প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসবলধা গার্ডেনের ওই বাড়ি (পর্ব — ৩ : শেষ রাত)

গল্প ও উপন্যাস

বলধা গার্ডেনের ওই বাড়ি (পর্ব — ৩ : শেষ রাত)

বলধা গার্ডেনের ওই বাড়ি (পর্ব — ৩ : শেষ রাত)

বলধা গার্ডেনের ওই বাড়ি

পর্ব — ৩ : শেষ রাত

রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। বাড়ির সবাই বসার ঘরে বসে ছিল। টেবিলের ওপর লায়লার পুরোনো ছবি, সেই চিঠি আর মরচে ধরা চাবিটা পড়ে আছে। আরিফ চুপ করে ছবিটার দিকে তাকিয়ে ছিল। নুসরাত বলল,

বিজ্ঞাপন

—“আরিফ, আমার কিন্তু একদম ভালো লাগছে না।”

—“আমারও না।”

—“তাহলে ঘরটা খুলবে?”

আরিফ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“হ্যাঁ।”

বর্ষা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,

—“ভাইয়া, আমারে যদি কাল থেইকা আর না পান, আমি কিন্তু কইয়া দিলাম...”

আরিফ তাকিয়ে হেসে ফেলল।

—“তুই চাইলে এখনই বাসায় চলে যেতে পারিস।”

বর্ষা একটু চুপ করে বলল,

—“না ভাইয়া। আপারে একা রেখে যামু কেমনে?”

নুসরাত বর্ষার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

এই মেয়েটা যতই ভয় পাক, তাদের ছেড়ে যেতে চাইছে না।

আদিবা তখন মায়ের পাশে চুপ করে বসে ছিল।

হঠাৎ সে বলল,

—“আজকে লায়লা আন্টি আসবে।”

আরিফ তাকাল।

—“কীভাবে জানো?”

আদিবা খুব স্বাভাবিকভাবে বলল,

—“আজকে ওর জন্মদিন।ঘরের সবাই চুপ হয়ে গেল, রাত ১২টা ১৭ মিনিট

দোতলার শেষ ঘরের সামনে চারজন দাঁড়িয়ে।

রহমান সাহেবও এসেছেন।

তার হাতে একটা টর্চ।

আরিফ চাবিটা তালায় ঢুকিয়ে ঘুরাল।

ক্লিক।

দরজা খুলে গেল।

দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে একটা পুরোনো, বন্ধ ঘরের গন্ধ বেরিয়ে এল।

ধুলো।

পুরোনো কাঠ।

আর একটা অদ্ভুত মিষ্টি গন্ধ।

যেন বহু বছর আগে কোনো আতর বা সুগন্ধি ব্যবহার করা হয়েছিল।

নুসরাত নাক কুঁচকে বলল,

—“কেমন একটা গন্ধ...”

রহমান সাহেব আস্তে বললেন,

—“জুঁই।”

ঘরের ভেতরে একটা পুরোনো খাট।

একটা কাঠের আলমারি।

দেওয়ালে ধুলো পড়া একটা আয়না।

আর জানালার পাশে একটা ছোট টেবিল।

টেবিলের ওপর একটা শুকিয়ে যাওয়া ফুলের মালা।

আদিবা দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল।

হঠাৎ সে বলল,

—“ওখানে।”

সে টেবিলের নিচে আঙুল দেখাল।

আরিফ টর্চ ফেলল।

একটা ছোট কাঠের বাক্স।

বাক্সটার ওপর লেখা—

লায়লা।

আরিফ বাক্সটা খুলল।

ভেতরে কিছু পুরোনো চিঠি।

একটা ছোট ডায়েরি।

আর একটা কালো-সাদা ছবি।

ছবিটা হাতে নিয়ে নুসরাতের বুক কেঁপে উঠল।

ছবিতে লায়লা।

তার পাশে একজন যুবক।

ছবির পেছনে লে“আমি চলে গেলে এই ছবিটা যেন ওর কাছে না যায়।”

আরিফ বলল,

—“ও কে?”

রহমান সাহেব ছবিটা দেখেই পিছিয়ে গেলেন।

—“এটা...”

—“চেনেন?”

