বলধা গার্ডেনের ওই বাড়ি
পর্ব — ২ : যে নামটা কেউ উচ্চারণ করে না
বর্ষার কথা শুনে নুসরাত কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। —“ইট দিয়ে বন্ধ?” বর্ষা মাথা নাড়ল।—“জি আপা। আমি নিজের চোখে দেখছি। ওই জানালায় বাইরে থেইকা ইট লাগানো।” আরিফ তখন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিল। সব শুনে সে বলল,
—“কী হয়েছে?” নুসরাত বলল,—“বর্ষা বলছে রান্নাঘরের জানালায় একজন মহিলাকে দেখেছে।”আরিফ বর্ষার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“কখন?” —“এই তো একটু আগে ভাইয়া।”—“কেমন দেখতে?” বর্ষা এবার চুপ। তারপর আস্তে বলল, —“চেহারা দেখি নাই।”
—“তাহলে বুঝলে কীভাবে মহিলা?” বর্ষা উত্তর দিল না। নুসরাত বলল, —“চুল মুখের সামনে ছিল।”আরিফ একটু হেসে বলল,
—“আচ্ছা। তোমরা দুজন মিলে আজকে আমাকে ভয় দেখাবে?” বর্ষা এবার বিরক্ত হয়ে বলল, —“ভাইয়া, আমি মিথ্যা কইতেছি না।”
আরিফ কিছু বলল না। সে রান্নাঘরে গিয়ে জানালাটা দেখল। সত্যিই জানালার বাইরের অংশটা ইট দিয়ে বন্ধ। সেখানে কোনো মানুষের দাঁড়ানোর জায়গাই নেই। কিন্তু জানালার ভেতরের কাঁচে একটা জিনিস স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। একটা লম্বা হাতের ছাপ। যেন কেউ ভেতর থেকে কাঁচে হাত রেখে দাঁড়িয়েছিল। আরিফ হাত দিয়ে ছাপটা মুছতে গিয়ে থেমে গেল। ছাপটা শুকনো ছিল না। কাঁচটা ভেজা। যদিও সেদিন সকাল থেকে বৃষ্টি হয়নি। সেদিন দুপুরে আরিফ রহমান সাহেবকে ফোন করল। “চাচা, বাড়ির আগের ইতিহাসটা একটু বলবেন?” ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর রহমান সাহেব বললেন, —“কী হয়েছে?” “কিছু না। শুধু জানতে চাচ্ছি।” —“কী জানতে চান?” —“আগে কারা থাকত?” আবার নীরবতা। তারপর রহমান সাহেব বললেন, “আপনি কেন এসব জানতে চাইতেছেন?” আরিফ এবার একটু বিরক্ত হয়ে বলল, —“চাচা, বাড়িতে উঠেছি। বাড়ি সম্পর্কে জানার অধিকার তো আছে।” লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আচ্ছা। সন্ধ্যায় আসি।” সন্ধ্যা সাতটার দিকে রহমান সাহেব এলেন। বয়স প্রায় সত্তরের কাছাকাছি। হাতে একটা পুরোনো ছাতা।
আরিফ বসার ঘরে বসিয়ে চা দিল। নুসরাতও পাশে বসেছিল। বর্ষা রান্নাঘরের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনছিল। রহমান সাহেব চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বললেন, —“আপনারা কতদিন থাকতে চান?” আরিফ বলল, —“আপাতত তো থাকবই।” —“ভালো।”
“কিন্তু একটা কথা জানতে চাই।” —“জি।”—“দোতলার শেষ ঘরটা বন্ধ কেন?” লোকটার হাত থেমে গেল। চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে সে বলল, —“ওই ঘর খুলবেন না। ”আরিফ হেসে বলল, —“কেন?” —“খুলবেন না।” —“চাবি তো আমাদের কাছেই আছে।”
রহমান সাহেব এবার আরিফের দিকে তাকালেন। তার চোখের দৃষ্টি বদলে গেছে।—“চাবি আপনার কাছে কীভাবে আসল?”
