প্রথম পাতা › গল্প ও উপন্যাস › একটি তিন মাসের ভালোবাসা

গল্প ও উপন্যাস

একটি তিন মাসের ভালোবাসা

বিজ্ঞাপন
একটি তিন মাসের ভালোবাসা

প্রথম অধ্যায় — আটজন মানুষের গল্প


বিজ্ঞাপন

শহরের এক প্রান্তে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান ছিল। সন্ধ্যার পর দোকানটার সামনে প্রায়ই দেখা যেত আটজন তরুণ-তরুণীকে।


সেজান, সিফাত, রেজোয়ান, মুকুল, রোমেল—এই পাঁচ বন্ধু।


আর তাদের সঙ্গে থাকত লাইজু, সান্তা ও সম্পা।


তাদের বন্ধুত্বটা ছিল অদ্ভুত সুন্দর।


কেউ কারও আত্মীয় ছিল না, কিন্তু বিপদের সময় একজনের জন্য অন্যজন নিজের মানুষকেও ভুলে যেতে পারত।


সিফাত ছিল সেজানের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। সেজানের মুখ দেখেই সে বুঝে ফেলত তার মনের অবস্থা।


রেজোয়ান ছিল দলের হাসির মানুষ। সবাই মন খারাপ করে থাকলে সে কোনো না কোনোভাবে হাসিয়ে দিত।


মুকুল ছিল সবচেয়ে শান্ত। সবাই যখন উত্তেজিত হয়ে যেত, তখন মুকুলই ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিত।


রোমেল ছিল একটু দুষ্টু। কিন্তু বন্ধুর বিপদে সবার আগে ছুটে যেত সে।


সান্তা ছিল লাইজুর সবচেয়ে কাছের বান্ধবী। লাইজুর জীবনের প্রায় সব গোপন কথাই সান্তা জানত।


আর সম্পা?


সে ছিল দলের সবচেয়ে স্পষ্টভাষী মানুষ।


যা সত্যি মনে করত, সেটা মুখের ওপর বলে দিত।


এই আটজনের জীবনেই তখনও তারা জানত না—আগামী তিন মাস তাদের সম্পর্কগুলোকে পুরোপুরি বদলে দিতে চলেছে।


---


প্রথম মাস — ভালোবাসার শুরু


একদিন বিকেলে লাইজু একা বসে ছিল।


সেজান দূর থেকে তাকিয়ে দেখছিল।


সিফাত সেটা লক্ষ্য করে মুচকি হেসে বলল,


— “কী দেখছিস?”


সেজান চোখ সরিয়ে নিল।


— “কিছু না।”


রোমেল সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,


— “কিছু না মানে লাইজু!”


সবাই হেসে উঠল।


সেজান বিরক্ত হয়ে বলল,


— “তোরা সবকিছু নিয়ে মজা করিস কেন?”


সম্পা তখন বলল,


— “মজা করছি না। তোর চোখ কিন্তু অন্য কথা বলছে।”


লাইজু কথাটা শুনে লজ্জায় মাথা নিচু করল।


সেদিন রাতেই সেজানের ফোনে লাইজুর মেসেজ এল।


“আজ সবাই তোমাকে নিয়ে এত মজা করছিল কেন?”


সেজান লিখল,


“তুমি কি জানতে চাও?”


লাইজু উত্তর দিল,


“হ্যাঁ।”


সেজান অনেকক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকল।


শেষে লিখল—


“কারণ হয়তো আমি তোমাকে একটু বেশি পছন্দ করতে শুরু করেছি।”


মেসেজটা পাঠানোর পর সেজানের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।


অনেকক্ষণ কোনো উত্তর এল না।


তারপর ফোনে একটা মেসেজ ভেসে উঠল—


“হয়তো আমিও।”


সেদিন থেকেই তাদের ভালোবাসার শুরু।


---


কিন্তু সবার গল্প কি এত সহজ?


রেজোয়ান বাইরে থেকে সবসময় হাসিখুশি থাকলেও নিজের ভেতরে একটা পুরোনো কষ্ট লুকিয়ে রেখেছিল।


একদিন রাতে মুকুল তাকে একা বসে থাকতে দেখে বলল,


— “কী হয়েছে?”


