প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসজীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে

গল্প ও উপন্যাস

জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে

জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে

হাসপাতালের আইসিইউর (ICU) বাইরে করিডোরের নিয়ন আলোটা ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে। সাড়ে চার ঘণ্টা ধরে সেখানে বসে আছে অরণ্য। তার দুহাতে মুখ ঢাকা, আঙুলের ফাঁক দিয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে কবজিতে। ভেতরের কেবিনে শুয়ে আছে তানিয়া, অরণ্যের জীবনের একমাত্র অবলম্বন।

একটু আগেই ডক্টর সাহেদ বেরিয়ে এসে অরণ্যের কাঁধে হাত রেখেছিলেন। তাঁর মুখের গম্ভীর রেখা আর মলিন চোখ দুটো অনেক না বলা কথা বলে দিচ্ছিল। তিনি শুধু বললেন, "আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি অরণ্যবাবু। বাকিটা এখন ওর লড়াকু ক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে। আগামী কয়েক ঘণ্টা ওর জন্য জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ। মিরাকল কিছু না ঘটলে..." তিনি আর কথা শেষ করেননি, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে গেছেন।

বিজ্ঞাপন


অরণ্য কাঁচের জানলার ওপাশে তাকাল। তানিয়ার চেনা ফর্সা মুখটা এখন নীলচে হয়ে গেছে। মাথায় ব্যান্ডেজ, মুখে অক্সিজেনের মাস্ক, আর সারা শরীরে জড়ানো অজস্র নল। হার্ট মনিটরের কৃত্রিম 'বিপ বিপ' শব্দটা মনে করিয়ে দিচ্ছে, তানিয়ার প্রাণস্পন্দন এখনো সচল, তবে তা অত্যন্ত ক্ষীণ।


মাত্র ছয় ঘণ্টা আগের বিকেলের কথা মনে পড়ল অরণ্যের। তানিয়া তখন হাসছিল। লাল শাড়ি পরে বলেছিল, "আজ আমাদের পঞ্চম বিবাহবার্ষিকী, অরণ্য। ফেরার পথে আইসক্রিম খাওয়াবে কিন্তু!" কত সহজ, কত সুন্দর ছিল মুহূর্তটা। কিন্তু একটা বেপরোয়া ট্রাকের ধাক্কা আর এক নিমেষে ছিটকে যাওয়া রক্তে ভেজা রাস্তা—সবকিছু ওলটপালট করে দিল। অরণ্যের তেমন কিছু হয়নি, কিন্তু তানিয়াকে কেড়ে নেওয়ার জন্য যমদূত যেন ওত পেতে ছিল।


রাত তখন আড়াইটে। করিডোর এখন একদম নিস্তব্ধ। অরণ্য কাঁচের দরজাটা আলতো করে ঠেলে ভেতরেু ঢুকল। নার্স তাকে বাধা দিল না, হয়তো এই নীরব কান্নার ভাষা সে চেনে। অরণ্য তানিয়ার নিস্প্রাণ, ঠান্ডা হাতটা নিজের দুহাতের মুঠোয় নিল। তার চোখের জল তানিয়ার আঙুলের ওপর আছড়ে পড়ল।


"তানিয়া, তুমি এভাবে আমাকে ছেড়ে যেতে পারো না," অরণ্য ফিসফিস করে বলল, তার গলা কান্নায় বুজে আসছিল। "তুমি না বলতে, আমি খুব অলস? তুমি ছাড়া তো আমি সকালে জেগেই উঠতে পারব না। কার জন্য আমি বাড়ি ফিরব বলো তো? আমাদের সেই ছোট্ট ঘরটা, বারান্দার মানিপ্ল্যান্ট গাছটা—সব তোমার অপেক্ষায় আছে। লক্ষ্মীটি, চোখ খোল।"


ঠিক তখনই মনিটরের শব্দটা দ্রুত হতে শুরু করল। গ্রাফের ওঠানামাগুলো কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। তানিয়ার আঙুলগুলো একবার সামান্য কেঁপে উঠল, যেন সে অরণ্যের ডাক শুনতে পেয়েছে, কিন্তু শরীর আর সঙ্গ দিচ্ছে না। সে যেন এক অদৃশ্য নদীর ওপারে চলে যাচ্ছে, আর অরণ্য এপার থেকে তার আঁচল ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।


নার্স ছুটে এসে অরণ্যকে বাইরে বের করে দিল। ডাক্তাররা আবার ভেতরে ঢুকলেন। শুরু হলো আরেকটা যুদ্ধ।


কাঁচের ওপাশে দাঁড়িয়ে অরণ্য দেখল ডাক্তাররা তানিয়ার বুকে ইলেকট্রিক শক দিচ্ছেন। প্রতিটা শকের সাথে তানিয়ার শরীরটা কেঁপে উঠছে, আর বাইরে দাঁড়িয়ে অরণ্যের আত্মাটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। অরণ্য দেওয়াল ধরে মেঝেতে বসে পড়ল। সে কোনোদিন ঈশ্বরের কাছে এভাবে প্রার্থনা করেনি, আজ করল। তার জীবনের সবটুকু আয়ু যেন তানিয়াকে দিয়ে দেওয়া হয়।


ভোর পাঁচটা।


বাইরে তখন হালকা আলোর রেখা ফুটছে। আইসিইউর দরজা খুলে ডক্টর বোস বেরিয়ে এলেন। তাঁর ক্লান্ত মুখে এবার আর আগের মতো অন্ধকার নেই, বরং একটা মৃদু স্বস্তির আভাস।


তিনি অরণ্যের সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং বললেন, "অরণ্যবাবু, আপনার স্ত্রী মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন। ক্রাইসিস কেটে গেছে। ও এখন স্ট্যাবল।"


অরণ্য কিছু বলতে পারল না। তার বুক ফেটে কান্না চলে এল, কিন্তু এই কান্না বেদনার নয়, এ কান্না এক নতুন জীবনের। সে আবার কাঁচের ওপাশে তাকাল। মনিটরের শব্দটা এখন একদম স্বাভাবিক ছন্দে বাজছে। জীবনের এক চরম সন্ধিক্ষণ পেরিয়ে, মৃত্যুর অন্ধকারকে হারিয়ে তানিয়া তখনো ঘুমাচ্ছে, তবে সেই ঘুমে এখন আর বিদায়ের সুর নেই, আছে ফিরে আসার আশ্বাস।

০ মন্তব্য · ৪৬ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!