প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসশ্মশানঘাটের শেষ চিতা "একটি লোমহর্ষক ভৌতিক গল্প"-পর্ব-১

গল্প ও উপন্যাস

শ্মশানঘাটের শেষ চিতা "একটি লোমহর্ষক ভৌতিক গল্প"-পর্ব-১

শ্মশানঘাটের শেষ চিতা "একটি লোমহর্ষক ভৌতিক গল্প"-পর্ব-১

শ্মশানঘাটের শেষ চিতা

একটি লোমহর্ষক ভৌতিক গল্প

বিজ্ঞাপন

---চরিত্র: শরিফ, টিটু ও রুমি


যে রাতে সবকিছু শুরু হয়েছিল


শীতের রাত। চারপাশে ঘন কুয়াশা। গ্রামের শেষ প্রান্তে নদীর ধারে একটি পুরোনো শ্মশানঘাট। দিনের বেলাতেও সেখানে মানুষ খুব একটা যায় না। আর রাত হলে তো কথাই নেই।


লোকমুখে শোনা যায়, বহু বছর আগে ওই শ্মশানঘাটে এক নববধূর দেহ পোড়ানো হয়েছিল। কিন্তু চিতা নিভে যাওয়ার পর তার দেহের কিছুই পাওয়া যায়নি। শুধু পড়ে ছিল একটি লাল শাড়ির আঁচল আর একজোড়া রুপোর নূপুর।


তারপর থেকেই নাকি মাঝরাতে শ্মশানঘাট থেকে ভেসে আসে একজন নারীর কান্না।


কেউ বলে, সে তার স্বামীকে খুঁজে বেড়ায়। কেউ বলে, সে নিজের দেহ খুঁজছে। আবার কেউ কেউ দাবি করে, রাত বারোটার পর শ্মশানঘাটের কাছে গেলে সেই নারী পথচারীদের নাম ধরে ডাকে।


কিন্তু গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ এসব বিশ্বাস করত না।


শরিফ, টিটু আর রুমি ছিল একই গ্রামের তিন বন্ধু। তিনজনের স্বভাব তিন রকম। শরিফ একটু সাহসী, টিটু সবকিছু নিয়ে মজা করে, আর রুমি ছিল শান্ত স্বভাবের হলেও ভৌতিক গল্প শুনতে তার খুব ভালো লাগত।


একদিন সন্ধ্যায় চায়ের দোকানে বসে টিটু বলল,


—শুনছিস, আজ আবার নাকি শ্মশানঘাটে কান্নার শব্দ পাওয়া গেছে!


শরিফ হেসে বলল,


—কান্না না, শিয়াল ডেকেছে। তোরা সবকিছুকে ভূত বানাস।


রুমি চুপচাপ চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে ছিল।


টিটু তার দিকে তাকিয়ে বলল,


—কী রে, তুই চুপ কেন?


রুমি ধীরে ধীরে বলল,


—আমার দাদি বলেছে, ওই ঘাটে রাতের বেলা কেউ গেলে তার নাম ধরে ডাক শুনতে পায়। কিন্তু কোনোভাবেই পেছনে তাকানো যাবে না।


টিটু হেসে উঠল।


—তোর দাদি তোকে ছোটবেলায় ভয় দেখিয়েছে। তুই এখনো বিশ্বাস করিস?


শরিফ বলল,


—চল, আজ রাতেই দেখে আসি। তিনজন একসঙ্গে গেলে ভূত থাকলে তাকেও ভয় দেখাব।


রুমি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।


—না, আজ যাস না। আজ অমাবস্যা।


টিটু টেবিলে হাত চাপড়ে বলল,


—এই তো! আজই যেতে হবে। অমাবস্যার রাতে ভূত না দেখলে কবে দেখব?


শরিফও রাজি হয়ে গেল।


সিদ্ধান্ত হলো, রাত সাড়ে এগারোটায় তারা তিনজন শ্মশানঘাটে যাবে।


কেউ জানত না, সেই সিদ্ধান্ত তাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর রাতের শুরু।



অন্ধকারের পথে


রাত সাড়ে এগারোটা।


গ্রামের ঘরগুলো একে একে অন্ধকার হয়ে গেছে। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে। বাতাসে কুয়াশার গন্ধ। আকাশে চাঁদ নেই, শুধু অসংখ্য তারা।


শরিফ হাতে টর্চ নিয়ে হাঁটছিল। তার পাশে টিটু, আর একটু পেছনে রুমি।


টিটু বলল,


—রুমি, তুই এত পেছনে হাঁটছিস কেন? ভূত যদি আগে আমাকে ধরে, তুই তো বেঁচে যাবি!


রুমি বিরক্ত হয়ে বলল,


—চুপ কর তো। সব সময় মজা ভালো লাগে না।


শরিফ হেসে বলল,


—আরে, ভয় পাস না। আমরা তো আছি।


তারা গ্রামের শেষ বাড়িটা পেরিয়ে বাঁশঝাড়ের কাছে পৌঁছাল। এখান থেকেই শুরু হয়েছিল সেই পথ, যেটা নদীর ধারে শ্মশানঘাটে গিয়ে শেষ হয়েছে।


বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে বাতাস বয়ে যাচ্ছিল।


সাঁই... সাঁই...


