প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসফেরিওয়ালা

গল্প ও উপন্যাস

ফেরিওয়ালা

ফেরিওয়ালা


রাত তখন প্রায় সাড়ে বারোটা।

বিজ্ঞাপন

শহরের শেষ প্রান্তের সেই পুরোনো মহল্লায় দিনের বেলাতেও খুব একটা মানুষ চলাচল করত না। আর রাত হলে জায়গাটা যেন অন্য কোনো জগতে পরিণত হতো।

সেদিনও চারপাশ নিস্তব্ধ।

হঠাৎ দূর থেকে ভেসে এলো একটা পরিচিত ডাক—

“পুরোনো জিনিস দেবেন? পুরোনো জিনিস… বদলে নতুন জিনিস নেবেন?”

সায়েম জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

ডাকটা শুনে তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল।

কারণ এই ডাক সে ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছে।

তার বাবা বলতেন,

“রাতে যদি ওই ফেরিওয়ালার ডাক শুনিস, জানালা খুলবি না।”

সায়েম তখন এসব কথায় হাসত।

কিন্তু আজ তার বাবা বেঁচে নেই।

আর প্রায় পনেরো বছর পর আবার সেই ডাক!

সে পর্দা সরিয়ে নিচে তাকাল।

রাস্তার হলুদ বাতির নিচে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। মাথায় মলিন টুপি, গায়ে পুরোনো বাদামি চাদর। হাতে একটা বিশাল বাঁশের ঝুড়ি।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো—

লোকটির ছায়া দেখা যাচ্ছে না।

সায়েম চোখ কচলে আবার তাকাল।

লোকটা তখন তার বাড়ির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

তারপর ধীরে ধীরে হাত তুলল।

আঙুল দিয়ে ইশারা করল—

নিচে আসুন।

সায়েমের বুক কেঁপে উঠল।

ঠিক তখনই দরজায় তিনবার টোকা পড়ল।

ঠক… ঠক… ঠক…

সায়েম স্থির হয়ে গেল।

তারপর দরজার ওপাশ থেকে ভেসে এলো কণ্ঠস্বর—

“বাবু… আপনার বাবার জিনিস আছে আমার কাছে।”

সায়েমের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

তার বাবা মারা যাওয়ার সময় সঙ্গে থাকা কিছু জিনিস ছাড়া আর কোনো স্মৃতি তার কাছে ছিল না।

সে ধীরে ধীরে দরজার কাছে গেল।

“কী জিনিস?”

ওপাশ থেকে উত্তর এলো—

“যেটা আপনার বাবা আমাকে দিয়ে গিয়েছিলেন।”

সায়েম দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে তাকাল।

কেউ নেই।

কিন্তু একটা ছোট কাঠের বাক্স দরজার সামনে পড়ে আছে।

বাক্সটার ওপর খোদাই করা—

“সায়েমের জন্য।”

কাঁপা হাতে বাক্সটা তুলে নিল সে।

ভেতরে ছিল একটা পুরোনো পকেটঘড়ি।

ঘড়িটা দেখে সায়েমের মাথা ঝিমঝিম করে উঠল।

এটা তার বাবার ঘড়ি।

কিন্তু ঘড়িটা থেমে আছে ঠিক ১২টা ১৭ মিনিটে।

সায়েমের বাবা মারা গিয়েছিলেন রাত ১২টা ১৭ মিনিটে।

হঠাৎ ঘড়িটা চলতে শুরু করল।

টিক… টিক… টিক…

তারপর ঘড়ির ভেতর থেকে খুব ক্ষীণ একটা শব্দ শোনা গেল—

“ওকে বিশ্বাস করিস না…”

সায়েম ঘড়িটা হাত থেকে ফেলে দিল।

ঠিক তখনই বাইরে আবার সেই ডাক—

“পুরোনো জিনিস দেবেন? পুরোনো জিনিস…”

সায়েম সাহস করে জানালা দিয়ে তাকাল।

ফেরিওয়ালা আর রাস্তায় নেই।

কিন্তু তার বাড়ির সামনে পড়ে আছে একটা পুরোনো ছবি।

সায়েম নিচে গিয়ে ছবিটা তুলে আনল।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে—

পনেরো বছর আগের সেই মহল্লা।

ছবির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে তার বাবা।

আর বাবার পাশে—

সেই একই ফেরিওয়ালা।

একই মুখ।

একই পোশাক।

একই বয়স।

সায়েমের হাত থেকে ছবিটা পড়ে গেল।

পনেরো বছর ধরে একজন মানুষের বয়স কীভাবে একটুও বাড়ে না?

তারপর ছবির পেছনে লেখা কয়েকটি শব্দ তার চোখে পড়ল—

“যেদিন সে আবার আসবে, সেদিন সত্যিটা জানতে পারবে।”

সায়েমের মাথায় বাবার মৃত্যুর আগের রাতের কথা মনে পড়ে গেল।

বাবা তাকে বলেছিলেন—

“কখনো যদি কোনো ফেরিওয়ালা তোর কাছে পুরোনো জিনিসের বিনিময়ে নতুন কিছু দিতে চায়, কিছুই নিবি না।”

সায়েম তখন বুঝতে পারেনি।

এখন বুঝতে পারছে।

পরদিন সকালে সে মহল্লার সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ কাদের চাচার কাছে গেল।

সব শুনে কাদের চাচা দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

“তোর বাবা একবার ওর কাছ থেকে একটা জিনিস নিয়েছিল।”

“কী?”