আরিফ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, —“আদিবা পেয়েছে।” এই কথাটা বলার পর ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। রহমান সাহেব খুব ধীরে বললেন, —“কোথায়?”—“ঘরের সামনে।”লোকটা উঠে দাঁড়াল।—“চাবিটা আমাকে দেন।” নুসরাত বলল,—“কেন?”
“আপা, দেন।” —“কেন বলেন।” রহমান সাহেব এবার নিচু গলায় বললেন,—“ওই চাবি এই বাড়ির কেউ হারায় নাই।”
নুসরাতের বুকটা কেমন করে উঠল।—“তাহলে?” লোকটা উত্তর দিল না। সেদিন রাতে আদিবা খেতে বসে হঠাৎ বলল, “মা, আন্টি আজকেআসেনি”নুসরাত চামচ হাতে থেমে গেল। “কোন আন্টি?” “ওই আন্টি।” —“তুমি আবার দেখেছ?” আদিবা মাথা নাড়ল। “হুম।” আরিফ বলল, —“কোথায় দেখেছ?” আদিবা খুব স্বাভাবিকভাবে বলল, “দাদুর ঘরে।” আরিফের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
—“আমাদের তো কোনো দাদুর ঘর নেই।” আদিবা একটু অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল। —“আছে তো।” —“কোথায়?”
আদিবা উঠে দাঁড়াল। তারপর সোজা দোতলার সিঁড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। সবাই তার পেছনে গেল। দোতলায় উঠে আদিবা বারান্দার এক পাশে দাঁড়িয়ে বলল, —“এইখানে।” আরিফ চারপাশে তাকাল। সেখানে শুধু একটা পুরোনো কাঠের আলমারি।
আর তার পাশেই দেওয়াল। কোনো দরজা নেই। আদিবা দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে বলল, —“দাদু এইখানেই থাকত।” রহমান সাহেব তখন সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ তার মুখ সাদা হয়ে গেল। সে খুব আস্তে বলল, “এই মেয়েটা এসব জানল কীভাবে?”
সেদিন রাতেই রহমান সাহেব চলে যাওয়ার আগে আরিফকে একপাশে ডেকে বললেন, —“আপনাকে একটা কথা বলব। কিন্তু আপা বা মেয়ের সামনে বলবেন না।” —“বলুন।” —“এই বাড়িতে একসময় একজন মেয়ে থাকত।” —“কে?”
লোকটা চারপাশে তাকিয়ে বলল,—“লায়লা।”নামটা বলার পরই সে চুপ হয়ে গেল।আরিফ বলল,—“লায়লা কে?” —“এই বাড়ির মালিকের মেয়ে।” —“কী হয়েছিল তার?”রহমান সাহেব এবার সরাসরি উত্তর দিলেন না। বললেন,—“অনেক বছর আগে মারা গেছে।”
—“কীভাবে?” লোকটা নিচু গলায় বলল,—“ছাদ থেকে পড়ে।” আরিফ বলল, —“দুর্ঘটনা?” রহমান সাহেব তাকালেন।—“সবাই তাই বলেছিল।” এই কথাটার মধ্যে অন্য কিছু ছিল। আরিফ বুঝতে পারল।—“আপনি কী বলেন?”রহমান সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,“আমি কিছু বলি না।” তারপর দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে থেমে গেলেন। পেছনে না তাকিয়েই বললেন,“আর একটা কথা।”
—“জি? “লায়লার নাম রাতে মুখে আনবেন না।” রাত তখন সাড়ে এগারোটা। নুসরাত ঘুমানোর আগে আদিবার ঘরে গেল।
মেয়েটা জানালার পাশে বসে ছবি আঁকছে। “কী আঁকছ?” আদিবা বলল, “লায়লা আন্টি।” নুসরাতের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে ছবিটা হাতে নিল। একজন মহিলা। লম্বা চুল।মুখ দেখা যাচ্ছে না। পেছনে একটা বাড়ি। আর বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে একজন পুরুষ।
নুসরাত জিজ্ঞেস করল,“এই লোকটা কে?”আদিবা বলল, “দাদু।” “তুমি দাদুকে দেখেছ?” —“না।”—“তাহলে আঁকল কীভাবে?”
