শহরের কোলাহল থেকে দূরে, ছায়াসুনিবিড় এক গ্রামে রিমিদের পুরোনো জমিদার বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। এককালে এই বাড়ি গমগম করত মানুষের আনাগোনায়, আর আজ সেখানে শুধু সময়ের নীরবতা। পড়াশোনার সূত্রে রিমি দীর্ঘদিন পর এই বাড়িতে এসেছে কয়েকটা দিন একা কাটাতে।
বাড়ির ছাদের কোণের এক অন্ধকার চিলেকোঠার ঘর। ছোটবেলা থেকেই এই ঘরটার প্রতি রিমির একটা অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল। একদিন বিকেলের ম্লান আলোয় রিমি সেই ঘরের ধুলো জমতে থাকা পুরোনো কাঠের আলমারিটা খুলল। ভেতরে কিছু পুরোনো বই আর ভাঙা খেলনার মাঝে তার চোখ পড়ল একটা কাঠের বাক্সের দিকে। বাক্সটার গায়ে পুরু ধুলোর আস্তরণ।
কৌতূহলী রিমি ধুলো ঝেড়ে বাক্সটা খুলতেই দেখল, ভেতরে একটি নীলচে খাম। খামটি জীর্ণ, রঙ চটে গেছে। খামের ওপরে কোনো ডাকটিকিট নেই, শুধু কাঁপাকাঁপ“অনন্যার উদ্দেশ্যে”। অনন্যা ছিলেন রিমির প্রয়াত দাদী।
চিঠিটা বের করতেই ঘরজুড়ে যেন একটা পুরোনো সুবাস ছড়িয়ে পড়ল। রিমি সাবধানে ভাঁজ করা কাগজটা মেলল। ধুলোপড়া সেই পাতার প্রতিটি শব্দে জড়িয়ে ছিল আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের এক না-বলা ভালোবাসার গল্প।
চিঠিটা লিখেছিলেন জুবায়ের সাহেব, যিনি ছিলেন রিমির দাদুর ছোটবেলার বন্ধু এবং এ গ্রামেরই একজন তরুণ কবি। চিঠির ভাষা ছিল সাধারণ, কিন্তু তার গভীরতা ছিল সীমাহীন। জুবায়ের সাহেব লিখেছিলেন:কালিতে লেখা—
" অনন্যা,
জানি এ চিঠির উত্তর দেওয়ার অধিকার তোমার নেই, আর আমারও তা চাওয়ার যোগ্যতা নেই। কাল তোমার বিয়ে, এই জমিদার বাড়ির আলো আর সানাইয়ের শব্দ আমার ভাঙা ঘরের জানালা দিয়েও দেখা যাচ্ছে। তোমার বাবা যখন আমার দারিদ্র্যকে উপহাস করে তোমাকে ফিরিয়ে নিয়েছিলেন, আমি সেদিন কিছু বলতে পারিনি। শুধু এটুকু জেনে রেখো, যে ভালোবাসা আমি তোমাকে দিয়েছি, তা কোনোদিন ম্লান হবে না। আমি এ গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছি অনেক দূরে। যদি কোনোদিন তোমার মনে হয় কেউ তোমার জন্য অপেক্ষা করেছিল, তবে চিলেকোঠার এই লুকানো কোণে এসে একবার আকাশ পানে চেয়ো। আমি হয়তো থাকব না, কিন্তু আমার ভালোবাসা বাতাসের মতো তোমাকে ছুঁয়ে যাবে।"
চিঠিটা পড়তে পড়তে রিমির চোখ ভিজে এলো। সে জানত, তার দাদী সারাজীবন এক গম্ভীর, শান্ত এবং কিছুটা উদাসীন মানুষ ছিলেন। দাদুর সঙ্গে তাঁর সংসার ছিল কর্তব্যের, কিন্তু সেখানে কোনো প্রাণ ছিল না। রিমি বুঝতে পারল দাদী তাঁর জীবনের এক বিশাল গোপন হাহাকার এই ধুলোপড়া চিঠির মাঝে বন্দি করে রেখেছিলেন। হয়তো নিজের অজান্তেই কোনো এক রাতে এখানে এসে চোখের জল ফেলেছিলেন তিনি।
চিঠিটা বুকে জড়িয়ে রিমি চিলেকোঠার জানালা দিয়ে বিকেলের লাল আকাশের দিকে তাকাল। বাতাসে তখন একটা অদ্ভুত শান্তি। অনন্যা বা জুবায়ের সাহেব কেউ আর এই পৃথিবীতে নেই। কিন্তু তাঁদের সেই পবিত্র, অপূর্ণ ভালোবাসার গল্পটি আজ পঞ্চাশ বছর পর এক ধুলোপড়া চিঠির মাধ্যমে বেঁচে রইল রিমির হৃদয়ে। রিমি আলতো করে চিঠিটা আবার বাক্সে রেখে দিল—কিছু গল্প ধুলো মাখাই সুন্দর, তারা সময়ের চেয়েও দীর্ঘজীবী হয়।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!