শহরের অনেক উঁচুতে দাঁড়িয়ে আছে হ্যাপি প্রিন্সের মূর্তি। সে সূক্ষ্ম সোনার পাত দিয়ে ঢাকা। তার চোখ দুটো দুটি নীলকান্তমণি (স্যাফায়ার)। আর তার তলোয়ারের মাথায় বসানো আছে একটি বড় লাল চুনি ।সবাই তাকে খুব ভালোবাসে।
“হ্যাপি প্রিন্সের দিকে তাকাও!” একজন মা তার ছেলেকে বলেন, যে ছেলেটি কেঁদে ভাসিয়ে দিচ্ছে। “হ্যাপি প্রিন্স তো কখনো কাঁদে না। তুমি কি তার মতো হতে চাও না?”“যাই হোক, অন্তত এই শহরের একজন তো সুখী!” একজন খিটখিটে মেজাজের লোক চমৎকার মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললেন।
“ওকে দেখতে ঠিক কোনো ফেরেশতার মতো লাগে!” এতিমখানার শিশুরা বলে ওঠে।
এক রাতে, একটি ছোট্ট সোয়ালো (বা বাবুই সদৃশ) পাখি শহরের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল। সে একেবারে একা। তার সব বন্ধুরা ছয় সপ্তাহ আগেই মিসরে উড়ে চলে গেকিন্তু ছোট সোয়ালো পাখিটি পেছনে থেকে গিয়েছিল, কারণ সে সবচাইতে সুন্দর এক নলখাগড়ার (Reed) প্রেমে পড়েছিল। নলখাগড়াটি ছিল দীর্ঘ, ছিপছিপে এবং বাতাসের তালে খুব সুন্দর করে দুলত
অন্য সোয়ালো পাখিরা এই প্রেম দেখে হেসেছিল।
“কী অদ্ভুত ব্যাপার!” তারা বলেছিল।
“মেয়েটার তো কোনো টাকাপয়সা নেই…“কোনো স্থায়ী চাকরিও নেই…”
তারপর শরৎ এলো। অন্য সব পাখি মিসরের উদ্দেশ্যে রওনা দিল, আর ছোট সোয়ালোটিও তার প্রেমিকার ওপর বিরক্ত হতে শুরু করল।
“হুম, মানছি সে দেখতে সুন্দর। কিন্তু সে কি ভ্রমণ করতে ভালোবাসে?” পাখিটি ভাবল। “আমার হবু বউয়ের তো অবশ্যই ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাস থাকতে হবে।
তাই… সে নলখাগড়াকে জিজ্ঞাসা করল, “তুমি কি আমার সাথে মিসরে যাবে? খুব মজা হবে! আমি তোমাকে পিরামিড দেখাব!”কিন্তু নলখাগড়াটি মাথা নেড়ে ‘না’ বলল।
“বেশ তো! তবে আমি একাই যাচ্ছি!” সোয়ালো উত্তর দিল। “বিদায়!” এই বলে সে শহরের দিকে উড়ে চলে গেল
শহরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে অন্ধকার হয়ে গেল। “এখন আমি রাতে ঘুমাব কোথায়?” সে ভাবলহঠাৎ তার চোখে পড়ল হ্যাপি প্রিন্সের মূর্তিটি। “আহা! আমি ওইখানে ঘুমাব! ওইখান থেকে তো চারপাশের দৃশ্যটাও দারুণ দেখা যাবে!”
