রাত তখন সাড়ে এগারোটা। শীতের কুয়াশায় ঢেকে গেছে পুরো রেললাইন। দূরে কোথাও ট্রেনের হুইসেল শোনা যাচ্ছে। রেললাইনের পাশে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান। দোকানের সামনে কাঠের বেঞ্চ, টিনের চাল আর একটি পুরোনো হারিকেন। দিনের বেলা এখানে মানুষের ভিড় থাকলেও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জায়গাটা নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
দোকানটির মালিক হাশেম। বয়স প্রায় পঞ্চাশ। গত পনেরো বছর ধরে সে এই দোকান চালাচ্ছে। গ্রামের মানুষ বলে, হাশেমের দোকানের চা নাকি খুব ভালো। কিন্তু দোকানের পেছনের গল্প কেউ জানে না।
শুধু হাশেম জানে।
আর জানে সেই রাতের বাতাস।
১. দোকানের পেছনে যে গন্ধ
হাশেম প্রতিদিন রাত বারোটার মধ্যে দোকান বন্ধ করে। কিন্তু সেদিন রাতে অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটল।
দোকান গুটিয়ে নেওয়ার সময় হঠাৎ বাতাসে একটা গন্ধ পেল সে।
লাশের গন্ধ।
পচা মাংসের মতো ভারী, অসহ্য একটা গন্ধ। প্রথমে সে ভাবল, হয়তো রেললাইনের পাশে কোনো পশু মরে পড়ে আছে। কিন্তু গন্ধটা আসছিল দোকানের পেছন থেকে।
হাশেম হারিকেন হাতে নিয়ে পেছনে গেল।
সেখানে একটা পুরোনো বটগাছ। গাছের নিচে ভাঙা বেঞ্চ আর কিছু শুকনো কাঠ। তার পরেই ঝোপঝাড়।
কোথাও কিছু দেখা গেল না।
কিন্তু গন্ধটা আরও তীব্র হলো।
হাশেম নাক চেপে ধরে বলল,
—কে আছে ওখানে?
কোনো উত্তর নেই।
শুধু ঝোপের ভেতর থেকে একটা শব্দ এল।
খস... খস...
যেন কেউ শুকনো পাতার ওপর দিয়ে হাঁটছে।
হাশেম আর এগোল না। দোকানে ফিরে এসে দরজা বন্ধ করে দিল।
কিন্তু সারা রাত সেই গন্ধ তার নাকের কাছে লেগে রইল।
২. পুরোনো রেলকর্মীর কথা
পরদিন সকালে দোকানে চা খেতে এলেন আবদুল কাদের। তিনি একসময় রেলের কর্মচারী ছিলেন। এখন অবসর নিয়েছেন।
হাশেম আগের রাতের ঘটনা বলতেই কাদের সাহেব চুপ করে গেলেন।
—তুই কি দোকানের পেছনে গিয়েছিলি?
—হ্যাঁ।
—রাতে?
—হ্যাঁ।
কাদের সাহেব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—ওখানে রাতে যাস না।
হাশেম হেসে বলল,
—কেন? ভূত আছে নাকি?
কাদের সাহেব চায়ের কাপ নামিয়ে বললেন,
—ভূত আছে কি না জানি না। তবে ওই জায়গায় একটা ঘটনা ঘটেছিল। অনেক বছর আগে।
হাশেম আগ্রহী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—কী ঘটনা?
কাদের সাহেব চারপাশে তাকিয়ে নিচু গলায় বললেন,
—প্রায় বিশ বছর আগে, এক শীতের রাতে একটা মালগাড়ি এখানে দাঁড়িয়ে ছিল। ট্রেনের এক কর্মচারী নিখোঁজ হয়ে যায়। পরে তার লাশ পাওয়া যায় রেললাইনের পাশের ঝোপে।
হাশেম বলল,
—দুর্ঘটনা?
—কেউ জানে না। কিন্তু তার লাশের কাছে একটা পুরোনো লাল কাপড় পাওয়া গিয়েছিল। আর তার শরীর থেকে নাকি অদ্ভুত গন্ধ বের হচ্ছিল।
হাশেমের মুখ শুকিয়ে গেল।
—লাল কাপড়?
