অনিন্দ্য তখন কলেজের থার্ড ইয়ারে পড়ে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, এক প্রত্যন্ত গ্রামে বন্ধুর বোনের বিয়েতে গিয়েছিল সে। বিয়েবাড়ি থেকে যখন সে ফিরতি পথ ধরল, তখন ঘড়িতে রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। গ্রামের কাঁচা রাস্তা, চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার। আকাশে মেঘ জমে থাকায় চাঁদের আলোও উধাও। একটু পরেই শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি, সেই সাথে প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া।
অনিন্দ্যর ছাতাটা বাতাসের তোড়ে এক ঝটকায় উল্টে গেল। কোনো উপায় না দেখে সে পিচের রাস্তার দিকে দৌড়াতে লাগল, যদি কোনো একটা গাড়ি পেয়ে যায়। কিছুদূর যাওয়ার পর সে দেখল রাস্তার পাশে এক বিশাল পুরনো বটগাছ, আর তার ঠিক নিচেই আবছা আলোয় দাঁড়িয়ে আছে একটা বাস স্টপ। লোহার তৈরি ছাউনিটা জরাজীর্ণ, মরচে ধরা।
সেখানে কোনো মানুষ ছিল না। অনিন্দ্য হাঁপাতে হাঁপাতে ছাউনির নিচে গিয়ে দাঁড়াল। শীতে আর ভয়ে তার শরীর কাঁপছিল। পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখল কোনো নেটওয়ার্ক নেই, চার্জও মাত্র পাঁচ শতাংশ। ঠিক তখনই অন্ধকারের বুক চিরে দূর থেকে একটা হেডলাইটের আলো দেখা গেল।
একটা বাস আসছে। অনিন্দ্যর মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস নামল। এত রাতে এই রুটে বাস পাওয়ার কথা নয়, তাও আবার এমন দুর্যোগে! বাসটি একদম ধীর গতিতে এসে স্টপে থামল। বাসের গায়ের রঙ চটে গেছে, জানালার কাঁচগুলো ভাঙা। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এত ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেও বাসের ইঞ্জিন থেকে কোনো শব্দ আসছিল না, যেন বাসটি ভেসে ভেসে এল।
অনিন্দ্য বেশি কিছু না ভেবে বাসের পেছনের দরজা দিয়ে ভেতরে উঠে পড়ল। বাসের ভেতরে টিমটিম করে একটা নীলচে আলো জ্বলছিল। পুরো বাসটা একদম নিস্তব্ধ। ভেতরে সাত-আটজন যাত্রী বসা ছিল, কিন্তু কেউ কোনো কথা বলছিল না। সবাই সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে অনড় হয়ে বসে আছে। অনিন্দ্য মাঝখানের একটা খালি সিটে বসল।
তার ঠিক সামনের সিটে এক ভদ্রমহিলা বসে ছিলেন, মাথায় ঘোমটা টানা। অনিন্দ্য কৌতূহলবশত জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা ভাই, এই বাসটা কি শহরে যাবে?"
কোনো উত্তর এল না। মহিলাটি একইভাবে স্থবির হয়ে বসে রইলেন। অনিন্দ্য ভাবল হয়তো বৃষ্টির শব্দের কারণে শুনতে পাননি। সে হালকা একটু ঝুঁকে মহিলার কাঁধে হাত দিল। হাত দেওয়া মাত্রই অনিন্দ্যর পুরো শরীর শিউরে উঠল। মনে হলো সে কোনো বরফের টুকরো ছুঁয়েছে! মানুষ এতটা ঠাণ্ডা কীভাবে হতে পারে?
ঠিক তখনই বাসটি এক ঝটকায় ব্রেক করল। ঝড়ের আলোড়নে বাসের ভেতরের নীল বাতিটা একবার জ্বলে উঠেই দপ করে নিভে গেল। পুরো বাস সেকেন্ডের জন্য ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে গেল। আর তখনই অনিন্দ্যর কানে এল এক অদ্ভুত, শুকনো খসখসে হাসির শব্দ। যেন একসঙ্গে অনেকগুলো মানুষ ফিসফিস করে হাসছে।
পরের মুহূর্তেই বাসের আলোটা আবার জ্বলে উঠল। অনিন্দ্যর চোখ ভয়ে কপালে উঠে গেল। তার চারপাশের যাত্রীরা সবাই এবার ঘাড় ঘুরিয়ে সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে আছে! কিন্তু তাদের কারও মুখে কোনো চোখ, নাক বা মুখ নেই—একেবারে সমতল, সাদা চামড়া!
সামনের সিটের সেই মহিলাটিও তার দিকে ঘুরে বসেছেন। তার মাথার ঘোমটা খসে পড়েছে। মহিলার মাথাটা চিলড্রেনস টয়ের মতো পুরো উল্টো দিকে ঘোরানো, আর তার চোখের কোটর দুটো একদম শূন্য, সেখান থেকে টপটপ করে কালো রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
অনিন্দ্য চিৎকার দিতে চাইল, কিন্তু ভয় তার গলা চেপে ধরল। সে সিট থেকে উঠে পেছনের দরজার দিকে দৌড় দিল। কিন্তু দরজাটা ভেতর থেকে লক করা। সে জানালার কাঁচ ভাঙার চেষ্টা করতে লাগল। এমন সময় পেছনের ড্রাইভারের সিট থেকে একটা ভারী, গমগমে কণ্ঠস্বর ভেসে এল, "এত রাতে মাঝপথ থেকে যারা আমাদের বাসে ওঠে, তারা আর কোনোদিন গন্তব্যে পৌঁছায় না..."
অনিন্দ্য পেছনে তাকিয়ে দেখল, সব কটা অবয়ব সিট ছেড়ে উঠে তার দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে। তাদের হাতগুলো অস্বাভাবিক লম্বা হয়ে যাচ্ছে। একদম সামনে থাকা শূন্য চোখের সেই মহিলাটি তার বরফশীতল হাত দিয়ে অনিন্দ্যর গলা চেপে ধরল। অনিন্দ্যর চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে আসতে লাগল।

পরদিন সকালে স্থানীয় গ্রামবাসীরা পিচের রাস্তার পাশে সেই পুরনো বটগাছের নিচে অনিন্দ্যকে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। তার পুরো শরীর তখনো ঠান্ডায় কাঁপছিল, আর গলার চারপাশে ছিল কালচে রঙের হাতের আঙুলের দাগ। জ্ঞান ফেরার পর অনিন্দ্য যখন বাসের কথা বলল, তখন গ্রামের এক বয়স্ক লোক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "বাবা, আজ থেকে ঠিক দশ বছর আগে এই ঝড়-বৃষ্টির রাতেই ওখানকার একটা বাস খাদে পড়ে সব যাত্রীসহ মারা গিয়েছিল। তারপর থেকে অমাবস্যার রাতে ওই অভিশপ্ত বাস নাকি এখনো যাত্রী খোঁজে..."
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!