আদিবা এবার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,—“লায়লা আন্টি দেখাইছে।”নুসরাত আর কথা বলতে পারল না। রাত প্রায় দুইটা।
হঠাৎ নুসরাতের ঘুম ভেঙে গেল। তার পাশে আরিফ নেই। বিছানার অন্য পাশটা খালি। নুসরাত উঠে বসে দেখল বাথরুমের দরজাও খোলা। —“আরিফ?” কোনো উত্তর নেই। সে ঘর থেকে বের হলো। বারান্দায় এসে দেখল আরিফ দাঁড়িয়ে আছে। দোতলার শেষ ঘরের সামনে। হাতে সেই পুরোনো চাবি। নুসরাত দৌড়ে গেল। “তুমি এখানে কী করছ?” আরিফ যেন শুনতেই পেল না। সে তালায় চাবি ঢুকিয়েছে। নুসরাত তার হাত ধরে ফেলল। —“খুলবে না।” আরিফ ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল। চোখ দুটো অদ্ভুত ফাঁকা।
“ও আমাকে ডাকছে।”
নুসরাতের বুক কেঁপে উঠল।—“কে?” আরিফ বলল, —“লায়লা।” ঠিক তখনই ভেতর থেকে একটা শব্দখস...
যেন কেউ দরজার ঠিক ওপাশে দাঁড়িয়ে কাপড় ঘষছে। তারপর খুব আস্তে একটা মেয়েলি গলা—
“আরিফ...” নুসরাতের হাত বরফ হয়ে গেল। আরিফ চাবি ঘোরাতে যাচ্ছিল। নুসরাত সর্বশক্তি দিয়ে তার হাত টেনে ধরল।
—“না!” হঠাৎ দরজার ওপাশ থেকে জোরে ধাক্কা এল।
ধাম!
দুজনেই পিছিয়ে গেল।
আবার—
ধাম!
দরজাটা কেঁপে উঠল। আর তারপর সব চুপ। আরিফ কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,—“আমি কিছু শুনিনি।”
নুসরাত তাকিয়ে রইল।—“তুমি কী বলছ?”—“কিছু না।”—“তুমি নিজেই তো বললে লায়লা ডাকছে।”আরিফ এবার মাথা চেপে ধরল।
—“আমি... জানি না।” পরদিন সকালে আরিফ রহমান সাহেবকে নিয়ে বাড়ির পুরোনো কাগজপত্র দেখতে বসে। একটা পুরোনো আলমারি। ভেতরে জমে থাকা দলিল, চিঠি, ছবি। অনেক খোঁজার পর একটা সাদা-কালো ছবি পাওয়া গেল।
ছবিতে একটা পরিবার। একজন বয়স্ক পুরুষ। তার পাশে একজন মহিলা।
আর সামনে দাঁড়িয়ে একটা তরুণী। ছবির পেছনে লেখা—“লায়লা — ১৯৯৮” আরিফ ছবিটা হাতে নিয়ে বলল,—“এই মেয়েটাই?”
