প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসহারিয়ে ফেলা একটি নীল চোখের মেয়ে

গল্প ও উপন্যাস

হারিয়ে ফেলা একটি নীল চোখের মেয়ে

হারিয়ে ফেলা একটি নীল চোখের মেয়ে


কিছু মানুষকে আমরা খুব অল্প সময়ের জন্য দেখি।

বিজ্ঞাপন


কিন্তু সেই অল্প সময়টাই কখনো কখনো পুরো জীবনকে বদলে দেয়।


আর কিছু চোখ...


একবার দেখলে সেগুলোকে আর কোনো ভিড়ের মধ্যে ভুলে থাকা যায় না।


---


১. প্রথম দেখা


সেদিন বিকেলে আকাশটা অদ্ভুত সুন্দর ছিল।


শহরের ব্যস্ত রেলস্টেশনে হাজার মানুষের ভিড়। কেউ ট্রেনে উঠছে, কেউ নামছে, কেউ ছুটছে গন্তব্যের দিকে।


আরিফ দাঁড়িয়ে ছিল প্ল্যাটফর্মের এক কোণে।


তার হাতে একটা পুরোনো ক্যামেরা।


হঠাৎ ভিড়ের মাঝখান থেকে মেয়েটিকে দেখা গেল।


নীল ওড়না।


এলোমেলো কালো চুল।


আর...


অবিশ্বাস্য নীল চোখ।


আরিফের ক্যামেরা অজান্তেই তার দিকে উঠে গেল।


একটা ছবি।


ক্লিক!


মেয়েটি ঠিক তখনই আরিফের দিকে তাকাল।


দুজনের চোখাচোখি হলো।


মেয়েটি মৃদু হাসল।


তারপর বলল,


— “আমার ছবি তুললেন?”


আরিফ একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল।


— “সরি... আসলে আপনার চোখটা...”


মেয়েটি হেসে বলল,


— “চোখের ছবি তুলতে গেলে মানুষটার গল্পটাও জানতে হয়।”


আরিফ কিছু বলার আগেই ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠল।


মেয়েটি দ্রুত ট্রেনে উঠে গেল।


দরজা বন্ধ হওয়ার আগে জানালা দিয়ে আবার তাকাল।


তার ঠোঁটে সেই রহস্যময় হাসি।


আরিফ দৌড়ে ট্রেনের পাশে গেল।


মেয়েটি জানালার ওপাশ থেকে হাত নাড়ল।


তারপর ট্রেন চলে গেল।


আরিফ তখনও দাঁড়িয়ে।


সে জানত না—


এই কয়েক সেকেন্ডের দেখা তার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ অপেক্ষায় পরিণত হবে।


---


২. ছবির রহস্য


সেদিন রাতে ক্যামেরার ছবিগুলো দেখতে বসে আরিফ থমকে গেল।


মেয়েটির ছবির পেছনে একটি অদ্ভুত জিনিস দেখা যাচ্ছে।


স্টেশনের দেওয়ালে লেখা—


“নীল পাহাড়—শেষ দেখা।”


আরিফ অবাক হলো।


ছবিটা জুম করতেই আরও একটি জিনিস চোখে পড়ল।


মেয়েটির হাতে একটা ছোট কাগজ।


তাতে লেখা—


“আমি যদি হারিয়ে যাই, আমাকে খুঁজবে?”


আরিফের বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল।


সে জানত না মেয়েটির নাম।


জানত না সে কোথায় থাকে।


শুধু জানত—


তার চোখ নীল।


আর তার গন্তব্য সম্ভবত পাহাড়ের কোনো এক অচেনা জায়গা।


---


৩. খোঁজ শুরু


পরদিন আরিফ আবার সেই স্টেশনে গেল।


টিকিট কাউন্টারের লোকজনকে জিজ্ঞেস করল।


কেউ কিছু জানে না।


চায়ের দোকানদার বলল,


— “নীল ওড়না পরা মেয়েটা? হ্যাঁ, দেখেছি। মাঝে মাঝে আসে।”


— “কোথায় যায়?”