হঠাৎ টর্চের আলো কয়েকবার জ্বলে নিভে গেল।


টিটু বলল,


—এই ব্যাটারি শেষ নাকি?


শরিফ টর্চটা ঝাঁকিয়ে আবার জ্বালাল।


—না, ঠিকই তো আছে।


রুমি থেমে গেল।


—শুনছিস?


দুজনেই থামল।


দূর থেকে যেন কোনো নারী খুব আস্তে আস্তে কাঁদছে।


হুঁ... হুঁ... হুঁ...


টিটুর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।


—এটা কীসের শব্দ?


শরিফ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,


—কোনো বাড়ি থেকে আসছে হয়তো।


কিন্তু ওই পথের আশেপাশে কোনো বাড়ি ছিল না।


শুধু বাঁশঝাড়, কুয়াশা আর অন্ধকার।


তারা আবার হাঁটতে শুরু করল।


কিছুদূর যাওয়ার পর রুমি হঠাৎ বলল,


—শরিফ, তুই কি আমার পেছনে হাঁটছিস?


শরিফ সামনে তাকিয়ে বলল,


—না তো। আমি তো তোর সামনে।


রুমি ধীরে ধীরে পেছনে তাকাল।


কেউ ছিল না।


কিন্তু ঠিক তার কানের কাছে কেউ যেন ফিসফিস করে বলল,


—রুমি...


রুমি চিৎকার করে উঠল।


শরিফ আর টিটু ছুটে তার কাছে এল।


—কী হয়েছে?


রুমি কাঁপতে কাঁপতে বলল,


—কেউ... আমার নাম ধরে ডাকল।


টিটু চারপাশে তাকিয়ে বলল,


—কে ডাকল?


রুমি উত্তর দিল না।


কারণ সে স্পষ্ট শুনেছিল, কণ্ঠটা তার মায়ের মতো।



শ্মশানঘাটে পৌঁছানো


রাত তখন প্রায় বারোটা।


নদীর ধারে পৌঁছাতেই তিনজনের বুক কেঁপে উঠল।


শ্মশানঘাটটা আগের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর লাগছিল। পুরোনো পোড়া কাঠ ছড়িয়ে আছে। এক পাশে ভাঙা চুল্লি। অন্য পাশে একটি বিশাল বটগাছ, যার শিকড় মাটির ওপর সাপের মতো ছড়িয়ে আছে।


নদীর পানি কালো হয়ে বয়ে যাচ্ছে।


আর ঘাটের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি পুরোনো চিতা।


সেটা বহু বছর ধরে ব্যবহার করা হয়নি। তবু তার চারপাশে ছাই জমে আছে।


টিটু ফিসফিস করে বলল,


—এখানে কেউ আসে না তো?


শরিফ বলল,


—না। তবে দেখ, চিতাটা এখনো আছে।


রুমি চিতার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ থেমে গেল।


—ওখানে কী?


চিতার পাশে একটা লাল কাপড় পড়ে ছিল।


টিটু এগিয়ে গিয়ে কাপড়টা তুলে নিল।


—এটা তো শাড়ির আঁচল!


শরিফ বলল,


—ফেলে দে। এসব ছুঁতে নেই।


টিটু কাপড়টা হাতে নিয়ে হাসল।


—কেন? ভূত এসে শাড়ি চাইবে?


ঠিক তখনই নদীর ওপার থেকে একটা শব্দ ভেসে এল।


ঝনঝন...


ঝনঝন...


যেন কেউ পায়ে নূপুর পরে হাঁটছে।


তিনজনই নদীর দিকে তাকাল।


কুয়াশার মধ্যে নদীর পাড়ে একটা সাদা অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে।


মাথা নিচু। চুল মুখের ওপর ঝুলে আছে। গায়ে সাদা কাপড়।


টিটুর হাত থেকে লাল কাপড়টা পড়ে গেল।


শরিফ ফিসফিস করে বলল,


—ওটা কে?


রুমি কোনো উত্তর দিল না।


অবয়বটা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।


তারপর নদীর ওপর দিয়ে হাঁটতে শুরু করল।


পানির ওপর দিয়ে।


কোনো ঢেউ নেই। কোনো শব্দ নেই।


শুধু নূপুরের ঝনঝনানি।


টিটু পিছিয়ে যেতে যেতে বলল,


—শরিফ... এটা মানুষ না।


শরিফের গলা শুকিয়ে গেছে।


অবয়বটা নদী পার হয়ে ঘাটের কাছে এসে দাঁড়াল।


তার মুখ দেখা যাচ্ছিল না।


শুধু চুল।


লম্বা, ভেজা চুল।


হঠাৎ সে মাথা তুলে বলল,


—শরিফ...


তিনজনের শরীর অবশ হয়ে গেল।


আবার সেই কণ্ঠ।


—টিটু...


তারপর,


—রুমি...


