প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসমায়াবি চোখ-পর্ব ১

গল্প ও উপন্যাস

মায়াবি চোখ-পর্ব ১

মায়াবি চোখ-পর্ব ১

শহরের কোলাহল থেকে দূরে, পাহাড়ের কোল ঘেঁষা এক ছোট্ট রেলস্টেশন 'নীলগিরি রোড'। সেখানে ট্রেনের আনাগোনা কম, কিন্তু প্রকৃতির মায়া অসীম। সেই স্টেশনের এক কোণে ছোট একটা চায়ের দোকান চালাত অভীক। রঙ-তুলি আর ক্যানভাস ছিল তার আসল পৃথিবী, আর চা বিক্রি ছিল জীবন বাঁচানোর উপায়।

একদিন এক বিকেলে, যখন চারপাশ হালকা কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছিল, লোকাল ট্রেন থেকে নামল এক তরুণী। পরনে সাধারণ সুতির শাড়ি, কাঁধে একটা কাপড়ের ব্যাগ। সে স্টেশনের বেঞ্চিতে এসে বসল। অভীক যখন তার জন্য চা নিয়ে এগিয়ে গেল, মেয়েটি মুখ তুলে তাকাল।

বিজ্ঞাপন

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই অভীকের চারপাশের পৃথিবীটা যেন থমকে গেল।

মেয়েটির নাম ছিল মায়াবতী। কিন্তু নামের চেয়েও অলৌকিক ছিল তার চোখ দুটো। সেই চোখে যেন এক অদ্ভুত মায়া, গভীরতা আর বিষাদের নদী লুকিয়ে ছিল। সেই চোখের দিকে তাকালে মনে হতো, হাজার বছরের কোনো না বলা গল্প সেখানে জমা হয়ে আছে। কাজল কালো সেই মায়াবী চোখের এক পলক দেখাতেই অভীক তার ক্যানভাসের সমস্ত রঙ হারিয়ে ফেলল। সে বুঝল, তার জীবনের শ্রেষ্ঠ ছবিটা আঁকার জন্য ক্যানভাসের প্রয়োজন নেই, এই চোখ দুটোই যথেষ্ট।

মায়াবতী এসেছিল ওই পাহাড়ের এক সরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করতে। প্রতিদিন বিকেলে স্কুল শেষে সে স্টেশনে আসত, অভীকের দোকানের চা খেত আর দুজনে মিলে সূর্যাস্ত দেখত। অভীক কখনো মুখে কিছু বলতে পারেনি। সে শুধু মায়াবতীর অলক্ষ্যে তার ডায়েরির পাতায় পাতা জুড়ে এঁকে যেত সেই মায়াবী চোখের অবয়ব।

একদিন মেঘলা সন্ধ্যায় প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলো। স্টেশনের বিদ্যুৎ চলে গেল। অভীকের ছোট দোকানে একটা মোমবাতি জ্বলছিল। মায়াবতী সেদিন বাড়ি ফিরতে পারেনি, আটকা পড়েছিল স্টেশনে।

মোমবাতির মৃদু আলোয় মায়াবতীর চোখের মণি দুটো যেন আরও রহস্যময় আর মায়াবী দেখাচ্ছিল। অভীক আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না। সে তার ডায়েরিটা মায়াবতীর হাতে তুলে দিল।

ডায়েরির পাতা ওলটাতেই মায়াবতী স্তব্ধ হয়ে গেল। প্রতিটা পাতায় নিখুঁতভাবে আঁকা তার নিজের চোখ—কখনো তাতে হাসির ঝিলিক, কখনো মেঘাচ্ছন্ন আকাশের মতো বিষাদ, আবার কখনো এক বুক ভালোবাসা।

মায়াবতী ডায়েরি থেকে মুখ তুলে অভীকের দিকে তাকাল। এবার তার চোখে কোনো বিষাদ ছিল না, ছিল এক মহাসমুদ্রের মতো ভালোবাসা। সে ফিসফিস করে বলল, "মানুষ বলে আমার চোখে নাকি খুব মায়া। কিন্তু আজ বুঝলাম, সেই মায়াকে আগলে রাখার মতো একটা রূপকার এতদিনে খুঁজে পাওয়া গেল।"

বাইরে তখন বৃষ্টির শব্দ, আর ভেতরে দুটো হৃদয়ের নীরব কথোপকথন। কোনো চড়া সুরের প্রেমের প্রস্তাব ছিল না, ছিল না কোনো নাটকীয়তা। শুধু একটি মায়াবী চোখের ইশারায় আর একটি নীরব হৃদয়ের ভালোবাসায় সৃষ্টি হলো এক অমর অনুভূতির গল্প।

০ মন্তব্য · ৭২ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!