রাত তখন দুইটা সতেরো।
ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া শেষ রাতের ট্রেনটা কুয়াশা কেটে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে অজানা গন্তব্যের দিকে।
ট্রেনের কামরায় যাত্রী খুব কম। জানালার বাইরে শুধু অন্ধকার—মাঝে মাঝে দূরের কোনো গ্রামের দু-একটি আলো চোখে পড়ে আবার মিলিয়ে যায়।
তন্ময় বসেছিল জানালার পাশে। অফিসের জরুরি কাজে তাকে রাতেই শহরের বাইরে যেতে হচ্ছে। বিপরীতের সিটে বসে থাকা লোকটাকে প্রথম থেকেই তার অস্বাভাবিক লাগছিল।
কালো কোট। মাথায় টুপি। মুখটা প্রায় পুরোপুরি ঢাকা।
লোকটি একবারও কারও সঙ্গে কথা বলছিল না।
হঠাৎ ট্রেনটা একটা ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল।
তন্ময় ঘড়ির দিকে তাকাল।
২:১৭।
অদ্ভুত ব্যাপার—ট্রেন থামার কথা ছিল না।
কিছুক্ষণ পর মাইকে কোনো ঘোষণা ছাড়াই ট্রেন আবার চলতে শুরু করল।
তন্ময় জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল, একটি পুরোনো স্টেশন পিছনে পড়ে যাচ্ছে।
স্টেশনের নামটা পড়তে গিয়ে তার বুক কেঁপে উঠল।
“নিশুতি”
সে সঙ্গে সঙ্গে পাশের লোকটির দিকে তাকাল।
লোকটি এবার তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
— “আপনিও কি প্রথমবার যাচ্ছেন?”
তন্ময় কিছু বলল না।
লোকটি ধীরে ধীরে পকেট থেকে একটি পুরোনো কাগজ বের করল।
কাগজে লেখা—
“এই ট্রেনে আজ একজন যাত্রী মারা যাবে।”
তন্ময়ের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
— “এটা কী?”
লোকটি উত্তর দিল না।
ঠিক তখনই পাশের কামরা থেকে ভেসে এল এক নারীর চিৎকার।
তন্ময় ছুটে গেল।
কামরায় কেউ নেই।
শুধু মেঝেতে পড়ে আছে একটি রক্তমাখা ব্যাগ।
আর ব্যাগের ওপর রাখা একটি মোবাইল ফোন।
ফোনের স্ক্রিনে ভিডিও চলছে।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে—
তন্ময় নিজেই সেই কামরায় দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছে দশ মিনিট পরের সময়ের।
তারপর ভিডিওতে দেখা গেল, তন্ময়ের পেছনে ধীরে ধীরে একজন কালো পোশাকের মানুষ এগিয়ে আসছে।
তন্ময় আতঙ্কে পিছনে ফিরল।
কেউ নেই।
হঠাৎ পেছন থেকে সেই কণ্ঠ—
— “ভিডিওটা শেষ পর্যন্ত দেখুন।”
তন্ময় ঘুরে দাঁড়াতেই দেখল কালো কোট পরা লোকটি তার সামনে দাঁড়িয়ে।
লোকটি এবার টুপিটা খুলল।
তন্ময়ের চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।
কারণ—
লোকটির মুখ হুবহু তন্ময়ের নিজের মুখ।
ট্রেনের আলো নিভে গেল।
মাত্র কয়েক সেকেন্ড পর আলো ফিরে এলো।
কালো কোটের লোকটি নেই।
মেঝেতে পড়ে আছে তন্ময়ের ব্যাগ।
আর জানালার কাচে আঙুল দিয়ে কেউ লিখে রেখেছে—
“পরের স্টেশন—নিশুতি নয়। তোমার শেষ স্টেশন।”
ঠিক তখনই ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠল।
তন্ময় জানালার বাইরে তাকাল।
কিন্তু সেখানে কোনো রেললাইন নেই।
ট্রেনটি ছুটছে অন্ধকারের ভিতর দিয়ে—আকাশের ওপর।
আর কামরার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সব যাত্রী একসঙ্গে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
তাদের কারও মুখ নেই।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!