রুমি কাঁদতে কাঁদতে বলল,


—আমরা চলে যাই। এখনই চলে যাই।


শরিফ টর্চটা তুলে অবয়বটার মুখে আলো ফেলল।


আলো পড়তেই দেখা গেল, মুখটা অস্বাভাবিক সাদা। চোখ দুটো কালো গর্তের মতো। ঠোঁটের কোণ থেকে কালো তরল ঝরছে।


কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল তার গলায় বাঁধা একটি লাল কাপড়।


ঠিক সেই কাপড়, যেটা টিটু কিছুক্ষণ আগে হাতে তুলেছিল।


অবয়বটা ধীরে ধীরে হাসল।


তারপর বলল,


—আমার আঁচল... কে নিয়েছিল?


টিটু চিৎকার করে উঠল।


—আমি না! আমি না!


সে দৌড়ে পালাতে গেল।


কিন্তু দুই পা এগিয়েই মাটিতে পড়ে গেল।


তার পায়ের নিচে যেন কেউ ধরে টানছে।


শরিফ আর রুমি তাকে টেনে তুলতে গেল।


ঠিক তখনই চিতার ভেতর থেকে একটা শিশুর কান্না শোনা গেল।



চিতার ভেতরের কান্না


কান্নাটা এতটাই স্পষ্ট ছিল যে তিনজনের মনে হলো, চিতার ভেতরে সত্যিই একটা শিশু আটকে আছে।


কেউ যেন আগুনে পুড়ছে।


কেউ যেন সাহায্য চাইছে।


—মা... মা... আমাকে বাঁচাও...


রুমি কাঁপতে কাঁপতে বলল,


—এখানে তো কোনো শিশু নেই!


শরিফ বলল,


—চুপ! চুপ কর!


কিন্তু টিটু হঠাৎ চিতার দিকে এগিয়ে গেল।


—কে আছে ওখানে?


শরিফ তার হাত ধরে টেনে বলল,


—যাস না!


টিটু থামল না।


চিতার কাছে গিয়ে সে নিচে তাকাল।


তারপর চিৎকার করে পিছিয়ে এল।


—ওখানে... একটা হাত!


চিতার ছাইয়ের ভেতর থেকে একটি কালো হাত বেরিয়ে আছে।


হাতটা ধীরে ধীরে নড়ছে।


আঙুলগুলো মাটির ওপর আঁচড় কাটছে।


রুমি চোখ বন্ধ করে ফেলল।


—ওদিকে তাকাস না!


কিন্তু টিটু তাকিয়ে রইল।


হাতটা হঠাৎ তার দিকে বাড়তে শুরু করল।


তারপর ছাইয়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটা ছোট্ট মাথা।


মাথাটা শিশুর মতো। কিন্তু মুখে কোনো চোখ নেই।


শুধু একটা বড় কালো গর্ত।


শিশুটি মুখ খুলে বলল,


—আমার মা কোথায়?


টিটু পিছিয়ে যেতে যেতে চিতার সঙ্গে ধাক্কা খেল।


শরিফ তার হাত ধরে টেনে তুলল।


ঠিক তখনই পেছন থেকে নারীকণ্ঠ ভেসে এল,


—আমার ছেলেকে দেখেছ?


তিনজন ঘুরে তাকাল।


সাদা কাপড় পরা সেই নারী তাদের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।


এবার তার মুখ স্পষ্ট দেখা গেল।


মুখের অর্ধেক পুড়ে গেছে। এক চোখ নেই। আর অন্য চোখটি অস্বাভাবিক বড়।


সে টিটুর দিকে তাকিয়ে বলল,


—তুই আমার আঁচল নিয়েছিস।


টিটু কাঁপতে কাঁপতে বলল,


—আমি... আমি জানতাম না...


নারীটি ধীরে ধীরে হাত বাড়াল।


তার হাতের আঙুলগুলো অস্বাভাবিক লম্বা।


—ফিরিয়ে দে।


টিটু মাটিতে পড়ে থাকা লাল কাপড়টার দিকে তাকাল।


কাপড়টা তখন আর মাটিতে নেই।


তার নিজের গলায় জড়িয়ে আছে।


সে চিৎকার করে কাপড়টা খুলতে গেল।


কিন্তু কাপড়টা যেন তার গলায় সেলাই করে লাগানো।


যত টানছে, তত শক্ত হচ্ছে।


শরিফ আর রুমি তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে গেল।


হঠাৎ নারীটি এমন এক চিৎকার দিল যে নদীর পানি পর্যন্ত কেঁপে উঠল।


বটগাছের ওপর থেকে একসঙ্গে অসংখ্য পাখি উড়ে গেল।


আর চিতার ভেতর থেকে শিশুটির কণ্ঠ শোনা গেল,


—মা... ওরা এসেছে...


নারীটি এবার তিনজনের দিকে তাকিয়ে হাসল।


—তিনজন এসেছিস?


তারপর সে আঙুল তুলে শ্মশানঘাটের এক পাশে থাকা পুরোনো একটি কবরের দিকে দেখাল।


—একজনকে আমার সঙ্গে যেতে হবে।


--------বাকি পরের পর্বে


০ মন্তব্য · ২৬ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!