সোয়ালোটি হ্যাপি প্রিন্সের দুই পায়ের মাঝে গিয়ে নামল। সে চারপাশটা দেখে নিল। “চমৎকার! আমার তো একেবারে সোনায় মোড়ানো শোবার ঘর!” সে সবেমাত্র ঘুমাতে যাবে, এমন সমযটুপ! —এক ফোঁটা জল এসে তার মাথায় পড়ল“কী ব্যাপার? বৃষ্টি হচ্ছে নাকি?” সে অবাক হয়ে ভাবল। “অদ্ভুত তো… আকাশে তো কোনো মেঘই দেখছি না…”তারপর… টুপ! …আরেক ফোঁটা জল এসে তার ওপর পড়ল।“একবারে বাজে মূর্তি!” সে বিড়বিড় করল। “আমাকে একটু বৃষ্টি থেকেও বাঁচাতে পারে না! এর চেয়ে তো কোনো চিমনি খুঁজে নেওয়া ভাল
কিন্তু তখনই— টুপ! —আরেক ফোঁটা জল পড়ল। সোয়ালো পাখিটি ওপরের দিকে তাকাল। আর সে কী দেখতে পেল?হ্যাপি প্রিন্সের চোখ দুটো জলে ভেসে যাচ্ছে। তার সোনার গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। চাঁদের আলোতে তার মুখটা কী যে করুণ দেখাচ্ছে! ছোট সোয়ালোটির বুকটা দরদে ভরে উ
“তুমি কে?” সে মূর্তিকে জিজ্ঞাসা করল।
“আমি হ্যাপি প্রিন্স।”
“তা… তাহলে তুমি কাঁদছ কেন?” সোয়ালো জিজ্ঞাসা করল। “আমি তো ভিজে একাকার হয়ে গেলাম।”
“হুম। জানো, আমি যখন বেঁচে ছিলাম এবং আমার একটা মানুষের মতো হৃদয় ছিল, তখন আমি কখনো কাঁদিনি,” মূর্তিটি বলল। “আমি সান-সুসি প্রাসাদে থাকতাম। সেখানে দুঃখ বলে কিছু ছিল না। প্রতি রাতে আমি বড় দরবারে নাচতাম। আর দিনে বন্ধুদের সাথে বাগানে খেলা করতামবাগানের চারপাশে বিশাল এক দেয়াল ছিল, কিন্তু আমি কখনো জানতে চাইনি যে সেই দেয়ালের ওপাশে কী আছে। জানার দরকারই বা কী ছিল? আমার চারপাশের সবকিছুই তো এত সুন্দর ছিল
…আমি যখন বেঁচে ছিলাম, সবাই আমাকে ‘হ্যাপি প্রিন্স’ বা সুখী রাজপুত্র বলে ডাকত। আর হ্যাঁ, আমি আসলেই সুখী ছিলাম—যদি আনন্দ আর সুখ একই জিনিস হয়।কিন্তু তারপর আমি মারা গেলাম, আর তারা আমাকে এনে এই উঁচুতে বসিয়ে দিল। এখন আমি আমার শহরের সমস্ত দুঃখ আর কুৎসিত রূপ দেখতে পাই। আমার হৃদয়টা যদিও সিসা দিয়ে তৈরি, তবুও আমি কান্না থামাতে পারি না।”
‘কী! ওর হৃদয়টা সিসার তৈরি? আমি তো ভেবেছিলাম ও নিরেট সোনার!’ সোয়ালো মনে মনে ভাবল। কিন্তু সে মুখে কিছু বলল না, কারণ সে খুব ভদ্র।
“এখান থেকে অনেক দূরে,” মূর্তিটি বলতে লাগল, “অনেক দূরে একটা ছোট গলি আছে। সেই গলিতে একটা ছোট বাড়ি আছে। তার একটা জানালা খোলা, আর আমি ভেতরে একজন মহিলাকে দেখতে পাচ্ছি। তিনি একটা টেবিলের পাশে বসে আছেন। তাঁর মুখটা ক্লান্ত আর চিন্তিত। তাঁর হাত দুটো লাল হয়ে শক্ত পড়ে গেছতিনি একজন দর্জি, এক ধনী নারীর জন্য একটা পোশাক সেলাই করছেন। আর তাঁর ছোট ছেলেটি বিছানায় শুয়ে জ্বরে ছটফট করছে। ছেলেটি কমলালেবু খেতে চাইছে, কিন্তু তার মায়ের কাছে কমলা কেনার টাকা নেই। মা কেবল নদী থেকে জল এনে তাকে খেতে দিতে পারছেন। তাই ছোট ছেলেটি কোঁদেই চলেছে।
--------------(বাকি পরবর্তি পর্বে)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!