সবুজ মিয়ার জীবনের একমাত্র মূলমন্ত্র হলো—"দুনিয়ায় যা কিছু ফ্রি, তা-ই অমৃত।" তা সে বাসের ফ্রি ক্যালেন্ডার হোক, আর দোকানের ফ্রি চাবির রিং-ই হোক, 'ফ্রি' শব্দটা শুনলেই সবুজের চোখ চকচক করে ওঠে।
সেদিন সকালে বাজারে গিয়ে সবুজ দেখল এক বিশাল জটলা। এক কোম্পানি নতুন এক ব্র্যান্ডের টুথপেস্টের প্রচার চালাচ্ছে। মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছে, "একটি বড় টুথপেস্ট কিনলে একটি ছোট টুথপেস্ট একদম ফ্রি! সাথে একটি প্লাস্টিকের বালতিও ফ্রি!"
সবুজ মিয়ার বাড়িতে অলরেডি পাঁচটা টুথপেস্ট জমা হয়ে আছে। কিন্তু "ফ্রি" বালতি আর ছোট টুথপেস্টের লোভ সে সামলাতে পারল না। পকেটের শেষ টাকাটা দিয়ে সে টুথপেস্ট কিনে মহা আনন্দে বগলে বালতি চেপে বাড়ি ফিরল।
বাড়িতে ঢুকতেই বউ করিমন বেগম ঝাড়ু হাতে তেড়ে এল, "বলি, ঘরে চাল-ডাল কেনার পয়সা নেই, আর তুমি আবার এই প্লাস্টিকের বালতি কিনে এনেছ?"
সবুজ মিয়া দাঁত বের করে হাসল, "আরে গিন্নি, রাগ করছ কেন? বালতি তো কিনিনি, বালতি পেয়েছি একদম ফ্রি! আসল জিনিস তো টুথপেস্ট!"
করিমন কপালে হাত দিয়ে বলল, "তোমার এই ফ্রির চক্করে একদিন আমাদের রাস্তায় বসতে হবে।"
দুপুরবেলা সবুজ মিয়া যখন ভাত খেয়ে একটু ঘুমাবে, তখন তার বন্ধু মন্টু হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকল।
"সবুজ! জলদি চল! চৌধুরী বাড়ির সামনে এক কোম্পানি ফ্রি স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছে। আর সাথে নাকি ফ্রি এনার্জি ড্রিংকও দিচ্ছে!"
'ফ্রি স্বাস্থ্য পরীক্ষা' আর 'ফ্রি ড্রিংক' শুনে সবুজ মিয়ার ঘুম এক নিমেষে উধাও। সে মন্টুর সাথে দৌড়াল চৌধুরী বাড়ির দিকে। গিয়ে দেখল এলাহী কাণ্ড। লাইনে দাঁড়িয়ে রক্ত পরীক্ষা, প্রেসার মাপা সব হচ্ছে। সবুজ মিয়া লাইনে দাঁড়িয়ে গেল।
ডাক্তার সবুজ মিয়ার প্রেসার মেপে একটু চিন্তিত মুখে বললেন, "আপনার প্রেসার তো বেশ হাই। তা ছাড়া ফ্রিতে দেওয়া এনার্জি ড্রিংকটা আপনার একদম খাওয়া চলবে না, ওটাতে সুগার বেশি।"
সবুজ মিয়া মনে মনে ভাবল, "ডাক্তার ব্যাটা হিংসুটে! ফ্রির ড্রিংক নিজে খাবে বলে আমাকে বারণ করছে।"
সে ডাক্তারের কথা কানেই তুলল না। উল্টো লাইনে দুবার দাঁড়িয়ে দুটো ফ্রি এনার্জি ড্রিংক একনাগাড়ে গপগপ করে গিলে ফেলল।
বিকেলের দিকে ফ্রির এনার্জি ড্রিংক আর হাই প্রেসারের চোটে সবুজ মিয়ার মাথা ভোঁভোঁ করতে লাগল, পেটটাও কেমন যেন গুড়গুড় করে উঠল। সে কোনোমতে বাজারের এক কোণায় এসে ধপাস করে বসল।
ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল একটা বড়"মহাবিপদ থেকে মুক্তি! আমাদের এখানে সম্পূর্ণ ফ্রি-তে অভিজ্ঞ কবিরাজ দ্বারা পেট পরিষ্কার করার ভেষজ ওষুধ খাওয়ানো হইতেছে! আজই শেষ দিন
সবুজ মিয়া ভাবল, "বাহ! পেটটাও খারাপ লাগছে, আবার ওষুধটাও ফ্রি! ওপরওয়ালা একদম ঠিক সময়ে মিলিয়ে দিয়েছেন!"
সে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে কবিরাজের কাছে গিয়ে সেই ফ্রি ভেষজ তরল ওষুধ এক গ্লাস খেয়ে নিল।
ওষুধ খাওয়ার ঠিক দুই মিনিট পর সবুজ মিয়ার মনে হলো তার পেটের ভেতর যেন কোনো পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটেছে! পেট খামচে ধরে সে কবিরাজকে জিজ্ঞেস করল, "কবিরাজ মশাই, বাথরুমটা কোথায়?"
কবিরাজ দাঁত কিড়মিড় করে বলল, "বাথরুম তো ওই বাজারের ওপাশে। তবে ভাই, ওটা কিন্তু পাবলিক টয়লেট, পাঁচ টাকা করে নেয়। আমাদের এখানে বাথরুম ফ্রি না!"
সবুজ মিয়া পেটে হাত দিয়ে তীব্র যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠে বলল, "ওরে বাবারে! ফ্রির ওষুধ খাইয়ে এখন পাঁচ টাকার বাথরুমে পাঠাচ্ছ? এ কেমন বিচার!"
সেখান থেকে এক দৌড়ে বাজারে করিমনের কেনা সেই 'ফ্রি' প্লাস্টিকের বালতিটার কথা মনে করে সবুজ মিয়া বাড়ির দিকে অন্ধের মতো ছুটল। সেদিন রাতে সবুজ মিয়া প্রতিজ্ঞা করল, জীবনে আর কখনো 'ফ্রি' শব্দটার ধারের কাছেও সে যাবে না!!" সাইনবোর্ড। সেখানে লেখা—
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!