বাড়ি
পর্ব-১
“নতুন বাড়ির প্রথম রাত”
-----------------------------------------

বাড়িটা প্রথম দেখার পর নুসরাতের ভালো লেগেছিল। আরিফেরও। তবে দুজনের ভালো লাগার কারণ এক ছিল না। নুসরাতের ভালো লেগেছিল বাড়িটার পুরোনো সৌন্দর্য দেখে। আরিফের ভালো লেগেছিল ভাড়া তুলনামূলক কম দেখে। পুরান ঢাকার বলধা গার্ডেনের কাছাকাছি এমন একটা বাড়ি এত কম ভাড়ায় পাওয়া যায় না। দুইতলা বাড়ি। সামনে ছোট একটা উঠান। পুরোনো লোহার গেট। গেটের ওপর জং ধরেছে, কিন্তু ভেতরের বাড়িটা বেশ যত্ন করেই রাখা। দোতলার সামনে লম্বা বারান্দা। বারান্দার রেলিংয়ে পুরোনো দিনের কারুকাজ। বাড়ির মালিক বিদেশে থাকেন। দেখাশোনা করেন রহমান সাহেব নামের একজন বয়স্ক লোক। আরিফ বাড়ি দেখতে এসে প্রথমেই বলেছিল,
—“বাড়িটা এতদিন খালি ছিল কেন?”
রহমান সাহেব একটু থেমে বলেছিলেন,
—“আগের ভাড়াটিয়া উঠায়া নিছে।”
—“কেন?”
লোকটা হেসে বলেছিল,
—“নিজেদের কারণেই।”
আরিফ আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
নুসরাত অবশ্য জিজ্ঞেস করেছিল।
—“কী কারণ?”
রহমান সাহেব এবার সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেছিলেন,
—“আপা, পুরান বাড়ি তো। সবার ভালো লাগে না।”
ব্যস।
এই কথাটাই তখন শেষ কথা ছিল। তিন দিন পর তারা বাড়িতে উঠে গেল। আরিফ, নুসরাত, তাদের সাত বছরের মেয়ে আদিবা আর কাজের মেয়ে বর্ষা। বাড়িতে ওঠার পর প্রথম দুদিন কোনো সমস্যা হয়নি। আদিবা তো মহাখুশি। নতুন বাড়ির দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে নিচের গলি দেখত। কখনো রিকশা যাচ্ছে। কখনো পাশের বাড়ির ছাদে কাপড় শুকাচ্ছে। কখনো দূর থেকে আজানের শব্দ আসছে। বিকেল হলেই আদিবা ছবি আঁকতে বসে যেত। তবে তৃতীয় দিন বিকেলে একটা ব্যাপার নুসরাতের চোখে পড়ল। আদিবা একটা বাড়ির ছবি আঁকছে। ছবিতে তাদের নতুন বাড়ি। কিন্তু বাড়ির দোতলার শেষ জানালায় একটা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
নুসরাত বলল,
—“এটা কে?”
আদিবা মাথা না তুলেই বলল,
—“ওই আন্টি।”
—“কোন আন্টি?”
আদিবা এবার তাকাল।
—“ওই যে থাকে।”
নুসরাত হেসে বলল,
—“কে থাকে?”
আদিবা কিছু বলল না।
শুধু ছবিটার জানালার দিকে আঙুল দেখাল।
—“উনি।”
নুসরাত তখনও ব্যাপারটা গুরুত্ব দেয়নি। শিশুর কল্পনা। এটাই ভেবেছিল। সেদিন রাত সাড়ে বারোটার দিকে প্রথম শব্দটা হলো। ঠক।
নুসরাত ঘুম থেকে উঠে বসে পড়ল। আরিফ তখনও ঘুমাচ্ছে। আবার শব্দ হলো।
ঠক... ঠক...
মনে হলো কেউ কাঠের দরজায় খুব আস্তে আঙুল দিয়ে টোকা দিচ্ছে।
নুসরাত আরিফকে ডাকল।
—“শুনছ?”
আরিফ ঘুম জড়ানো গলায় বলল,
—“হুম?”
—“দরজায় কে যেন শব্দ করছে।”
আরিফ কিছুক্ষণ চুপ করে শুনল।
তারপর বলল,
—“বিড়াল হবে।”
—“বিড়াল দরজায় টোকা দেয়?”
—“ঘুমাও তো।”
নুসরাত বিরক্ত হয়ে আবার শুয়ে পড়ল।
কিন্তু তখনও শব্দটা হচ্ছিল।
ঠক...
একটু বিরতি।
ঠক...
তারপর একদম বন্ধ।
পরদিন সকালে বর্ষা রান্নাঘরে কাজ করছিল।
নুসরাত চা বানাতে বানাতে বলল,
—“বর্ষা, কাল রাতে দরজায় কে যেন শব্দ করছিল। তুই উঠেছিলি?”
বর্ষা থেমে গেল।
—“কোন দরজায়?”
—“আমাদের ঘরের।”
বর্ষা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“আমি কিছু শুনি নাই আপা।”
নুসরাত হাসল।
—“ঠিক আছে।”
বর্ষা আবার কাজে মন দিল।
কিন্তু দুই মিনিট পর হঠাৎ বলল,
—“আপা...”
