প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসচোখে সর্ষে ফুল

গল্প ও উপন্যাস

চোখে সর্ষে ফুল

চোখে সর্ষে ফুল

আমাদের মফস্বল শহরের পট্লু মিয়া ছিল অলসতার এক জীবন্ত মূর্তি। তার জীবনের মূল দর্শন ছিল—"আজকের কাজ কাল করো, আর কালকের কাজ কোনোদিন করো না।" কোনো পরিশ্রম ছাড়াই কীভাবে রাতারাতি বড়লোক হওয়া যায়, পট্লু সারাদিন শুয়ে শুয়ে শুধু সেই ফন্দি আঁটত।

গত সপ্তাহে পট্লু এক দালালের খপ্পরে পড়ল। দালাল তাকে বোঝাল, "পট্লু ভাই, বিদেশে একটা চাকরি আছে। কাজ কিছুই না, শুধু বড় এক ধনকুবেরের বাগানের আমগাছ পাহারা দেওয়া। মাসে বেতন এক লাখ টাকা! তবে যাওয়ার আগে সিকিউরিটি ডিপোজিট হিসেবে নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা দিতে হবে।"

বিজ্ঞাপন

পট্লুর মাথায় তখন এক লাখ টাকার ভূত চেপেছে। সে ভাবল, "বাগানের আম পাহারা দেওয়া? এ তো আমার বাঁ হাতের খেলা! গাছের তলায় শুয়ে শুয়ে ঘুমাব আর আম গুনব।" সে তড়িঘড়ি করে নিজের জমানো সব টাকা আর মায়ের গলার চেইন বন্ধক রেখে দালালকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে দিল।

পরদিন দালাল তাকে জঙ্গলঘেরা এক বিশাল বাগানে নিয়ে গেল। কিন্তু সেখানে গিয়ে পট্লুর চোখ ছানাবড়া! সেই ধনকুবেরের বাগান পাহারা দেওয়ার জন্য কোনো আমগাছ নেই, সেখানে আছেমৌমাছির ! আর সেই বাগানের মালিক হলেন এক কড়া মেজাজের রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার।

অফিসার গর্জে উঠে বললেন, "এই যে পট্লু, তোমার কাজ হলো প্রতিদিন এই একশটা বক্স থেকে মধু সংগ্রহ করা। সাবধান, একটা মৌমাছিও যেন বাক্স থেকে বের হতে না পারে। যদি কাজ ঠিকমতো না করো, তবে পুলিশে দেব!"

পট্লু বুঝল সে এক মস্ত বড় ফাঁদে পড়েছে। কিন্তু টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো উপায় নেই। চাকরি না করলে পুলিশ ধরবে, আর করলে মৌমাছি কামড়াবে! একচোখে সর্ষে ফুল দেখার প্রথম ধাপ।


প্রথম দিন পট্লু মিয়া ভয়ে ভয়ে একটা বাক্সের কাছে গেল। সে ভেবেছিল মৌমাছিরা হয়তো তাকে চেনে না দেখে কিছু বলবে না। কিন্তু যেমনই সে বাক্সের ঢাকনাটা একটু আলগা করল, অমনি "ভনভন" করে এক ঝাঁক ক্ষ্যাপাটে মৌমাছি তার দিকে তেড়ে এল।

পট্লু দিল এক দৌড়! কিন্তু মৌমাছির দলও ছাড়ার পাত্র নয়। তারা পট্লুর পিছু পিছু ছুটল। দৌড়াতে দৌড়াতে পট্লু এক আছাড় খেয়ে সোজা গিয়ে পড়ল পাশের এক কর্দমাক্ত সর্ষে ক্ষেতের মাঝখানে!


ক্ষেতে পড়তেই ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি এসে পট্লুর নাক, কান, গাল আর কপালে ইচ্ছামতো হুল ফোটাতে লাগল। ব্যথায় আর জ্বালায় পট্লুর চোখের সামনে তখন আক্ষরিক অর্থেই চারদিক হলুদ হয়ে গেল। সে সর্ষে ক্ষেতের মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে, আর তার চোখের সামনে সত্যি সত্যিই হাজার হাজার হলুদ সর্ষে ফুল বনবন করে ঘুরছে!

ঠিক তখনই দূর থেকে সেই আর্মি অফিসার চেঁচিয়ে বললেন, "কী হে পট্লু মিয়া! প্রথম দিনেই সর্ষে ক্ষেতে শুয়ে বিশ্রাম নেওয়া হচ্ছে? জলদি উঠে মধু সংগ্রহ করো!"


পট্লু কোনোমতে ফুলে-ফেঁপে যাওয়া মুখ নিয়ে সর্ষে ক্ষেত থেকে উঠে দাঁড়াল। তার দুই চোখ ফুলে এমন ছোট হয়ে গেছে যে সে ঠিকমতো দেখতেও পাচ্ছিল না। আয়নায় নিজের মুখ দেখে তার মনে হলো সে কোনো মানুষ নয়, বরং একটা ফোলা আলু!

সেদিন বিকেলে পট্লু মিয়া সেই বাগান থেকে কোনোমতে প্রাণ হাতে নিয়ে পালিয়ে বাড়ি ফিরল। তাকে দেখে তার মা জিজ্ঞেস করল, "কী রে পট্লু, লাখ টাকার চাকরি কেমন হলো? কী দেখে এলি?"

পট্লু তার ফোলা গালে হাত দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, "মাগো! লাখ টাকার চাকরি তো দূর, অলসতার ফল হাতেনাতে পেয়ে এসেছি। জীবনে বইয়ের পাতায় অনেক বাগধারা পড়েছি, কিন্তু আজকে সর্ষে 'চোখে সর্ষে ফুল আসলে কাকে বলে!"


পর থেকে পট্লু মিয়া কোনোদিন বিনা পরিশ্রমে বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন দেখেনি। এখন কেউ তার সামনে 'সহজ কাজ' বা 'মধু'-র কথা বললে সে ভয়ে দুই হাত পিছিয়ে যায়।

০ মন্তব্য · ৬৪ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!