৫. সত্যিটা লুকিয়ে ছিল
হাশেম দৌড়ে দোকানে ফিরে এল।
কিন্তু দরজা খুলতেই দেখল, দোকানের ভেতরে তিনজন লোক বসে আছে।
তাদের মধ্যে একজন কাদের সাহেব।
আরেকজন গ্রামের পুরোনো চায়ের দোকানদার, রহিম মিয়া।
তৃতীয়জনকে হাশেম চিনতে পারল না।
তিনজনই চুপচাপ বসে আছে।
হাশেম বলল,
—আপনারা এখানে?
কাদের সাহেব ধীরে ধীরে মাথা তুললেন।
—তুই বাক্সটা পেয়েছিস?
হাশেমের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
—আপনারা জানতেন?
রহিম মিয়া বললেন,
—জানতাম।
হাশেম পিছিয়ে গেল।
—তাহলে এত বছর ধরে...
কাদের সাহেব বললেন,
—মোস্তফা আমাদের সব জানত। সে জানত, রেলের কিছু মাল চুরি করে বাইরে বিক্রি করা হতো। এক রাতে সে সব দেখে ফেলেছিল।
হাশেম স্তব্ধ হয়ে গেল।
—তারপর?
রহিম মিয়া মাথা নিচু করলেন।
—তাকে মেরে রেললাইনের পাশে ফেলে রাখা হয়। সবাইকে বলা হয়, সে ট্রেন থেকে পড়ে মারা গেছে।
হাশেম ফিসফিস করে বলল,
—আর বাক্সটা?
কাদের সাহেব বললেন,
—তার কাছে থাকা প্রমাণগুলো ওই বাক্সে ছিল। আমরা সেটা মাটির নিচে পুঁতে রাখি।
হঠাৎ দোকানের বাইরে নূপুরের মতো একটা শব্দ হলো।
ঝনঝন...
কাদের সাহেব উঠে দাঁড়ালেন।
—সে এসেছে।
হাশেম বলল,
—কে?
কাদের সাহেব জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
—মোস্তফা।

৬. বাতাসে লাশের গন্ধ
হঠাৎ দোকানের চারপাশে কুয়াশা ঘন হয়ে গেল।
হারিকেনের আলো নিভে গেল।
তারপর বাতাসে সেই গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।
লাশের গন্ধ।
হাশেম নাক চেপে ধরল।
দোকানের দরজা নিজে থেকেই খুলে গেল।
বাইরে দাঁড়িয়ে আছে মোস্তফা।
তার পেছনে রেললাইন।
দূরে একটা ট্রেনের আলো দেখা যাচ্ছে।
মোস্তফা বলল,
—আজ আমার ট্রেন আসবে।
কাদের সাহেব কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
—আমাদের ক্ষমা করো।
মোস্তফা কোনো উত্তর দিল না।
সে ধীরে ধীরে দোকানের ভেতরে ঢুকল।
তারপর রহিম মিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুই আমাকে কোথায় ফেলেছিলি?
রহিম মিয়া কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
—রেললাইনের পাশে...
মোস্তফা হাসল।
—না। তুই আমাকে পুঁতে রেখেছিলি দোকানের পেছনে।
রহিম মিয়া মাটিতে পড়ে গেলেন।
হাশেম বুঝতে পারল, দোকানের পেছনের মাটি শুধু বাক্সের জন্য নয়।
সেখানে আরও কিছু ছিল।

৭. মাটির নিচে যে মানুষ
পরদিন ভোরে পুলিশ এসে দোকানের পেছনের মাটি খুঁড়ল।
বাক্সের নিচে সত্যিই মানুষের হাড় পাওয়া গেল।
সঙ্গে একটি পুরোনো রেলকর্মীর ব্যাজ।
মোস্তফা হোসেন।
কাদের সাহেব আর রহিম মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হলো।
কিন্তু তারা কেউই স্বীকার করল না, কীভাবে মোস্তফা মারা গিয়েছিল।

হাশেম সব কথা পুলিশকে বলল।
কিন্তু পুলিশ তাকে বিশ্বাস করল না।
কারণ তার গল্পে ভূত ছিল।
আর পুলিশ ভূতের কথা বিশ্বাস করে না।
তবু সেই রাতের পর থেকে হাশেম আর কখনো দোকানের পেছনে যায়নি।
দোকানটি কয়েক মাস বন্ধ ছিল।
তারপর আবার খুলল।
কিন্তু রাত হলে সেখানে আর কেউ চা খেতে আসে না।
শুধু মাঝে মাঝে একজন লোক এসে দাঁড়ায়।
গায়ে পুরোনো ধূসর পাঞ্জাবি।
মাথায় টুপি।
সে চা চায়।
হাশেম চা দেয় না।
কারণ সে জানে, লোকটি চা খেতে আসে না।
সে আসে নিজের গন্ধ নিয়ে।
শেষ কথা
আজও ওই রেললাইনের পাশ দিয়ে রাতের ট্রেন গেলে বাতাসে অদ্ভুত একটা গন্ধ ভেসে আসে।
পচা মাংসের মতো।
লাশের গন্ধ।
স্থানীয়রা বলে, হাশেমের দোকানের পেছনে নাকি মাঝরাতে একটা লোক দাঁড়িয়ে থাকে।
সে পথচারীদের জিজ্ঞেস করে,
—আমার বাক্সটা দেখেছ?

আর কেউ যদি উত্তর দেয়,
—না,
তাহলে সে ধীরে ধীরে বলে,
—তাহলে তোর গন্ধটা আমি মনে রাখলাম।
এরপর সেই মানুষটির আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না।
শুধু তার জামাকাপড় পড়ে থাকে রেললাইনের পাশে।
আর বাতাসে ভেসে আসে—
লাশের গন্ধ।
সমাপ্ত।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!