বিকেল পাঁচটার সেই চায়ের দোকানটায় অদ্ভুত একটা নিয়ম ছিল। সেখানে কোনো কাপের হাতল ছিল না, আর মাটির ভাঁড় বা কাঁচের গ্লাসও ব্যবহার করা হতো না। চায়ের দোকানদার, যাকে সবাই 'রহমত চাচা' বলে ডাকত, তার কাছে ছিল শত শত ভিন্ন ডিজাইনের চিনা মাটির কাপ। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সেই কাপগুলোতে কোনো মানুষের নাম বা নম্বর লেখা থাকত না, কিন্তু সেখানে প্রতিটা কাপের গায়ে আঁকা থাকত কোনো না কোনো মানুষের জীবনের বিশেষ কোনো মুহূর্তের ছবি।
রহমত চাচা মানুষের মুখ দেখে চা দিতেন না, তিনি মানুষের ভেতরের গল্পটা বুঝতে পারতেন।
অয়ন সেদিন প্রচণ্ড মানসিক চাপ নিয়ে দোকানে গিয়ে বসল। মাত্রই তার চাকরিটা চলে গেছে, পকেটে শেষ কয়েকটা টাকা অবশিষ্ট। সে গিয়ে বিষণ্ণ মুখে একটা বেঞ্চে বসল। রহমত চাচা কোনো কথা না বলে তার সামনে একটা গাঢ় নীল রঙের কাপে ধোঁয়া ওঠা চা নামিয়ে দিলেন। কাপটার গায়ে নিখুঁতভাবে আঁকা ছিল একটা ভাঙা চশমা আর এক জোড়া ছেঁড়া জুতো।
অয়ন চমকে উঠল। এই চশমা আর জুতোর গল্পটা শুধু ওই জানে। ছোটবেলার চরম দারিদ্র্যের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল তার, যখন ভাঙা চশমা আর ছেঁড়া জুতো নিয়েই সে লড়াই করেছিল। কাপের ওই ছবিটা তাকে মনে করিয়ে দিল, এর চেয়েও খারাপ সময় সে পার করে এসেছে। তার ভেতরের হতাশাটা যেন চায়ের প্রথম চুমুকেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল।

ঠিক তখনই তার পাশের সিটে এসে বসলেন এক ভদ্রলোক। বেশ পরিপাটি পোশাক, কিন্তু চোখে-মুখে এক অদ্ভুত শূন্যতা। রহমত চাচা তাকে যে কাপটা দিলেন, সেটি ছিল একদম ধবধবে সাদা, আর তার মাঝখানে আঁকা একটি ছোট্ট লাল রঙের খেলনা গাড়ি।
ভদ্রলোক কাপটা হাতে নিয়েই স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তার চোখ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
অয়ন কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, "কিছু মনে করবেন না ভাই, কাপের ছবিটা দেখে আপনি এতটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন কেন?"
ভদ্রলোক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "দশ বছর আগে আমার ছোট ছেলেটা একটা লাল খেলনা গাড়ির জন্য খুব বায়না করেছিল। আমি তখন ক্যারিয়ার গড়ার পেছনে এতই অন্ধ ছিলাম যে তাকে সময় দিইনি, গাড়িটাও কিনে দেওয়া হয়নি। তার পরের বছরই একটা দুর্ঘটনায় আমি তাকে হারাই। আজ আমার কোটি টাকা আছে, কিন্তু সেই লাল গাড়িটা কিনে দেওয়ার মতো কেউ নেই।"
অয়ন নিজের কাপটা ভদ্রলোকের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, "আর আমার কাপটা দেখুন। এটা আমার ফেলে আসা দারিদ্র্যের গল্প। আজ চাকরি হারিয়ে আমি ভাবছিলাম আমার সব শেষ। কিন্তু আপনার গল্পটা শুনে বুঝলাম, পকেটের শূন্যতার চেয়ে হৃদয়ের শূন্যতা অনেক বেশি ভারী।"
দুইজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ, যাদের জীবনের গল্প সম্পূর্ণ ভিন্ন, তারা চায়ের কাপের উছিলায় একে অপরের মুখোমুখি হলো। একজন তার হারিয়ে যাওয়া অতীতকে ফিরে পেল, আর অন্যজন পেল ভবিষ্যতে লড়াই করার নতুন শক্তি।
চা শেষ করে দুজনেই যখন কাপটা ফেরত দিতে গেল, রহমত চাচা মৃদু হেসে বললেন, "চায়ের কাপে মানুষ শুধু চা খায় না বাবা, নিজের আসল পরিচয়টা একটু ঝালিয়ে নেয়। ভালো থেকো।"
দোকান থেকে বের হওয়ার সময় অয়নের মনে হলো, তার পকেট হয়তো এখনো খালি, কিন্তু বুকটা এক অদ্ভুত হালকা শান্তিতে ভরে গেছে।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!