প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসএকটি গুপ্ত চায়ের দোকান

গল্প ও উপন্যাস

একটি গুপ্ত চায়ের দোকান

একটি গুপ্ত চায়ের দোকান

শহরের ব্যস্ততম গলির একদম শেষ প্রান্তে, যেখানে ল্যাম্পপোস্টের আলোটাও পৌঁছাতে ভয় পায়, সেখানে ছিল সমির হোসেনের চায়ের দোকান। দোকানটার কোনো সাইনবোর্ড ছিল না। চারপাশের ভাঙা দেয়াল আর লতাপাতায় ঢাকা ছোট্ট একটা কাঠের দরজা দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে ভেতরে এক অদ্ভুত দুনিয়া লুকিয়ে আছে। তবে যারা জীবনের সব আশা হারিয়ে ফেলত, কোনো এক অজানা টানে তারা ঠিকই খুঁজে পেয়ে যেত এই ‘গুপ্ত চায়ের দোকান’।


বিজ্ঞাপন

সমির হোসেন দেখতে আর দশটা সাধারণ বৃদ্ধের মতোই ছিলেন, কিন্তু তাঁর হাতের চা ছিল জাদুকরী। তিনি শুধু চা বানাতেন না, মানুষের মনের কথা বুঝতে পারতেন। কেউ বিষণ্ণ মনে তাঁর ভাঙা বেঞ্চে এসে বসলে অবিনাশ বাবু মৃদু হেসে এক কাপ বিশেষ চা এগিয়ে দিতেন। সেই চায়ের প্রথম চুমুকেই মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা বছরের পর বছর পুরনো কষ্ট হালকা হয়ে যেত। মানুষ তাঁর দোকানে এসে কাঁদত, মনের মেঘ উজার করে দিত, আর ফেরার সময় এক বুক হালকা বাতাস নিয়ে বাড়ি ফিরত। সমির হোসেন ছিলেন এই শহরের নিঃসঙ্গ আত্মাদের একমাত্র আশ্রয়।

এক ঝড়-বৃষ্টির রাতে দোকানে এল রুদ্র। তরুণ এই চিত্রশিল্পী তাঁর সব শিল্পসত্তা হারিয়ে ফেলেছে। তাঁর আঁকা ছবি এখন আর কেউ কেনে না, পকেটে টাকা নেই, আর সবচেয়ে বড় কথা—যার জন্য সে বাঁচত, সেই প্রিয়তমাও তাঁকে ছেড়ে চলে গেছে। রতন সেদিন জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল। পকেটে বিষের শিশি নিয়ে সমির হোসেনের দোকানে এসে বসল।


সমির হোসেন রতনের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখের ক্লান্তি আর ভেতরের শূন্যতা বুড়ো চশমার আড়াল থেকেও ঠিক চিনে নিলেন। তিনি কোনো কথা না বলে ভেতরে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ধোঁয়া ওঠা মাটির ভাঁড়ে করে এক কাপ গাঢ় রঙের চা রতনের সামনে রাখলেন।


চায়ের সুবাসে রতনের কেমন যেন বুকটা কেঁপে উঠল। সে আলতো করে প্রথম চুমুক দিল। আর অলৌকিকভাবে, সেই প্রথম চুমুকেই রতনের মনে হলো তাঁর চারপাশের অন্ধকার কেটে যাচ্ছে। ক্যানভাসের রঙগুলো আবার তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠছে। দ্বিতীয় চুমুকে তাঁর মনে হলো, বেঁচে থাকাটা এতটা খারাপও নয়। জীবনের প্রতি তীব্র এক ভালোবাসা তাঁর শিরায় শিরায় বয়ে গেল। সে পকেট থেকে বিষের শিশিটা বের করে ডাস্টবিনে ফেলে দিল। অবিনাশ বাবুর দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতায় তাঁর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

রতন বলল, "দাদু, আপনার এই চা আমাকে নতুন জীবন দিল। কিন্তু এই চায়ের রহস্যটা কী? এত অদ্ভুত শান্তি কীভাবে দেন আপনি?"