লোকটা মাথা নিচু করল।

—“জি।”

—“কে?”

রহমান সাহেব অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর বললেন,

—“লায়লার ছোট চাচাতো ভাই। কামাল।”

আরিফ বলল,

—“কামাল এখন কোথায়?”

রহমান সাহেব উত্তর দিলেন,

—“মারা গেছে।”

—“কবে?”

—“অনেক বছর আগে।”

—“কীভাবে?”

লোকটা বলল,

—“সড়ক দুর্ঘটনা।”

তারপর আর কিছু বলল না।

আরিফ ডায়েরিটা খুলল।

প্রথম কয়েকটা পৃষ্ঠা সাধারণ।

লায়লার নিজের কথা।

বিয়ের কথা।

বাড়ির কথা।

তারপর হঠাৎ লেখাগুলো বদলে গেছে।

একটা পাতায় লে“আমি বাবাকে বিশ্বাস করি না।”

পরের পাতায়—

“আমি জানি, উনি কামালকে টাকা দিয়েছেন।”

আর তার পরের পাতায়—

“আমার বিয়ে আমি করতে চাই না।”

আরিফ থেমে গেল।

নুসরাত তার পাশে দাঁড়িয়ে পড়ছিল।

পরের পাতায় লেখা—

“আমি যদি বিয়ে না করি, বাবা বলেছে আমাকে এই বাড়ি থেকে বের করে দেবে।”

আরেক পৃষ্ঠা।

“কামাল আজ আমাকে বলেছে, আমি যদি কাউকে সব বলে দিই, তাহলে আমাকে বাঁচতে দেবে না।”

নুসরাতের মুখ শুকিয়ে গেল।

—“আরিফ...”

আরিফ পড়তে থাকল।

শেষের দিকের পাতাগুলো ছিঁড়ে ফেলা।

কিন্তু একটা পৃষ্ঠার অর্ধেক অংশ রয়ে গেছে।

সেখানে লেখা—

“আজ রাতে আমি পালিয়ে যাব।

আমার কাছে সব প্রমাণ আছে।

বাবা জানে না, আমি কাগজগুলো কোথায় রেখেছি।”

তারপর আর কিছু নেই।

রহমান সাহেব হঠাৎ বললেন,

—“বাক্সের নিচে দেখেন।”

আরিফ বাক্সটা উল্টে দেখল।

নিচে কাঠের একটা পাতলা অংশ।

চাপ দিতেই খুলে গেল।

ভেতরে একটা খাম।

খামের ওপর লেখা—

“যদি আমি ফিরে না আসি।”

আরিফ খামটা খুলল।

ভেতরে কয়েকটা কাগজ।

একটা জমির কাগজ।

একটা ব্যাংকের হিসাব।

আর একটা হাতে লেখা স্বীকারোক্তির মতো কাগজ।

লায়লা লিখেছিল—

তার বাবা তার সম্পত্তির একটা অংশ জোর করে অন্য একজনের নামে লিখে দিতে চেয়েছিলেন।

লায়লা রাজি হয়নি।

কামালকে দিয়ে তাকে ভয় দেখানো হচ্ছিল।

বিয়ের আগের রাতে লায়লা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল।

কিন্তু সে বাড়ি থেকে বের হতে পারেনি।

নুসরাত কাঁপা গলায় বলল,

—“তাহলে ও মারা গেল কীভাবে?”

কেউ উত্তর দিল না।

ঠিকঠক।

ঘরের দরজা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।

বর্ষা চিৎকার করে উঠল,

—“আল্লাহ!”

আরিফ দরজার দিকে ছুটে গেল।

হাতল নাড়ল।

দরজা খুলছে না।

তারপর ঘরের আয়নাটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।

টং!

