তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সপ্তপদী’ উপন্যাসটি শুরু হয় রেভারেন্ড কৃষ্ণস্বামীকে দিয়ে, স্থানীয় লোকজন যাকে ‘বাবাসাহেব’ সম্বোধন করে। তিনি স্থানীয় লোকের রোগের চিকিৎসা করেন, ধর্ম প্রচারে তার কোনো আগ্রহ নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা উপন্যাসটির শুরু হয়েছে এভাবে। এর মধ্যে এক মার্কিন সৈনিকের সঙ্গে জনৈক অমিতাচারী মেয়েকে দেখে তিনি অতীতে চলে যান। এরপর ফ্ল্যাশব্যাকের মতো অতীতের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। তখনই আমরা জানতে পারি কালাচাঁদ গুপ্ত ওরফে কৃষ্ণেন্দুর কথা, সেখান থেকে সে কীভাবে রেভারেন্ড কৃষ্ণস্বামী হয়ে উঠল।
এ প্রসঙ্গে অবশ্যই চলে আসে রিনা ব্রাউনের কথা। যার প্রেমের কারণে বা প্রত্যাখ্যানের কারণে কৃষ্ণেন্দু ঈশ্বর অন্বেষণে মনোনিবেশ করেন। তবে এই রিনা ব্রাউনই যখন অমিতাচারী জীবন বেছে নেয় তখন কৃষ্ণস্বামীর মধ্যে ঈশ্বর বা ধর্ম সম্পর্কে নতুন উপলব্ধি জন্ম নেয়। সমগ্র উপন্যাসের বিভিন্ন জায়গায় আমরা ঈশ্বর, ধর্ম বা মানবজীবনের বিচিত্র অনুভূতি সম্পর্কে লেখকের ভাবনার প্রকাশ দেখতে পাই।
যে বিষয়টি আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে তা হলো এই উপন্যাস রচনার প্রেক্ষাপট। পরিশিষ্ট অংশে লেখক জানাচ্ছেন কৃষ্ণেন্দু চরিত্রটি তিনি পেয়েছেন বাস্তব জীবন থেকে। ১৯১৬ সালে তিনি জেভিয়ার্সে পড়ার সময় একটি ঘটনা বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। কলেজের জনৈক ছাত্র নাকি খ্রিস্টান হচ্ছে। কিছুদিন আলোচনার পর এই ঘটনা সবাই ভুলে যায়। এর অনেক বছর পরে ১৯৫৬ সালে পার্বত্য অঞ্চলে তিনি কলেজের এক বন্ধুর সাক্ষাৎ পান। তার মাধ্যমে লেখক সেই খ্রিস্টান হওয়া ছাত্রটির সন্ধান লাভ করেন। তিনি তখন আদিবাসী এক গ্রামের চার্চের পাদ্রী। তার জীবনের ট্রাজেডি লেখক কৃষ্ণেন্দু চরিত্রটির মাধ্যমে রূপায়ণ করেছেন। রিনা ব্রাউন চরিত্রটিও ঠিক কাল্পনিক নয়। সামান্য দেখা কয়েকবার কয়েকটি ঝলক মাত্র। তবে বিচ্ছিন্ন এই চরিত্রদুটি লেখক নিপুণ দক্ষতায় মিলিয়ে দিয়েছেন। বইটি পড়ার সময় মনে হয়নি যে, এই দুটি চরিত্রের কখনও সাক্ষাৎ হয়নি।
উপন্যাসের নাম ‘সপ্তপদী’ কেন তা আমরা জানতে পারি কৃষ্ণেন্দুর বাবার লেখা একটি চিঠি থেকে। ছেলের উদ্দেশ্যে চিঠিতে তিনি লেখেন, “সাত পা একসঙ্গে পথ হাঁটিলে অবিচ্ছেদ্য বন্ধুত্ব হয়। দেখিলাম কলকাতায় তুমি অনেক পা অনেকের সঙ্গে হাঁটিয়াছ। সপ্তপদ পূর্ণ না হইয়া থাকিলে আর আগাইও না। গোবিন্দ তোমাকে রক্ষা করুন। সপ্তপদ পূর্ণ হইয়া থাকিলে তিনি যেন আর দুই পদ তোমাকে আগাইয়া দেন।” বোঝাই যাচ্ছে উপন্যাসের নাম কেন ‘সপ্তপদী’।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!