—“কী?”
—“এই বাড়িতে একটা কথা আছে।”
নুসরাত তাকাল।
—“কী কথা?”
বর্ষা গলা নিচু করে বলল,
—“রাতে কেউ যদি দরজায় টোকা দেয়... দরজা খুলবেন না।”
নুসরাত হেসে ফেলল।
—“কেন?”
বর্ষা এবার একদম সিরিয়াস।
—“জানি না আপা। আগের বাসার আপা কইছিল।”
—“তোর আগের বাসার আপা?”
—“না... এই বাড়ির আগের আপা।”
নুসরাতের হাসিটা এবার একটু থেমে গেল।
—“মানে?”
বর্ষা কিছু বলল না।
শুধু বলল,
—“আমি কাজ করি আপা। এসব কথা বলতে চাই না।”
সেদিন বিকেলে আরিফকে সব বলল নুসরাত।
আরিফ শুনে হেসে বলল,
—“তোমরা দুজন মিলে বাড়িটাকে ভূতের বাড়ি বানিয়ে ফেলেছ।”
নুসরাত বলল,
—“আমি কিন্তু কিছু বলিনি।”
—“বর্ষা বলেছে।”
—“হ্যাঁ।”
আরিফ একটু চুপ করে থেকে বলল,
—“শোনো, পুরোনো বাড়ি। কাঠের দরজা। বাতাসে শব্দ হয়। ইঁদুর থাকতে পারে। এসব নিয়ে মাথা ঘামিও না।”
নুসরাত বলল,
—“ঠিক আছে।”
আরিফ উঠে আদিবার ঘরে গেল।
আদিবা তখন ছবি আঁকছিল।
আরিফ ছবিটা দেখে থেমে গেল।
—“এইটা কে?”
আদিবা বলল,
—“আন্টি।”
—“কোন আন্টি?”
আদিবা এবার বাবার দিকে তাকাল।
তারপর খুব স্বাভাবিকভাবে বলল,
—“যে রাতে আসে।”
আরিফের মুখের হাসি একটু কমে গেল।
—“তুমি তাকে দেখেছ?”
আদিবা মাথা নাড়ল।
—“হুম।”
—“কোথায়?”
—“ওই ঘরে।”
আদিবা দোতলার একদম শেষ ঘরটার দিকে আঙুল দেখাল। আরিফ তাকিয়ে রইল। ঘরটা তালাবদ্ধ। ওই ঘরের চাবি তার কাছে নেই।
সেদিন রাতটা আর আগের মতো ছিল না। নুসরাত ঘুমিয়ে পড়েছিল। আরিফও। কিন্তু রাত প্রায় দুইটার দিকে আদিবা ঘুম থেকে উঠে বসে পড়ল। তারপর বিছানা থেকে নেমে দরজা খুলল। ধীরে ধীরে বারান্দায় এল। বারান্দার একদম শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা দরজাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজায় তালা। আদিবা তালাটার দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল, —“আমি তো আসছি।”
ভেতর থেকে কোনো শব্দ হলো না। কিছুক্ষণ পর আদিবা ফিরে গেল। কিন্তু যাওয়ার আগে দরজার ওপাশ থেকে খুব আস্তে একটা মেয়েলি গলা শোনা গেল— “তোমার মা-বাবাকে বলো... আমার ঘরটা খুলতে।” পরদিন সকালে নুসরাত ঘুম থেকে উঠে দেখল আদিবা তার পাশে নেই। সে উঠে ঘর থেকে বের হলো। বারান্দায় এসে দেখে আদিবা দোতলার শেষ ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে। নুসরাত দৌড়ে গেল। —“আদিবা!” মেয়েটা ঘুরে তাকাল। তার হাতে একটা পুরোনো চাবি।
নুসরাতের বুকটা ধক করে উঠল।
—“চাবিটা কোথায় পেলে?”
আদিবা খুব স্বাভাবিকভাবে বলল,
—“আন্টি দিয়েছে।”
নুসরাত কিছু বলার আগেই নিচতলা থেকে বর্ষার চিৎকার শোনা গেল—
“আপা! আপা! দৌড়াইয়া আসেন!”
নুসরাত সিঁড়ির দিকে ছুটল।
বর্ষা নিচে দাঁড়িয়ে কাঁপছে।
তার চোখ দোতলার দিকে।
—“আপা...”
—“কী হয়েছে?”
বর্ষা কাঁপা গলায় বলল,
—“আমি এইমাত্র রান্নাঘরের জানালায় একজন মহিলারে দেখছি।”
নুসরাত বলল,
—“কেমন মহিলা?”
বর্ষা উত্তর দিল না।
শুধু দোতলার শেষ ঘরটার দিকে তাকিয়ে বলল—
“সাদা কাপড় পরা... চুলটা পুরো মুখের সামনে।”
তারপর খুব আস্তে বলল,
“কিন্তু আপা... ওই জানালাটা তো বাইরে থেকে ইট দিয়া বন্ধ।”
চলবে...
😵💫🫣😁
Part 2 bhai??
আজ রাতে পেয়ে যাবেন.. 🤔