সবাই তাকিয়ে রইল।

আয়নার ভেতর যেন ঘরটা দেখা যাচ্ছে।

কিন্তু একটা জিনিস আলাদা।

আয়নায় সবাই আছে।

আরিফ।

নুসরাত।

আদিবা।

বর্ষা।

রহমান সাহেব।

কিন্তু তাদের পেছনে আরও একজন দাঁড়িয়ে।

একজন মহিলা।

লম্বা চুল।

সাদা পোশাক।

মুখ দেখা যাচ্ছে না।

নুসরাত ঘুরে পেছনে তাকাল।

কেউ নেই।

আবার আয়নার দিকে তাকাল।

মহিলাটাও নেই।

শুধু আয়নার ওপর ধীরে ধীরে একটা লেখা ফুটে উঠল।

“ছাদ।”

আরিফ দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে ফেলল।

সবাই ছুটে ছাদে উঠল।

পুরোনো ছাদ।

এক পাশে ভাঙা কার্নিশ।

আর ঠিক সেই জায়গায় একটা ছোট লোহার বাক্স।

রহমান সাহেব বাক্সটা দেখে বললেন,

—“এটা তো আগে ছিল না...”

আরিফ বাক্সটা খুলল।

ভেতরে একটা কাপড়ে মোড়ানো জিনিস।

খুলতেই বের হলো—

একটা পুরোনো মোবাইল ফোন।

সবার চোখ বড় হয়ে গেল।

এত পুরোনো মডেল, কিন্তু ব্যাটারিটা অদ্ভুতভাবে ঠিক আছে।

আরিফ পাওয়ার বাটন চাপল।

স্ক্রিন জ্বলে উঠল।

মাত্র একটা ভিডিও।

তারিখ—

১৯৯৮ সালের সেই রাত।

ভিডিও চালু হলো।

কাঁপা ক্যামেরা।

লায়লার মুখ।

সে ফিসফিস করে বলছে—

“আমি যদি এই ভিডিওটা কারও কাছে পৌঁছাতে না পারি, তাহলে বুঝবেন... আমি এই বাড়ি থেকে বের হতে পারিনি।”

তারপর পেছনে একটা পুরুষের গলা“লায়লা!”

ভিডিও কেঁপে উঠল।

লায়লা বলল,

“কামাল, তুমি এখানে কেন?”

পুরুষের গ“কাগজগুলো দে।”

লায়লা বলল,

“আমি দেব না।”

তারপর ধস্তাধস্তির শব্দ।

ভিডিও মাটিতে পড়ে গেল।

কয়েক সেকেন্ড পর একটা শব্দধাম!

ভিডিও শেষ।

ঘরে তখন কেউ কথা বলছে না।

রহমান সাহেব মাটিতে বসে পড়লেন।

তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।

আরিফ বলল,

—“আপনি সব জানতেন?”

লোকটা মাথা নিচু করে বলল,

—“সব না।”

—“তাহলে?”

—“আমি শুধু জানতাম, লায়লা ছাদ থেকে পড়ে মারা যায়নি।”

নুসরাত বলল,

—“তাহলে?”

রহমান সাহেব বললেন,

—“ওকে ধাক্কা দেওয়া হয়েছিল।”

—“কে?”

লোকটা কাঁপতে কাঁপতে বলল,

—“কামাল।”

ঘরের বাতাস যেন থেমে গেল।

—“কিন্তু আপনি এতদিন চুপ ছিলেন কেন?”

রহমান সাহেব চোখ মুছলেন।

—“আমি ভয় পেয়েছিলাম।”

—“কিসের?”

লোকটা ধীরে ধীরে বলল,

—“বাড়ির মালিকের।”

তারপর একটু থেমে বলল,

—“কিন্তু একটা কথা আমি কোনোদিন বুঝি নাই।”

—“কী?”

রহমান সাহেব দোতলার দিকে তাকালেন।

—“লায়লার লাশ পাওয়া যায়নি।”

সেই মুহূর্তে আদিবা বলল,

—“ও এখানে নেই।”

সবাই তার দিকে তাকাল।

—“কে নেই?”

আদিবা ছাদের এক কোণের দিকে তাকিয়ে বলল,

—“লায়লা আন্টি।”

নুসরাত মেয়েকে কাছে টেনে নিল।

—“তুমি কী বলছ?”