রহমান সাহেব মাথা নাড়লেন। —“জি।” —“তার কী হয়েছিল?”রহমান সাহেব এবার বললেন,—“লায়লার বিয়ে ঠিক হয়েছিল।”
—“তারপর?”—“বিয়ের আগের রাতে সে নিখোঁজ হয়।”আরিফ অবাক হয়ে বলল,—“কিন্তু আপনি তো বলেছিলেন ছাদ থেকে পড়ে মারা গেছে। ” রহমান সাহেব নিচের দিকে তাকিয়ে বললেন, —“পরদিন সকালে ছাদে তার ওড়না পাওয়া গেছিল।”—“লাশ?”লোকটা চুপ। আরিফ বুঝতে পারল। —“লাশ পাওয়া যায়নি?” রহমান সাহেব ধীরে মাথা নাড়লেন।—“না।” নুসরাত পাশে বসে ছিল। তার গলা শুকিয়ে গেছে।—“তাহলে সবাই ধরে নিল সে মারা গেছে?”—“জি।”—“কিন্তু লাশ ছাড়া? ”রহমান সাহেব বললেন,—“সেই সময় এই বাড়ির মালিক চেয়েছিলেন ব্যাপারটা আর বাইরে না যাক।”আরিফ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ তার চোখ ছবির পেছনের অংশে গেল। লায়লার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বয়স্ক লোকটার মুখের ওপর কালো দাগ। যেন কেউ ইচ্ছা করে কালি দিয়ে মুখটা মুছে দিয়েছে। আরিফ বলল,—“এই লোকটা কে?”রহমান সাহেব উত্তর দিলেন না।—“চাচা? ”লোকটা উঠে দাঁড়াল।—“আমার মনে হয় আপনারা এই বাড়ি ছেড়ে দিলে ভালো করবেন।”আরিফ এবার বিরক্ত হয়ে বলল,—“আমি এসব ভূতের গল্পে বিশ্বাস করি না।”
রহমান সাহেব দরজার কাছে গিয়ে থামলেন। তারপর বললেন,—“আমি ভূতের গল্পও বলছি না।” একটু থেমে বললো“আমি শুধু বলছি—লায়লা মারা গেছে কি না, সেটা আমরা কেউ কোনোদিন নিশ্চিতভাবে জানতে পারিনি।”
সেদিন সন্ধ্যায় আদিবা হঠাৎ মাকে বলল,—“মা, আজকে লায়লা আন্টি কাঁদতেছে।”নুসরাত বলল,—“কেন?”আদিবা উত্তর দিল,
“ও বলছে ওর ঘরটা খুলে দিতে।”—“কেন?”আদিবা এবার চুপ করে গেল। তারপর খুব আস্তে বলল,—“ওর ঘরে একটা জিনিস আছে। ”নুসরাতের গলা শুকিয়ে গেল।—“কী জিনিস?”আদিবা মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,—“ওর আব্বুর কাগজ।”সেই রাতে নুসরাত প্রথমবারের মতো স্বামীর কাছে বলল,—“আরিফ, আমরা এই বাড়ি ছেড়ে দিই।”আরিফ কোনো উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ পর বলল,“আগামীকাল ঘরটা খুলব।”নুসরাত চমকে উঠল।—“তুমি পাগল হয়েছ?”—“না।”—“তাহলে?”আরিফ নিচু গলায় বলল,
“কারণ আজ বিকেলে আমি একটা জিনিস পেয়েছি।”
সে পকেট থেকে একটা পুরোনো কাগজ বের করল। কাগজটা বহু পুরোনো। তার ওপর কাঁপা হাতে লেখা মাত্র তিনটা লাইন“আমি যদি কখনো নিখোঁজ হই, আমার ঘরটা খুলবে। সত্যিটা সেখানে আছে।” নিচে একটা নাম। লায়লা। নুসরাত কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ দোতলার শেষ ঘরের দিক থেকে একটা শব্দ এলো। টক...একটা টোকা।
আবার—টক... টক...
আর এবার দরজার ওপাশ থেকে পরিষ্কার একটা মেয়েলি গলা শোনা গেল—
“এবার খুলবে?” আরিফ, নুসরাত—দুজনেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু তাদের কেউ খেয়াল করেনি—
সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আদিবা কখন থেকে তাদের দেখছে। মেয়েটার হাতে একটা পুরোনো ছবি। আর ছবিটার পেছনে লেখা—
“আমাকে আমার আব্বু মারে নাই।” তার নিচে আরও একটা লাইন।“যে মেরেছে, সে এখনও এই বাড়িতেই আছে।”
আপনার লিখা অনেক ভালো হচ্ছে, চালিয়ে যান 👍❤️
আগ্রহ পেলে লিখতে ইচ্ছে হয়।।
আমার পোস্টে সুন্দর কমেন্ট করায়, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।।
আপনার চারপাশের গল্প, আপনার মনের কথা লিখার জন্য এই " আশেপাশে " পাশে আছে আপনাদের।।