“একটা আয়না।”

“তারপর?”

কাদের চাচা জানালার বাইরে তাকালেন।

“সেই আয়নায় মানুষ নিজের মুখ দেখত না।”

সায়েমের গলা শুকিয়ে গেল।

“তাহলে কী দেখত?”

কাদের চাচা ফিসফিস করে বললেন—

“নিজের ভবিষ্যৎ।”

সায়েম আর কিছু বলল না।

সেই রাতেই ফেরিওয়ালা আবার এল।

কিন্তু এবার সে একা নয়।

তার ঝুড়িতে অসংখ্য পুরোনো জিনিস—

ঘড়ি, ছবি, চিঠি, খেলনা, চশমা…

আর একেবারে নিচে রাখা সেই আয়না।

ফেরিওয়ালা বলল,

“তোর বাবার দেনা বাকি আছে।”

“কী দেনা?”

“সে নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে চেয়েছিল।”

সায়েম পিছিয়ে গেল।

“আমার বাবার কী হয়েছিল?”

ফেরিওয়ালা মৃদু হাসল।

“যেটা সে আয়নায় দেখেছিল, সেটা বদলাতে চেয়েছিল।”

“কী দেখেছিল?”

লোকটা আয়নাটা সামনে ধরল।

সায়েম আয়নায় তাকাল।

প্রথমে নিজের মুখই দেখল।

তারপর দৃশ্য বদলে গেল।

সে দেখল—

একটি অন্ধকার ঘর।

মেঝেতে পড়ে আছে তার বাবা।

আর তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে…

সায়েম নিজেই।

তার হাতে একটি ছুরি।

সায়েম আতঙ্কে আয়না থেকে মুখ সরিয়ে নিল।

“এটা মিথ্যা!”

ফেরিওয়ালা শান্ত গলায় বলল,

“ভবিষ্যৎ কখনো মিথ্যা বলে না।”

“তাহলে আমার বাবা আমাকে কেন কিছু বলেনি?”

ফেরিওয়ালা এবার ঝুড়ির ভেতর থেকে একটি পুরোনো চিঠি বের করল।

“কারণ সে জানত, সত্যিটা জানলে তুই সেই ভবিষ্যৎ বদলাতে যাবি।”

সায়েম চিঠিটা খুলল।

বাবার হাতের লেখা—

“সায়েম,

যদি এই চিঠি তোর হাতে আসে, বুঝবি আমি হেরে গেছি। ফেরিওয়ালা আসলে মানুষ নয়। সে এমন জিনিস বিক্রি করে, যার দাম টাকা দিয়ে দিতে হয় না। সে মানুষের ভয় কিনে নেয়, আর বিনিময়ে তাদের ভবিষ্যৎ দেয়।

কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস—

আয়নায় যা দেখিস, সেটা ভবিষ্যৎ নয়। সেটা হলো তোর সবচেয়ে বড় ভয়।”

সায়েম ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

ফেরিওয়ালা তখন আর সেখানে নেই।

রাস্তা ফাঁকা।

শুধু দূরে তার ডাক ভেসে আসছে—

“পুরোনো ভয় দেবেন? নতুন জীবন নেবেন?”

সায়েম দৌড়ে ঘরে ফিরে আয়নাটার সামনে দাঁড়াল।

আবার তাকাল।

এবার আয়নায় সে দেখল—

তার বাবা দাঁড়িয়ে আছেন।

বাবা মৃদু হেসে বললেন,

“ভয় পেয়েছিলি?”

সায়েমের চোখে পানি চলে এলো।

“বাবা…”

হঠাৎ আয়নার ভেতরের বাবা ঠোঁটে আঙুল রাখলেন।

চুপ।

তারপর ধীরে ধীরে পেছনে তাকালেন।

সায়েমও ঘুরে তাকাল।

ঘরের দরজা খোলা।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সেই ফেরিওয়ালা।

তার হাতে পুরোনো ঝুড়ি।

সে হাসছে।

আর ঝুড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে অসংখ্য কণ্ঠ—

“পুরোনো জিনিস দেবেন?”

“পুরোনো স্মৃতি দেবেন?”

“পুরোনো ভয় দেবেন?”

ফেরিওয়ালা এবার সায়েমের দিকে তাকিয়ে বলল—

“তোর বাবার জিনিসটা তো দিয়ে গেলাম। এবার তোর পালা।”

সায়েম পেছনে তাকাল।

আয়নার ভেতর তার নিজের প্রতিবিম্ব নেই।

শুধু অন্ধকার।

আর সেই অন্ধকারের মাঝখানে—

একটি নতুন মুখ।

ফেরিওয়ালার মুখ।

সেই রাতের পর মহল্লার মানুষ আর কখনো সায়েমকে দেখেনি।

তবে প্রায় প্রতি বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে বারোটার দিকে একটি ফেরিওয়ালা সেই গলিতে আসে।

তার হাতে থাকে পুরোনো একটি ঝুড়ি।

আর সে ডাকতে ডাকতে হাঁটে—

“পুরোনো জিনিস দেবেন?

পুরোনো জিনিস…

বদলে নতুন জীবন নেবেন?”

০ মন্তব্য · ৩৩ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!