আদিবা খুব শান্ত গলায় বলল,

—“ও বলছে, ও আর এখানে থাকতে চায় না।”

তারপর মেয়েটা চোখ বন্ধ করল।

কয়েক সেকেন্ড পর বলল,

—“ও বলছে, ওর জন্য দোয়া করতে।”

সেদিন রাতেই তারা নিচে নেমে এল।

নুসরাত ওযু করল।

আরিফও।

রহমান সাহেব চুপচাপ বসে ছিলেন।

তারা লায়লার জন্য দোয়া করল।

কোনো তাবিজ নয়।

কোনো ঝাড়ফুঁক নয়।

শুধু একজন মৃত মানুষের জন্য দোয়া।

দোয়া শেষ হওয়ার পর আদিবা হঠাৎ বলল,

—“মা।”

—“কী?”

—“লায়লা আন্টি হাসছে।”

নুসরাতের চোখে পানি এসে গেল।

—“কোথায়?”

আদিবা জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“ওখানে।”

কিন্তু সেখানে কেউ ছিল না।

শুধু জানালার বাইরে রাতের অন্ধকার।

পরদিন সকালে বাড়িটা অদ্ভুত শান্ত।

কোনো শব্দ নেই।

দরজায় টোকা নেই।

রাতে পায়ের শব্দ নেই।

দোতলার শেষ ঘরটাও একদম স্বাভাবিক।

নুসরাত ঘরে গিয়ে দেখল, আয়নাটা পরিষ্কার।

টেবিলের ওপরের শুকনো ফুলের মালাটাও নেই।

শুধু একটা জিনিস পড়ে আছে।

লায়লার পুরোনো ছবি।

ছবির পেছনে নতুন করে একটা“ধন্যবাদ।”

তিন মাস পর তারা বাড়িটা ছেড়ে দেয়।

আরিফ আর কখনো সেই বাড়িতে ফিরে যায়নি।

রহমান সাহেবও পরে আর সেখানে কাজ করেননি।

বাড়িটা আবার খালি হয়ে যায়।

কেউ বলে বাড়িটা বিক্রি হয়েছে।

কেউ বলে মালিক বিদেশ থেকে ফিরে এসে বাড়িটা ভেঙে ফেলেছেন।

সত্যিটা আরিফও জানে না।

তবে একটা ব্যাপার সে আজও কাউকে ঠিকভাবে বোঝাতে পারে না।

বাড়ি ছাড়ার আগের রাতে সে আদিবার ঘরে ঢুকেছিল।

মেয়েটা ঘুমিয়ে।

টেবিলের ওপর তার আঁকা একটা ছবি।

একটা পুরোনো বাড়ি।

বাড়ির সামনে চারজন মানুষ।

আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে একজন মহিলা।

এইবার মহিলার মুখ দেখা যাচ্ছে।

সে হাসছে।

আর ছবির নিচে আদিবার হাতের লেখা—

“লায়লা আন্টি চলে গেছে।”

আর তার ঠিক নিচে আরেকটা ছোট লাইন।

যেটা দেখে আরিফের বুকটা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল“কিন্তু উনি বলেছে, আবার আসবে না... শুধু দেখতে আসবে।”

শেষ কথা

বছর দুয়েক পর একদিন আরিফ পুরান ঢাকার ওই দিক দিয়ে যাচ্ছিল।

গাড়ি থামিয়ে দূর থেকে বাড়িটার দিকে তাকাল।

বাড়িটা তখনও দাঁড়িয়ে।

জানালাগুলো বন্ধ।

দোতলার শেষ ঘরটাও অন্ধকার।

আরিফ গাড়ি ঘুরিয়ে চলে আসছিল।

ঠিক তখন তার ফোনে একটা নোটিফিকেশন এল।

অচেনা নম্বর থেকে একটা ছবি এসেছে।

ছবিটা খুলে তার হাত কেঁপে উঠল।

ছবিতে তাদের পুরোনো বাড়ি।

দোতলার জানালায় একজন মহিলা দাঁড়িয়ে।

আর ছবির নিচে মাত্র একটা লেখা—

“আমি এখন ভালো আছি।”

নম্বরটায় কল করেছিল আরিফ।

নম্বরটি আর কখনো চালু হয়নি।

—সমাপ্ত।।

১ মন্তব্য · ১৭৭ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (১)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন
শাণিত স্বর ১৫ আগস্ট, ২০২৬

সুন্দর গল্পটির অপেক্ষায় ছিলাম । ভালো লাগলো