লোকটি একটু ভেবে বলল,


— “সবসময় একই ট্রেনে ওঠে। উত্তর দিকের ট্রেন।”


— “নাম?”


— “জানি না।”


কিন্তু আরেকজন বৃদ্ধ কুলি একটা কথা বললেন।


— “ও মেয়েটার নাম মীরা।”


আরিফ চমকে গেল।


— “আপনি নিশ্চিত?”


বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন,


— “পুরোপুরি না। তবে কয়েক মাস আগে একবার ওর ব্যাগে একটা নাম দেখেছিলাম—মীরা।”


এই একটি নামই যথেষ্ট ছিল।


আরিফ সিদ্ধান্ত নিল—


সে মীরাকে খুঁজবে।


---


৪. পাহাড়ের পথে


দুই দিন পর আরিফ ট্রেনে উঠল।


গন্তব্য—


এক অচেনা পাহাড়ি শহর।


ট্রেন যত এগোতে লাগল, শহর পিছনে পড়ে গেল।


জানালার বাইরে বদলে গেল দৃশ্য।


ধানক্ষেত।


নদী।


তারপর পাহাড়।


কিন্তু মীরা কোথাও নেই।


শেষ স্টেশনে নেমে আরিফ জানতে পারল, মেয়েটি কয়েক সপ্তাহ আগে এখানে এসেছিল।


একজন স্থানীয় দোকানি তাকে একটা ছোট্ট কাগজ দিল।


কাগজে মাত্র তিনটি শব্দ—


“নীল লেকের ওপারে।”


---


৫. অচেনা পথ


পাহাড়ের সরু পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যা নেমে এল।


চারপাশে কুয়াশা।


আরিফের মনে হচ্ছিল কেউ যেন তাকে অনুসরণ করছে।


হঠাৎ পেছনে পায়ের শব্দ।


সে ঘুরে দাঁড়াল।


কেউ নেই।


আবার হাঁটতে শুরু করল।


কিছুদূর যেতেই একটা পুরোনো কাঠের বাড়ি দেখতে পেল।


দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল একজন বৃদ্ধ।


আরিফ মীরার ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল,


— “এই মেয়েটিকে দেখেছেন?”


বৃদ্ধ অনেকক্ষণ ছবিটির দিকে তাকিয়ে থাকলেন।


তারপর ধীরে বললেন,


— “তুমি অবশেষে এলে?”


আরিফ অবাক।


— “আপনি আমাকে চেনেন?”


বৃদ্ধ কোনো উত্তর দিলেন না।


শুধু একটা চিঠি এগিয়ে দিলেন।


চিঠির ওপরে লেখা—


“আরিফের জন্য।”


আরিফের হাত কাঁপতে শুরু করল।


সে চিঠি খুলল।


---


৬. মীরার চিঠি


«“আরিফ,


তুমি হয়তো ভাবছ, আমি তোমাকে কেন কিছু না বলে চলে গেলাম।


সত্যিটা হলো, আমি পালাইনি।


আমি নিজেকেই লুকিয়েছিলাম।


তোমার সঙ্গে সেই কয়েক মিনিটের দেখা আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত ছিল।


কিন্তু আমার জীবনে এমন কিছু ছিল, যেটা তোমাকে জানালে হয়তো তুমি আর আমাকে খুঁজতে আসতে না।


তাই আমি তোমাকে একটা পথ দেখিয়ে গেলাম।


যদি সত্যিই আমাকে খুঁজতে চাও—


নীল লেকের ওপারে এসো।


সেখানে তুমি আমাকে পাবে।


অথবা আমার গল্পের শেষটা পাবে।”»


চিঠির নিচে একটি ছোট্ট নীল ফুল আঁকা।


আরিফ চিঠিটা বুকের কাছে চেপে ধরল।


পরদিন ভোরে সে নীল লেকের দিকে রওনা হলো।


---


৭. নীল লেক


পাহাড়ের ওপরে উঠে হঠাৎ তার চোখের সামনে বিশাল নীল জলরাশি।


লেকটা যেন আকাশের একটা অংশ পাহাড়ের মাঝে এসে পড়ে আছে।


আর লেকের ধারে দাঁড়িয়ে—


একজন মেয়ে।


নীল ওড়না বাতাসে উড়ছে।


কালো চুল।


আর সেই নীল চোখ।


আরিফ থেমে গেল।


মেয়েটি ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল।


মীরা।


দুজনের চোখে চোখ পড়ল।


মীরা মৃদু হাসল।


— “তুমি সত্যিই এসেছ?”


