


“যেদিন তুমি আমাকে খুঁজে পাবে, সেদিন বুঝবে—আমি তোমার অপেক্ষায় ছিলাম না। আমি অপেক্ষা করছিলাম তোমার স্মৃতির জন্য।”


চিঠির নিচে ছিল একটি তারিখ।


সেই তারিখটি ছিল পাঁচ বছর আগের।


আর ঠিক তার নিচে লেখা—


“মায়ার মৃত্যু: রাত ১২টা ১৭ মিনিট।”


রায়হানের হাত থেকে চিঠিটি পড়ে গেল।


ঘড়িতে তখন ১২টা ১৭।


মায়া ধীরে ধীরে তার হাত ছেড়ে দিল।


“এবার আমাকে যেতে হবে।”


রায়হান কাঁদতে কাঁদতে বলল,


“না! আমি আবার তোমাকে হারাতে চাই না!”


মায়া মৃদু হাসল।


“ভালোবাসা মানুষকে কাছে রাখে না, রায়হান। কখনো কখনো ভালোবাসা তাকে মুক্তিও দেয়।”


পরের মুহূর্তে ঘরটি সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে গেল।


আলো ফিরে আসার পর রায়হান একা।


শুধু টেবিলের ওপর পড়ে আছে সেই পুরোনো ছবি।


কিন্তু এবার ছবিতে শুধু রায়হান।


মায়া নেই।


ছবির পেছনে নতুন একটি বাক্য লেখা—


“এবার আমাকে ভুলে যেও না।”


সেদিনের পর রায়হান আর কখনো মায়াকে দেখেনি।


তবে প্রতি বছর একই রাতে, ঠিক ১২টা ১৭ মিনিটে তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে একটি মাত্র মেসেজ আসে—


“আমি জানি তুমি এখনও আমাকে ভালোবাসো।”

০ মন্তব্য · ২১ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!