সুনামগঞ্জের আকাশে সন্ধ্যা নামছে।
সুরমা নদীর পানি ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছে। দূরে কোনো নৌকার মাঝি হয়তো ভাটিয়ালি গাইছে। বাতাসে হাওরের গন্ধ।
এমন একটা সন্ধ্যায় যদি কেউ আপনাকে জিজ্“হাসন রাজা কোথা
আপনি হয়তো বলবেন, সুনামগঞ্জের কোনো এক বাড়িতে, কোনো মাজারে, কোনো জাদুঘরে।
কিন্তু সত্যি বলতে কী, হাসন রাজাকে কোনো একটি জায়গায় খুঁজে পাওয়া যায় না।
তাঁকে খুঁজে পেতে হয় মানুষ যখন সবকিছু পেয়ে যায়, তখন সে আর কী খোঁজেএই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই আমরা পৌঁছে যাই হাসন রাজার কাছেএকজন রাজা, যার ছিল অনেক কিছু
দেওয়ান হাসন রাজা জন্মেছিলেন ১৮৫৪ সালের ২১ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জের তেঘরিয়া গ্রামে, এক প্রভাবশালী জমিদার পরিবারে। তাঁর বাবা ছিলেন দেওয়ান আলী রাজা চৌধুরী। অল্প বয়সেই উত্তরাধিকারসূত্রে তিনি বিশাল সম্পত্তি ও জমিদারির দায়িত্ব পান।
তখনকার হাসন রাজা আর আজকের মরমি হাসন রাজা—দুজন যেন একই মানুষের দুই ভিন্ন অধ্যায়।
যৌবনে তিনি ছিলেন সৌখিন।
ঘোড়া ছিল তাঁর প্রিয়।
পাখি পুষতেন।
জমিদারি, সম্পদ, আনন্দ-বিলাস—সবকিছুই ছিল তাঁর হাতের নাগালে।
লোককথা ও ঐতিহাসিক বিবরণে তাঁর এই জীবনের নানা বৈচিত্র্যের কথা পাওয়া যায়। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—এই ভোগের জীবনই একসময় তাঁকে নিয়ে গেল সম্পূর্ণ বিপতারপর একদিন রাজা নিজের কাছেই অপরিচিত হয়ে গেলেনমানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত আসে, যার কোনো ব্যাখ্যা হয় না।
হাসন রাজার জীবনেও তেমন একটি পরিবর্তনের কথা বলা হয়।
আধ্যাত্মিক উপলব্ধির পর তাঁর জীবনধারা বদলে যেতে থাকে। বিলাসিতা থেকে দূরে সরে যান। পোশাক-আশাকের চাকচিক্য কমে আসে। সম্পদের প্রতি অনাসক্তি জন্ম নেয়। মানুষের পাশাপাশি জীবজন্তুর প্রতিও তাঁর মমতা বাড়ে।
একসময় যে মানুষকে কঠোর জমিদার হিসেবে দেখা হতো, তিনিই ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন এক মরমি সাধক।
এ যেন সিনেমার গল্প।
কিন্তু এ গল্পের নায়ক কোনো কাল্পনিক চরিত্র নন।
তিনি একজন সত্যিকারের জমিদার।
আর তাঁর সবচেয়নিজের সঙ্গে।
“লোকে বলে বলে রে…”
হাসন রাজার সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর জমিদারি নয়।
তাঁর আসল পরিচয় তাঁর গান।
তাঁর গান শুনলে মনে হয়, একজন মানুষ নিজের সঙ্গে কথা বলছেন।
