এক বিশাল যাত্রীবাহী জাহাজ দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা শেষে রসদ সংগ্রহের জন্য একটি অচেনা দ্বীপে নোঙর করল। দ্বীপটি দূর থেকে দেখতে অবিশ্বাস্য রকমের সুন্দর লাগছিল।
জাহাজের ক্যাপ্টেন যাত্রীদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দিলেন, "আমরা এখানে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য বিরতি নিচ্ছি।
আপনারা চাইলে দ্বীপে নেমে একটু বিশ্রাম নিতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ করতে পারেন।
কিন্তু মনে রাখবেন, জাহাজের সাইরেন বাজার সাথে সাথেই সবাইকে ফিরে আসতে হবে। কেউ দ্বীপের গহীনে যাবেন না!
যাত্রীরা দ্বীপে নামল। চারদিকে সুমিষ্ট ফলের গাছ, স্নিগ্ধ বাতাস এবং মাটিতে ছড়িয়ে থাকা চকচকে রঙিন পাথর।

যাত্রীরা মূলত তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল,
প্রথম দলের যাত্রীরা:
তারা জানত যে তাদের আসল গন্তব্য অনেক দূরে। তারা দ্বীপের সৌন্দর্যে মুগ্ধ না হয়ে, কেবল প্রয়োজনীয় কিছু ফল ও পানি সংগ্রহ করল এবং দ্রুত জাহাজে ফিরে গেল।
আগে ফেরার কারণে তারা জাহাজের সবচেয়ে আরামদায়ক কেবিনগুলো বেছে নিতে পারল।
দ্বিতীয় দলের যাত্রীরা:
তারা দ্বীপের সৌন্দর্যে কিছুটা ডুবে গেল। তারা গাছতলায় ঘুমাল, ফল খেল এবং বেশ কিছুটা সময় পার করে দিল। হঠাৎ জাহাজের সাইরেন শুনে তাদের টনক নড়ল। তারা তড়িঘড়ি করে দৌড় দিল।
হুড়োহুড়ি করতে গিয়ে কেউ হোঁচট খেল, কারও হাত-পা ছিলে গেল। তবুও তারা শেষ মুহূর্তে কোনোমতে জাহাজে উঠতে পারল। কিন্তু আগে না আসায় তাদের কপালে জুটল জাহাজের সবচেয়ে অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে জায়গাগুলো।
তৃতীয় দলের যাত্রীরা:
এই দলটি ছিল সবচেয়ে দুর্ভাগা। তারা দ্বীপের গহীনে চলে গেল। সেখানে গিয়ে তারা মাটিতে ছড়িয়ে থাকা চকচকে রঙিন পাথর (যা তারা হীরা-জহরত ভেবেছিল) দেখে পাগল হয়ে গেল।
তারা জাহাজের কথা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে পাথর কুড়াতে লাগল।
জাহাজের সাইরেন বাজল, কিন্তু তারা পাথর কুড়ানোর লোভে তা কানেই তুলল না। তারা ভাবল, "আরেকটু সময় নিই, আরও কিছু পাথর নিয়ে তারপর যাব।"
অবশেষে জাহাজটি তাদের রেখেই বন্দর ছেড়ে চলে গেল। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই সেই মায়াবী দ্বীপের আসল রূপ বেরিয়ে এল।
সুন্দর গাছগুলোর আড়াল থেকে বেরিয়ে এল ভয়ংকর সব হিংস্র প্রাণী। আর যে চকচকে পাথরগুলো তারা সারাদিন ধরে কুড়িয়েছিল, অন্ধকারে সেগুলো পরিণত হলো সাধারণ মূল্যহীন পাথরে!
তাদের সামনে তখন অন্ধকার, হিংস্র প্রাণী আর চরম মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট রইল না।
এই রূপক গল্পটি আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতার নিখুঁত চিত্র:
বিশাল জাহাজ: আমাদের পরকালের অনন্ত যাত্রা।
মায়াবী দ্বীপ: এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া। দূর থেকে যাকে খুব সুন্দর ও চিরস্থায়ী মনে হয়।
ক্যাপ্টেনের সাইরেন: আমাদের মৃত্যুর ডাক, যা যেকোনো সময় বেজে উঠতে পারে।
চকচকে পাথর: দুনিয়ার ধন-সম্পদ, ক্ষমতা ও চাকচিক্য। মৃত্যুর পর যার কানাকড়িও কোনো কাজে আসে না।
প্রথম দলের যাত্রীরা হলো সেইসব মুমিন, যারা দুনিয়া থেকে শুধু বেঁচে থাকার রসদটুকু নেয় এবং পরকালের প্রস্তুতি নিয়ে রাখে।
দ্বিতীয় দল হলো তারা, যারা দুনিয়ার মোহে পড়ে পাপ করে, কিন্তু মৃত্যুর আগে তওবা করে ফিরে আসে; যদিও তাদের অনেক আফসোস থেকে যায়।
আর তৃতীয় দলটি হলো গাফেল মানুষ। যারা দুনিয়ার ধোঁকায় পড়ে আখেরাতকে সম্পূর্ণ ভুলে যায়। যখন মৃত্যুর সাইরেন বাজে, তখন তারা একটু সময় ভিক্ষা চায়, কিন্তু তখন আর কোনো সময় দেওয়া হয় না।
মৃত্যুর পর তারা বুঝতে পারে, সারাজীবন তারা যে ধন-সম্পদ আর পদবির পেছনে ছুটেছে, তা আসলে ওই মূল্যহীন পাথরের মতোই ধোঁকা ছাড়া আর কিছুই ছিল না!
আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে দুনিয়ায় ধোঁকা থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন
✍️ ----- নিষাদ ।।
গল্পটা আমাদের জীবনের অনেক গুরুত্তপুর্ন ভুমিকা রাকবে।