সমির হোসেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর মলিন হাসিতে লুকিয়ে ছিল এক মহাসমুদ্রের সমান বেদনা। তিনি ধীর গলায় বললেন, "দাদুভাই, এই পৃথিবীতে কোনো কিছুই মূল্য ছাড়া পাওয়া যায় না। তোমার মনের বিষাদ, তোমার কষ্টগুলো তো হাওয়া হয়ে উড়ে যায়নি। ওগুলো কেউ একজন নিজের ভেতরে টেনে নিয়েছে।"


রতন অবাক হয়ে বলল, "তার মানে?"


সমির হোসেন তাঁর কাঁপা হাত দুটো টেবিলের ওপর রাখলেন। রতন চমকে উঠে দেখল, বৃদ্ধের ফর্সা চামড়া ধীরে ধীরে কেমন যেন কালচে আর নিস্প্রাণ হয়ে যাচ্ছে।


বৃদ্ধ বলতে লাগলেন, "এই চায়ের রেসিপি হলো ‘বিনিময়’। যারা এখানে আসে, আমি তাদের সমস্ত ট্রাজেডি, সমস্ত চোখের জল আর জীবনের অন্ধকার নিজের বুকের ভেতর টেনে নিই। আর আমার ভেতরের জমানো শেষ আলোটুকু চায়ের সুবাস বানিয়ে তোমাদের ফিরিয়ে দিই। শহরটা বড্ড নিষ্ঠুর দাদুভাই, কাউকে না কাউকে তো এই পাপ আর কষ্টের বোঝা বইতেই হতো।"


রতন স্তব্ধ হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল,সমির হোসেনে বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার মানুষের কষ্ট নিজের শরীরে ধারণ করছেন। সেই অভিশপ্ত কষ্টের ভারে বৃদ্ধের শরীর আর মন আজ ক্ষয়ে ক্ষয়ে শেষ হয়ে এসেছে।


"আপনি কেন নিজের এই ক্ষতি করছেন, দাদু?"রতনের গলা বুজে এল।


সমির হোসেন রতনের মাথায় হাত রেখে বললেন, "কারণ আমি যে মানুষকে ভালোবাসতাম, তাকে আমি বাঁচাতে পারিনি। নিজের সব কষ্ট বুকে চেপে সে একদিন বিদায় নিয়েছিল। তখন থেকেই আমি পণ করেছি, আর কোনো প্রাণকে আমি অবহেলায় ঝরে যেতে দেব না। আজ আমার কোটা পূর্ণ হলো দাদুভাই। এবার আমার ছুটি।"


কথাটা শেষ করেই সমির হোসেনে চেয়ারে হেলান দিলেন। তাঁর মুখে লেগে রইল এক স্বর্গীয় তৃপ্তির হাসি। কিন্তু তাঁর চোখ দুটি চিরতরে বুজে গেল। যে মানুষটি পুরো শহরের কান্না মুছে দিতেন, তিনি নিজেই এক বুক ট্রাজেডি নিয়ে নিঃশব্দে বিদায় নিলেন।


পরদিন সকালে রতন যখন আবার সেই গলির শেষ প্রান্তে গেল, সে দেখল সেখানে কোনো চায়ের দোকান নেই। শুধু একটা পুরনো ভাঙা দেয়াল আর মাটিতে পড়ে থাকা একটা ভাঙা মাটির ভাঁডসমির হোসেন আর তাঁর গুপ্ত চায়ের দোকান যেন বাতাসের সাথে মিলিয়ে গেছে, রেখে গেছে শুধু রতনের বুকে বেঁচে থাকার এক নতুন আলো আর এক চিরন্তন ট্রাজেডির গল্প।

১ মন্তব্য · ৩৬ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (১)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন
হাসান সাগর ১ দিন আগে

সমির আংকেল এর " চা " আমার চাই।। তবে অবিনাশ বাবু টা কে? হঠাৎ কোথা থেকে আসলো!!! প্লিজ, জানাবেন, ভাই।।