প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসমায়াবী চোখ-শেষ পর্ব

গল্প ও উপন্যাস

মায়াবী চোখ-শেষ পর্ব

মায়াবী চোখ-শেষ পর্ব

ঝড়-বৃষ্টির সেই মায়াবী রাতের পর নীলগিরি রোড স্টেশনের চায়ের দোকানটা আর শুধু একটা দোকান রইল না; ওটা হয়ে উঠল অভীক আর মায়াবতীর নিজস্ব এক ভালোবাসার পৃথিবী।

দিনগুলো যেন রূপকথার মতো কাটছিল।

বিজ্ঞাপন


মায়াবতীর স্কুলের ছুটির পর অভীকের স্টলে বসে দুজনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করত। অভীক এখন আর লুকিয়ে নয়, মায়াবতীর চোখের দিকে তাকিয়ে সরাসরি তার ক্যানভাসে রঙ ছড়াতো।


মায়াবতীর সেই চোখের ভাষা অভীককে শহরের সবচেয়ে সুখী মানুষে পরিণত করেছিল। কিন্তু পাহাড়ের আবহাওয়া যেমন হুট করে বদলে যায়, তাদের জীবনেও তেমনি এক ঝোড়ো হাওয়া ধেয়ে এল।


মাস ছয়েক পরের এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে মায়াবতী স্টেশনে এল, কিন্তু তার চোখে আজ সেই চেনা উজ্জ্বলতা ছিল না। চোখের কোণে জমে ছিল এক মেঘভার। সে অভীকের সামনে এসে দাঁড়াল এবং কাঁপা গলায় বলল, "অভীক, আমার বাবা খুব অসুস্থ। আমাকে আজই কলকাতা ফিরে যেতে হবে। হয়তো আর কোনোদিন এই নীলগিরি রোডে ফেরা হবে না।"


কথাটা শুনে অভীকের হাতের চায়ের কাপটা মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল। তার মনে হলো, চারপাশের পাহাড়গুলো যেন তার ওপর ভেঙে পড়ছে। মায়াবতী তার ব্যাগ থেকে একটা ছোট পার্সেল বের করে অভীকের হাতে দিল। "এটা তোমার জন্য। যখন খুব মনে পড়বে, তখন খোলো," বলেই মায়াবতী ট্রেনের দিকে ছুটে গেল। ট্রেনের জানলা দিয়ে সে যখন শেষবারের মতো তাকাল, অভীক দেখল সেই মায়াবী চোখ দুটো জলে ভেসে যাচ্ছে। ট্রেনটা কুয়াশার চাদরে মিলিয়ে গেল।


পরের কয়েকটা মাস অভীকের জন্য ছিল নরকযন্ত্রণার মতো। চায়ের দোকানে সে আর মন দিতে পারত না। ক্যানভাসগুলো ধুলো জমা পড়ে রইল। মায়াবতীর কোনো চিঠি বা খবর আসেনি। অভীক মায়াবতীর দেওয়া পার্সেলটা খোলার সাহস পায়নি, কারণ সে জানত ওটা খুললে মায়াবতীর স্মৃতি তাকে আরও দুর্বল করে দেবে।


অবশেষে এক বিকেলে, যখন ঠিক ছয় মাস আগের মতোই আকাশ মেঘলা করে বৃষ্টি নামল, অভীক আর ধরে রাখতে পারল না নিজেকে। সে ধুলোবালি ঝেড়ে পার্সেলটা খুলল। ভেতরে ছিল একটি ছোট ডায়েরি আর মায়াবতীর নিজের হাতে আঁকা অভীকের একটা পোট্রেট।


ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা ছিল:

"অভীক, তুমি আমার চোখের মায়া আঁকতে ভালোবাসতে। কিন্তু তুমি জানতে না, আমার চোখে যে মায়ার আলো জ্বলে, তার আসল উৎস ছিলে তুমি নিজে। বাবা আমাকে অন্য কোথাও বিয়ে দিতে চাইছেন, কিন্তু এই চোখ দুটো তো অন্য কারো দিকে তাকাতে পারবে না। আমি নীলগিরি রোডেই ফিরব, যদি তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করো।"


চিঠিটা পড়া শেষ হতেই স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে একটা ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল। লোকাল ট্রেনটা এসে থামল। অভীক ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরে বাইরে দৌড়ে গেল।


বৃষ্টির ঝাপটার মধ্য দিয়ে ট্রেন থেকে নেমে এল এক তরুণী। ভেজা চুলে, সুতির শাড়িতে সে ঠিক আগের মতোই মায়াবী। অভীক গিয়ে তার সামনে দাঁড়াল। মায়াবতী মুখ তুলল।


দীর্ঘ বিরহের পর আজ যখন তাদের চোখাচোখি হলো, অভীক দেখল সেই মায়াবী চোখে এবার আর কোনো বিষাদ নেই, কোনো দূরত্ব নেই। সেখানে শুধু এক চরম প্রাপ্তির আনন্দ আর অনন্তকালের ভালোবাসা খেলা করছে। মায়াবতী নীলগিরি রোডে ফিরে এসেছে, তার নিজের রূপকারের কাছে, চিরদিনের জন্য।


০ মন্তব্য · ৫৯ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!