প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসআমার চাঁদ রাধতে জানে

গল্প ও উপন্যাস

আমার চাঁদ রাধতে জানে

আমার চাঁদ রাধতে জানে

সন্ধ্যা ৭টা বেজে ৩৭ মিনিট। বুকপকেটে ৩০ টাকা আর শুক্লপক্ষের চাঁদসহ চন্দ্রিমা উদ্যানে বসে আছি। নেই চাকরি, নেই আলিসান পরিবার, নেই ফর্সা পিতার কালো অর্থ। চাঁদটা কী বুঝে আমার সাথে লেপ্টে থাকে? চাঁদেরও বোধহয় উত্তরটি জানা নেই। আমার চাঁদ কিন্তু বেশ রাধতে জানে। শুনে বোধহয় আমাকে পাগল ভাবছেন। ভাবুন। সে খিচুড়ি রাধে। ঘি আর মুগডাল দিয়ে সে কী রান্না! সেদিনকার ঘটনা—

উদ্যানে সন্ধ্যা নামার সাথে ফুল-পানি-সিগারেটওয়ালাদের একটা সম্পর্ক আছে। তারা অন্ধকার ভয় পায়। বোধহয় আলোকিত মানুষ। আলো গিয়ে অন্ধকার নামলে তারা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। চাঁদ কিন্তু আমায় বেশ বুঝে। আমার আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে সে অবগত। টিএসসি, রবীন্দ্র সরোবরে দেখি মানুষ তার একান্ত চাঁদ নিয়ে এটা-সেটা খায়, ফ্যান্সি গিফট দেয়, কতশত জায়গায় ঘুরতে গিয়ে মুহর্তবন্দি বাক্স নিয়ে ঘরে ফিরে। সেই হিসাবে আমার চোখের শীতল দৃষ্টি বাদে তাকে দেয়ার কিচ্ছুটি নেই। সে তাতেই সন্তুষ্ট। যে ঘটনার এত সুনিপুণ বর্ণনা করছিলাম তাতেই ফিরে যাই। আমার শুক্লপক্ষের ব্যক্তিগত চাঁদ ওই সন্ধ্যায় খুব করে সেজেছিল। তার পরনের একজোড়া রেশমি চুড়ির টুংটাং আমার বিক্ষিপ্ত মনে প্রশান্তি ফিরিয়ে দিচ্ছিল। দুজন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম আকাশপানে। হঠাৎ চাঁদ আমায় শক্ত করে চেপে ধরল। এতই শক্ত যেন মনে হলো পুরো পৃথিবীর ওজন আমার বাহুডোরে। চাঁদের কপালে হাত রাখার সাধ্য আছে কার? তাও দুঃসাহস পুঁজি করে হাত বাড়িয়ে বুঝলাম— চাঁদেরও জ্বর হয়। আচ্ছা জ্বরে ধবধবে চাঁদ পুড়ে কি কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে? এতক্ষণ চাঁদ পুড়তে দেয়া অন্যায়, মহাপাপ। চাঁদের চাওয়া অতি সামান্য— পানি পান করবে বলে বায়না ধরল। চাঁদ বোধহয় ভুলতে বসেছে উদ্যানে অন্ধকার নেমে আসার সাথে পানি, চাওয়ালাদের চলে যাওয়ার সম্পর্ক আছে, ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক। আমি হন্যে হয়ে পানি খুঁজছিলাম। বুকে চাপা কষ্ট। আচ্ছা পানির মতো বিনামূল্যের অমূল্য প্রাকৃতিকই তো চেয়েছে আমার কাছে। আমি উদ্যানে পাগলের মতো ছুটছি। চিৎকার করে ডাকছি— পানিভাই, ও পানিভাই। অবচেতন মনে কতশত কুচিন্তা। আচ্ছা চাঁদের মৃত্যু হয়? নিশ্চয়ই কোনো ডিগ্রিধারী চাঁদ বিশেষজ্ঞ বলতে পারেন। দূরে আগুনের ফুলকি দেখলাম। আগুনের লেলিহান শিখা আমায় পথ দেখিয়েছে। বলছে, কাছে আয়, এই যে পানি। চাঁদকে বাঁচাবি না? কাছে গিয়ে দেখলাম আগুন মিথ্যা বলেনি। যা বুঝলাম এখানে কিছু লোকের আড্ডা বসেছিল। ডারউইনের যুগ থেকেই কি তারা আমার জন্য বসে আছে? জানি না। এত কিছু ভাবতে ভালো লাগছে না। একটি ক্যাপ খুলে থাকা বোতল পড়ে আছে আগুনের ঠিক পাশে। কিছু পানি অবশিষ্ট আছে। আফসোসে মরে যেতে ইচ্ছে করছে। যেই চাঁদ আমায় পুরো দুনিয়া তুলে দিলো আর তার জন্য আমি একটি মুখবন্ধ পানির বোতল জোগাড় করতে পারলাম না? বিষিয়ে উঠছে ভেতরটা। বোতলটি তুলেই ভোদৌড় দিলাম। চাঁদের কাছে যাওয়ার সাধ্য কার? তালপাতা ভেদ করে চাঁদের আলো চাঁদের ওপর পড়া অবিচার। চাঁদের মুখে স্বর্গছাপ। নাসা যদি সন্ধান পেত তাহলে আমার থেকে "চাঁদ" ছিনিয়ে গবেষণা করত। সবার চাঁদ আকাশে অবস্থান করলেও আমার একক চাঁদ উদ্যানের মাটিতে নিথর হয়ে পড়ে আছে। আমার নার্ভগুলো শান্ত হয়ে পড়েছে। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফ্যালফ্যালিয়ে তাকিয়ে আছি। আচ্ছা আমার শুক্লপক্ষের রাধুনী চন্দ্র শ্বাস নিচ্ছে তো? 

বিজ্ঞাপন


—নাজাত

০ মন্তব্য · ১২ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!