❝ বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে। ❞
বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী এই উক্তিটির সন্ধান পাওয়া যায় সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পালামৌ উপন্যাসে। সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কথাসাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। সরকারি চাকরিসূত্রে তিনি কিছুকাল ভারতবর্ষের একটি পরগণা পালামৌতে অবস্থান করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি রচনা করেন ভ্রমণকাহিনী পালামৌ। এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম সফল ভ্রমণকাহিনী।
পালামৌ শহরে লেখক কোল জাতির সঙ্গে আমাদের পরিচিত করান। পরিশ্রমী কোল জাতির সমাজ মূলত মাতৃতান্ত্রিক। পুরুষেরা ওখানে ঘরের কাজ করে আর পরিশ্রমের কাজ করে মেয়েরা, যা বাঙালি সমাজের সম্পূর্ণ বিপরীত। এর কারণে পুরুষেরা অকালেই বৃদ্ধ হয়ে পড়ে আর যৌবনের প্রতীক হয়ে টিকে থাকে নারীরা। এর আগে লেখক কলকাতায় ‘কোল’ সম্প্রদায়ের মানুষ দেখেছেন যারা চা বাগানে কাজ করতে আসে। তাদের মধ্যে আর পালামৌ-এর কোলদের মধ্যে অনেক তফাত। কলকাতায় যাদেরকে কুৎসিত মনে হতো, স্বদেশে তাদেরকে লেখকের কাছে মনে হয়েছে রূপবান। এই প্রসঙ্গেই তিনি বলেছেন, “বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে”।
ঋণ বা কর্জ নামক ব্যাধি কীভাবে সভ্য সমাজ থেকে আদিবাসী সমাজে প্রবেশ করেছে, তার একটা রূপ দেখিয়েছেন লেখক। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “সমাজের স্বভাবতই যে অবস্থা হয় নাই, কৃত্রিম উপায়ে সে অবস্থা ঘটাইতে গেলে, অথবা সভ্য দেশের নিয়মাদি অসময়ে অসভ্য দেশে প্রবিষ্ট করাইতে গেলে ফল ভালো হয় না”।
‘পালামৌ’ ভ্রমণোপ্যাস রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর খুব সুন্দর একটা সমালোচনা লিখেছেন। সেই লেখায় তিনি সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্বন্ধে বলেছেন, “তাঁহার (সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়) রচনা হইতে অনুভব করা যায় তাঁহার প্রতিভার অভাব ছিল না, কিন্তু প্রতিভাকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করিয়া যাইতে পারেন নাই। তাঁহার হাতের কাজ দেখিলে মনে হয়, তিনি যতটা কাজে দেখাইয়াছেন তাঁহার সাধ্য তদপেক্ষা অধিক ছিল। তাঁহার মধ্যে যে পরিমাণ ক্ষমতা ছিল, সে পরিমাণ উদ্যম ছিল না।”
‘পালামৌ’ রচনাটি ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। ছয়টি প্রবন্ধ রচনার পরে এটি শেষ হয়ে যায় এবং শেষ প্রবন্ধটি শেষ হয়েছে মদের প্রসঙ্গ দিয়ে। এ থেকে আমার মনে হয়েছে রচনাটি যেন আকস্মিকভাবে শেষ হয়েছে। লেখকের হয়তো আরও কিছু লেখার ছিল কিন্তু কোনো কারণে শেষ অবধি সেটা হয়ে ওঠেনি। অনেকটা ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’ এর মতো।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!