আরিফ ধীরে বলল,


— “তুমি বলেছিলে খুঁজতে।”


মীরা চোখ নামিয়ে বলল,


— “আমি ভেবেছিলাম তুমি হয়তো মাঝপথে ফিরে যাবে।”


— “আমি তোমার চোখের ছবি তুলেছিলাম।”


মীরা তাকাল।


— “তারপর?”


আরিফ ক্যামেরাটা বের করল।


— “তারপর বুঝলাম, ছবিটা অসম্পূর্ণ।”


মীরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,


— “কেন?”


আরিফ হাসল।


— “কারণ ছবিতে তুমি ছিলে, কিন্তু তোমার গল্পটা ছিল না।”


মীরার চোখে পানি জমে উঠল।


---


৮. আসল রহস্য


মীরা ধীরে ধীরে সব বলল।


তার পরিবার ভেঙে যাওয়ার পর সে শহর ছেড়ে পাহাড়ে চলে এসেছিল।


কারও সঙ্গে যোগাযোগ রাখেনি।


নিজের পরিচয়ও লুকিয়ে রেখেছিল।


কারণ সে ভয় পাচ্ছিল—


আবার কাউকে ভালোবাসলে আবার হারিয়ে ফেলবে।


আরিফ শান্তভাবে শুনছিল।


শেষে বলল,


— “তাহলে আমাকে এত দূর ডেকে আনলে কেন?”


মীরা তার দিকে তাকাল।


— “কারণ তোমাকে হারানোর ভয়টা... তোমাকে পাওয়ার ইচ্ছার চেয়ে ছোট হয়ে গিয়েছিল।”


আরিফ কিছু বলল না।


শুধু হাত বাড়িয়ে দিল।


মীরা কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে তার হাত ধরল।


পাহাড়ের ওপর তখন সূর্য ডুবে যাচ্ছে।


আকাশের রং বদলে যাচ্ছে।


নীল থেকে কমলা।


কমলা থেকে লাল।


---


৯. ফিরে আসা


কয়েক মাস পর তারা আবার সেই পুরোনো রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে।


একই প্ল্যাটফর্ম।


একই রেললাইন।


কিন্তু এবার মীরা হারিয়ে যাচ্ছে না।


ট্রেন আসার শব্দ শোনা গেল।


আরিফ মীরার দিকে তাকিয়ে বলল,


— “এবার কোথায় যাচ্ছি?”


মীরা হেসে বলল,


— “যেখানে তুমি যাবে, সেখানেই।”


ট্রেন ছাড়ল।


জানালার পাশে বসে মীরা বাইরে তাকিয়ে রইল।


আরিফ ক্যামেরা বের করল।


— “আবার ছবি?”


মীরা হেসে বলল,


— “এবার অনুমতি নিয়ে।”


ক্লিক!


ছবিতে ধরা পড়ল মীরার নীল চোখ।


কিন্তু এবার ছবির নিচে আর কোনো প্রশ্ন ছিল না।


ছিল শুধু একটি বাক্য—


“হারিয়ে যাওয়া মানুষ সবসময় হারিয়ে যায় না। কেউ কেউ ফিরে আসে, যদি সত্যিকারের কেউ তাকে খুঁজতে থাকে।”


ট্রেনটা অন্ধকারের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেল।


আর জানালার কাঁচে পাশাপাশি প্রতিফলিত হলো দুটো মুখ।


একজনের চোখে ভালোবাসা।


অন্যজনের চোখে ফিরে পাওয়ার শান্তি।


শেষ।

০ মন্তব্য · ২৩ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!