অবস্থান ও আয়তন: জমিদার বাড়িটি প্রায় ১ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ০.৫ কিলোমিটার প্রস্থ প্রাচীর দিয়ে ঘেরা।প্রধান ভবন: এখানকার প্রধান আকর্ষণগুলোর মধ্যে ১৮৯৯ সালে নির্মিত 'মাসুদ ভিলা' অন্যতম। এটি উঁচু বাংলো আকৃতির এবং চমৎকার কারুকার্যখচিত। প্রায় চারশ বছরের ইতিহাস বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে থাকা এই জমিদারবাড়ি শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি বাংলার জমিদারি ব্যবস্থা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক পরিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল।
কথিত আছে, করটিয়ার জমিদার পরিবারের উত্থান ঘটে সাহা বংশের হাত ধরে। এই পরিবারের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন ওয়াজেদ আলী খান পন্নী। তাঁর সময়েই করটিয়া জমিদার পরিবার ব্যাপক প্রতিপত্তি অর্জন করে। পরবর্তীকালে পন্নী পরিবারের সদস্যরা শিক্ষা ও জনকল্যাণমূলক নানা কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। তাঁদের উদ্যোগে করটিয়া অঞ্চলে গড়ে ওঠে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা ও বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক স্থাপনা।
জমিদারবাড়ির বিশাল প্রাঙ্গণে ঢুকলে মনে হয় যেন কয়েক শতাব্দী পেছনে ফিরে যাওয়া যায়। প্রাসাদের বিভিন্ন অংশে ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতি ও বাংলার ঐতিহ্যবাহী নির্মাণশৈলীর মিশ্রণ দেখা যায়। অলংকৃত দরজা-জানালা, প্রশস্ত বারান্দা, উঁচু প্রাচীর এবং নান্দনিক নকশা তখনকার জমিদারদের ঐশ্বর্য ও রুচির পরিচয় বহন করে। বাড়িটির বিভিন্ন অংশ স্থানীয়ভাবে নানা নামে পরিচিত এবং এর বিস্তৃত প্রাঙ্গণ একসময় জমিদারি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।
তবে এই প্রাসাদের ইতিহাস শুধু রাজকীয় জীবনযাপনের গল্প নয়। উনিশ ও বিশ শতকে করটিয়ার পন্নী পরিবারের কয়েকজন সদস্য শিক্ষা ও সমাজসংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় স্থানীয় মানুষের জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে করটিয়া ধীরে ধীরে টাঙ্গাইল অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকে।
সময়ের স্রোতে বাংলার জমিদারি প্রথার অবসান ঘটে। জমিদারদের ক্ষমতা ও সম্পদ কমে যায়, আর একসময় যে প্রাসাদ ছিল জমিদারি কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র, সেটিও হারাতে থাকে তার পুরোনো জৌলুশ। তবু দেয়ালের গায়ে, পুরোনো ইটের গন্ধে এবং বিস্তৃত আঙিনায় আজও সেই অতীতের গল্প যেন রয়ে গেছে।করটিয়ার জমিদারের শখ ছিল শিকার, গান শোনা ও বিলাসী জীবনযাপন।
আজ করটিয়া জমিদার বাড়ি ইতিহাসপ্রেমী ও দর্শনার্থীদের কাছে একটি আকর্ষণীয় স্থান। এর ভগ্নপ্রায় স্থাপত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ক্ষমতা ও ঐশ্বর্য ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ইতিহাসের স্মৃতি দীর্ঘস্থায়ী। করটিয়ার এই প্রাসাদ তাই শুধু একটি পুরোনো জমিদারবাড়ি নয়; এটি বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্থাপত্যিক অতীতের এক মূল্যবান স্মারক।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!