কখনো তিনি মৃত্যুকে মনে করছেন।
কখনো শরীরের ক্ষয়কে দেখছেন।
কখনো নিজের অহংকারকে প্রশ্ন করছেন।
কখনো বলছেন—এই দুনিয়ায় আমরা আসলে কতটুকুই বা আমাদের বলে দাবি করতে প“লোকে বলে বলে রে,
ঘরবাড়ি ভালা নাই আমার…”
এই গান শুনলে মনে হয়, এটি কোনো দরিদ্র মানুষের আক্ষেপ নযএটি এমন একজন মানুষের উপলব্ধি, যার ঘরবাড়ি, সম্পদ, জমিদারি—সবই ছতবু শেষ পর্যন্ত তিনি বুঝেছিলঘর যত বড়ই হোক, মানুষের ভিতরের শূন্যতা তার চেয়েও বড় হতে পাহাসন রাজাকে বুঝতে হলে তাঁর হাওরকে বুঝতে হবে
হাসন রাজাকে শুধু বইয়ের পাতা দিয়ে বোঝা কঠিন।
তাঁকে বুঝতে হলে যেতে হবে সুনামগঞ্জে।
তেঘরিয়ার দিকে।
সুরমার তীরে।
হাওরের কাছে।
কারণ তাঁর শৈশবের প্রকৃতি ছিল নদী, খাল, বিল, হাওর ও বিস্তৃত গ্রামবাংলা। তাঁর জীবন ও শিল্পের সঙ্গে এই ভূগোলের সম্পর্ক গভীর।
ভাবুন—
একজন শিশু খোলা আকাশের নিচে হাঁটছে।
চারপাশে পানি।
দূরে পাখি।
কোনো নৌকা চলে যাচ্ছে।
কোনো মাঝি গান গাইছে।
কখনো সে ঘোড়ায় চড়ছে।
কখনো নদীর পাড়ে বসে আছে।
এই প্রকৃতির মধ্যেই জন্ম নিচ্ছে এমন একটি মন, যে পরবর্আমি কে?
জমিদার থেকে মরমি
হাসন রাজার গল্পের সবচেয়ে চমৎকার জায়গাটি এখানেই।
তিনি দরিদ্র ছিলেন না।
তিনি সমাজের নিচুতলার মানুষ ছিলেন না।
বরং তিনি ছিলেন ক্ষমতাবান জমিদার।
তাঁর কাছে যা পাওয়ার কথা, তার প্রায় সবই ছিল।
কিন্তু তাঁর গান আমপ্রাচুর্য আর পরিতৃপ্তি এক জিনিস নয়।
একজন মানুষের ঘরে শত দরজা থাকতে পারে, কিন্তু মন যদি বন্ধ থাকে, তাহলে সে বন্দিই।
আবার একজন মানুষের ঘর ছোট হতে পারে, কিন্তু তার মন যদি মুক্ত থাকে, তাহলে সে রাজা।হাসন রাজা সম্ভবত নিজের জীবনের মধ্য দিয়েই এই বৈপরীত্যটি আবিষ্কার করেছিলেন“কী ঘর বানাইতাম আমি শূন্যের মাঝার…”
হাসন রাজার দর্শনের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে অনিত্যতা।
সবকিছু একদিন শেষ হয়ে যাবে।
যৌবন থাকবে না।
সম্পদ থাকবে না।
ক্ষমতা থাকবে না।
সৌন্দর্য থাকবে না।
এমনকি যে ঘরকে আমরা নিজের বলে আঁকড়ে ধরি, সেটিও একদিন অন্য কারও হয়ে যাবে।
তাই তাঁর গানে বারবার ফিরে আসে নিজের পআমি কী নিয়ে এত অহংকার করি?
এই প্রশ্নটি একশ বছরেরও বেশি সময় পরেও অদ্ভুতভাবে আধুনিক।
কারণ আজও আমরা বাড়ি বানাই।
আরও বড় বাড়ি চাই।
আরও টাকা চাই।
আরও পরিচিতি চাই।
আরও অনুসারী চাই।
তারপর একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়চুলে পাকসময় চলেহাসন রাজা ছিলেন কি বাউল?
এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে।
হাসন রাজাকে প্রায়ই বাউল হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। কিন্তু তাঁকে কোনো নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক বাউল ধারার মধ্যে পুরোপুরি আটকে দেখা ঠিক নয়। তাঁর সাধনায় সুফি চিন্তা, লোকায়ত মরমি ভাবনা এবং নিজস্ব দর্শনের সমন্বয়ের কথা গবেষণা ও জীবনীমূলক আলোচনায় পাওয়া যায়।
তাঁর সবচেয়ে বডতিনি ছিলেন একজন অনুসন্ধানী মানুষ।
তিনি উত্তর মুখস্থ করেননি।
তিনি প্রশ্ন করেছেন।
নিজেকে নিয়ে।
জীবন নিয়ে।
মৃত্যু নিয়ে।
ঈশ্বর নিয়ে।
মানুষ নিয়ে।
আর সেই প্রশ্নগুলোই পরিণত হয়েছে গাহাসন রাজা ও রবীন্দ্রনাথ: দুই ভিন্ন জগতের আশ্চর্য সেতু
হাসন রাজার গান সুনামগঞ্জের হাওর পেরিয়ে পৌঁছেছিল বৃহত্তর বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিসরে।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও হাসন রাজার গান ও দর্শনের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। সুনামগঞ্জের সরকারি তথ্যেও হাসন রাজার গানে মুগ্ধ হয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রশংসার উল্লেখ রয়েছে।
একজন জমিদার পরিবারের মরমি কবি।
অন্যজন বিশ্বকবি।
একজনের ভাষা হাওরের মাটির কাছাকাছি।
অন্যজনের সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যের বিশাল পরিসরে।
তবু দুজনের কোথাও যেন দেখা হয়ে মানুষের অন্তর্জগতে।
তাঁর বাড়িতে গেলে ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখা যাসুনামগঞ্জের তেঘরিয়ায় হাসন রাজার স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি আজও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।
সরকারি পর্যটন তথ্য অনুযায়ী, সেখানে তাঁর ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী—যেমন কুর্তা, খড়ম, পাগড়ি, ঢাল, থালা, বই এবং তাঁর হাতের লেখা কবিতা ও গানের পাণ্ডুলিপির স্মৃতি সংরক্ষিত আছে।
একজন পর্যটক সেখানে গিয়ে হয়তো শুধু একটি পুরোনো বাড়ি দেখবেন।
কিন্তু একটু অন্যভাবে দেখলে—
সেটি আসলে একটি মানুষের জীবনের দুই প্রান্তের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা জায়গা।
একদিকে জমিদার হাসন।
অন্যদিকে মরমি হাসন।
একদিকে সম্পদ।
অন্যদিকে বৈরাগ্য।
একদিকে ক্ষমতা।
অন্যদিকে আতারপর রাজা কোথায় গেলেন?হাসন রাজা ১৯২২ সালের ডিসেম্বর মাসে মৃত্যুবরণ করেন। সুনামগঞ্জের গাজীর দরগা এলাকার পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
কিন্তু একজন মরমি কবির মৃত্যু কি সত্যিই মৃত্যু?