কাদের সাহেব মাথা নাড়লেন।
—হ্যাঁ। সেই কাপড়টা পরে আর কখনো পাওয়া যায়নি।
৩. মাঝরাতের ক্রেতা
সেদিন রাতে হাশেম দোকান একটু আগেই বন্ধ করল। কিন্তু রাত সাড়ে দশটার দিকে একজন লোক এসে দোকানের সামনে দাঁড়াল।
লোকটির গায়ে পুরোনো ধূসর পাঞ্জাবি। মাথায় টুপি। মুখটা কুয়াশায় ঢাকা।
সে বলল,
—এক কাপ চা হবে?
হাশেম অবাক হলো।
এত রাতে এই লোক কোথা থেকে এল?
তবু চা বানিয়ে দিল।
লোকটি চায়ের কাপ হাতে নিয়ে রেললাইনের দিকে তাকিয়ে রইল।
হাশেম জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কোথায় যাবেন?
লোকটি ধীরে ধীরে বলল,
—ট্রেনের অপেক্ষায় আছি।
—কোন ট্রেন?
লোকটি উত্তর দিল না।
শুধু চায়ে চুমুক দিল।
কিছুক্ষণ পর হাশেম খেয়াল করল, লোকটির পায়ের নিচে কোনো ছায়া নেই।
তার হাত থেকে চায়ের কাপ পড়ে গেল।
ঠং!
লোকটি ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
তার মুখে কোনো চোখ নেই।
শুধু অন্ধকার।
হাশেম চিৎকার করতে গিয়েও পারল না।
লোকটি বলল,
—আমার গন্ধ পাচ্ছিস?
হাশেমের বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।
চারপাশে হঠাৎ সেই পচা গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।
লোকটি উঠে দাঁড়াল।
—আমাকে পেছনে নিয়ে চল।
হাশেম পিছিয়ে গেল।
—না... না...
লোকটি ধীরে ধীরে দোকানের পেছনের দিকে হাঁটতে লাগল।
তার পায়ের শব্দ হচ্ছিল না।
কিন্তু মাটিতে ভেজা পায়ের ছাপ পড়ছিল।
৪. দোকানের পিছনের মাটি
হাশেম ভয়ে জমে গেলেও লোকটির পেছনে গেল। দোকানের পেছনে পৌঁছাতেই লোকটি থামল।
তারপর মাটির দিকে তাকিয়ে বলল,
—এখানে খুঁড়ে দেখ।
হাশেম কাঁপতে কাঁপতে বলল,
—কী?
লোকটি আঙুল তুলে একটা জায়গা দেখাল।
সেখানে মাটি একটু উঁচু হয়ে আছে।
হাশেম হারিকেনটা মাটিতে রেখে একটা লোহার রড দিয়ে খোঁচাতে শুরু করল।
প্রথমে কিছুই হলো না।
তারপর রডটা শক্ত কিছুর সঙ্গে ঠেকে গেল।
ঠক!
হাশেম মাটি সরাল।
একটা পুরোনো লোহার বাক্স বেরিয়ে এল।
বাক্সের ওপর মরিচা পড়ে আছে। তালাটা ভাঙা।
হাশেম বাক্স খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল তীব্র পচা গন্ধ।
তারপর একটা লাল কাপড়।
আর কাপড়ের নিচে একটা পুরোনো রেলকর্মীর পরিচয়পত্র।
নাম লেখা—
মোস্তফা হোসেন।
হাশেমের মাথা ঘুরে গেল।
কাদের সাহেবের বলা সেই নিখোঁজ রেলকর্মী!
হঠাৎ পেছন থেকে কণ্ঠ ভেসে এল,
—আমার জিনিস পেয়েছিস?
হাশেম ঘুরে তাকাল।
লোকটি দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু এবার তার মুখ দেখা যাচ্ছে।
মুখের চামড়া নেই।
চোখের জায়গায় গভীর গর্ত।
আর ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে কালো পোকা বের হচ্ছে।
হাশেম চিৎকার করে উঠল।
লোকটি বলল,
—আমাকে ট্রেনের নিচে ফেলে দিয়েছিল তারা।
হাশেম কাঁপতে কাঁপতে বলল,
—কারা?
লোকটি ধীরে ধীরে হাসল।
—যারা এখনো এই দোকানে আসে।
বাকিটুকু পরের পর্বে
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!