যে মানুষ নিজের জীবনকে গান বানিয়ে রেখে যান, তাঁর শরীর চলে যায়—কণ্ঠ থেকে যায়।
আজও কেউ যখন“লোকে বলে বলে রে
অথবা হাসন রাজার কোনো মরমি গান গায়,তখন ১৮৫৪ সালের সেই তেঘরিয়া আবার যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে।হাসন রাজাকে দেখতে হলে চোখ বন্ধ করতে হবে
হাসন রাজাকে দেখতে হলে হয়তো তাঁর কোনো ছবির প্রয়োজন নেই।
চোখ বন্ধ করুন।
একটি হাওর কল্পনা করুন।
বিকেলের আলো।
দূরে নৌকা।
নদীর পানিতে আকাশের ছায়া।
তারপর ভাবুন—
এই পৃথিবীর সব জমিদারি, সব সম্পদ, সব অহংকার একদিন শেষ হয়ে যাবে।
শেষ পর্যন্ত মানুষের সঙ্গে থাকবে তার কাজ।
তার ভালোবাসা।
তার গান।
তার রেখে যাওয়া প্রশ্ন।
তখন হয়তো বুঝবেন, হাসন রাজা কেন আজও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্একজন জমিদারের সবচেয়ে বড় শিক্হাসন রাজার জীবনের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী শিক্ষা তাঁর কোনো একটি গাপরিবর্তনের মধ্
তিনি আমাদের দেখিয়েছেন—মানুষ চাইলে নিজের জীবনকে নতুন করে দেখতে পারে।
অতীত যতই বড় হোক, পরিবর্তনের দরজা বন্ধ হয়ে যায় নক্ষমতা মানুষকে বড় করে না।সম্পদ মানুষকে বড় করে না।
মানুষ বড় হয় যখন সে নিজের অহংকারের বাইরে অন্য মানুষকে দেখতে শেখেএই কারণেই হাসন রাজা শুধু একজন লোককবি নন।
তিআমরা যা পেয়েছি, তার কতটুকু সত্যিই আমাদের?সুনামগঞ্জের পথে একদিন
আপনি যদি কখনো সুনামগঞ্জ যান, শুধু পর্যটনকেন্দ্রের তালিকা ধরে ঘুরবেন না।
একদিন সময় নিয়ে হাসন রাজার স্মৃতিবিজড়িত জায়গায় যান।
সুরমার দিকে তাকান।
হাওরের বাতাস অনুভব করুন।
তারপর কোনো নিরিবিলি জায়গায় বসে হাসন রাজার গান শুনুন।
তখন হয়তো বুঝতে পারবেন—
এই গান কোনো মঞ্চের জন্য লেখা হয়নি।
এগুলো লেখা হয়েছিল মানুষের ভেতরের অন্ধকারে একটু আলো জ্বালানোর শেষ কথা: রাজা শেষ পর্যন্ত কী রেখে গেলেন?হাসন রাজা অনেক কিছু পেয়েছিলেন।
জমিদারি পেয়েছিলেন।
ক্ষমতা পেয়েছিলেন।
সম্পদ পেয়েছিলেন।
সম্ভবত জীবনের শুরুতে ভোগের স্বাদও পেয়েছিলেন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি কিছু গান।
আর সেই গানগুলোই তাঁকে জমিদারের চেয়েও বড় করে তুলেছে।
আজ তাঁর জমিদারি ইতিহাসের বিষয়।
তাঁর ঘোড়া, পোশাক, বাড়ি—সবই স্মৃতির অংশ।
কিন্তু তাঁর গান?
সেটি এখনও মানুষের মুখে।
এই হলো হাসন রাজার সতিনি রাজত্ব করেছিলেন জমির ওপর,
কিন্তু শেষ পর্যন্ত জায়গা করে নিয়েছেন মানুষের মনে।
হয়তো এ কারণেই সুনামগঞ্জের হাওরে সন্ধ্যা নামলে আজও মনে হয়—
কোথাও একজন বাউল বসে আছেন।
সামনে নদী।
পাশে একতারা।
আর তিনি নিজেকেই প্রশ্ন করছআমি কোথায়?
েন -ে বড় অন্য কিছু
নি একটি ে।।
তাঁ
…ে ওঠ ধরেছে।
প্রশ।
শেখপ্রশ্ন রে।িল।
বহুল পরি অন্য কারও সঙ্গ।
্রশ্নের? কর
করছবচেয়রেখে গেলেন
।
া।
যনে নয় গেয়ে দেখি—
্রতি
াদেরতীকালে ়।
ারি?
তাঁরে বড় যুদ্ধ ছিল?
একটি পয়ঞেস
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!