রেজোয়ান হেসে বলল,


— “কিছু হয়নি।”


মুকুল বলল,


— “সবাইকে হাসাতে হাসাতে নিজের কান্নাটা লুকাস না।”


রেজোয়ান চুপ হয়ে গেল।


তারপর ধীরে বলল,


— “একসময় আমিও কাউকে খুব ভালোবাসতাম। সে চলে গেছে। তারপর থেকে ঠিক করেছি, নিজের কষ্ট কাউকে দেখাব না।”


মুকুল তার কাঁধে হাত রেখে বলল,


— “সব ভালোবাসার শেষ বিচ্ছেদ নয়, রেজোয়ান। কিছু ভালোবাসা মানুষকে শক্ত হতে শেখায়।”


রেজোয়ান মুচকি হাসল।


সেদিন থেকে মুকুল আর রেজোয়ানের বন্ধুত্ব আরও গভীর হয়ে গেল।


---


দ্বিতীয় মাস — সম্পর্কের গভীরতা


সেজান আর লাইজুর সম্পর্ক তখন আরও গভীর হয়েছে।


তারা শুধু ভালোবাসার কথা বলত না।


একজন আরেকজনের স্বপ্ন, ভয়, পরিবার, ভবিষ্যৎ—সবকিছু জানতে শুরু করেছিল।


এক রাতে লাইজু বলল,


— “সেজান, তুমি কি কখনো আমাকে ছেড়ে যাবে?”


সেজান বলল,


— “তুমি কেন এমন কথা বলছ?”


— “জানি না। মাঝে মাঝে ভয় হয়।”


সেজান বলল,


— “যতদিন তুমি আমার ওপর বিশ্বাস রাখবে, আমি তোমার পাশে থাকব।”


কথাগুলো লাইজুর চোখে পানি এনে দিল।


কিন্তু ঠিক তখনই তাদের সম্পর্কে প্রথম সমস্যা দেখা দিল।


সান্তা লক্ষ্য করছিল, লাইজু দিন দিন সেজানকে নিয়ে বেশি চিন্তিত হয়ে পড়ছে।


সে লাইজুকে বলল,


— “ভালোবাসিস, ঠিক আছে। কিন্তু নিজের জীবনটাকেও ভুলে যাস না।”


লাইজু বলল,


— “আমি ওকে হারাতে ভয় পাই।”


সান্তা উত্তর দিল,


— “যাকে সত্যি ভালোবাসিস, তাকে ধরে রাখার জন্য সন্দেহ নয়, বিশ্বাস দরকার।”


সম্পা পাশ থেকে বলল,


— “আর যদি কোনোদিন সমস্যা হয়, পালিয়ে যাস না। সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলবি।”


লাইজু কথাগুলো মনে রাখল।


---


তৃতীয় মাস — ঝড়


তৃতীয় মাসের মাঝামাঝি হঠাৎ সেজান ও লাইজুর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি শুরু হলো।


সান্তার সঙ্গে সেজান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলছিল।


লাইজু সেটা দেখে ফেলল।


তার মনে সন্দেহ জন্ম নিল।


— “সান্তার সঙ্গে এত কথা কী নিয়ে?”


সেজান বলল,


— “তোমাকে নিয়ে।”


— “আমাকে নিয়ে সান্তার সঙ্গে কথা বলতে হবে কেন?”


সেজান অবাক হয়ে বলল,


— “তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো না?”


লাইজু চুপ করে গেল।


সেদিন থেকে তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলো।


সেজান কষ্ট পেল।


লাইজু কাঁদল।


আর বন্ধুরা বুঝতে পারল, তাদের সবাইকে এখন কিছু করতে হবে।


সিফাত সেজানকে বলল,


— “তুই লাইজুর সঙ্গে কথা বল।”


সেজান বলল,


— “ও আমার কথা শুনতে চায় না।”


রেজোয়ান বলল,


— “তাহলে ওর কাছে গিয়ে দাঁড়াবি। কিছু সম্পর্ক ফোনে ঠিক হয় না।”


মুকুল বলল,


— “আগে সত্যিটা পরিষ্কার করতে হবে।”


অন্যদিকে সান্তা লাইজুকে সব খুলে বলল।


— “সেজান আমার সঙ্গে তোমাদের সম্পর্ক নিয়েই কথা বলছিল।”


লাইজু অবাক হয়ে গেল।


সম্পা এবার কঠিন গলায় বলল,


— “তুই যদি ওকে ভালোবাসিস, তাহলে নিজের ভয়কে ভালোবাসার ওপর জিততে দিস না।”


লাইজুর চোখ দিয়ে পানি পড়ে গেল।


---


রোমেলের সিদ্ধান্ত


সবাই যখন সেজান-লাইজুর সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা করছে, তখন রোমেল হঠাৎ জানতে পারল, সেজানের সঙ্গে লাইজুর দেখা করার জায়গায় কিছু সমস্যা হয়েছে।


সে নিজের কাজ ফেলে সেখানে ছুটে গেল।


রেজোয়ান বলল,


— “তুই নিজের কাজ রেখে কেন এলি?”


রোমেল হেসে বলল,


— “বন্ধুর জীবন ঠিক করার সময় নিজের কাজের কথা মনে থাকে নাকি?”


রেজোয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,


— “তুই সবসময় মজা করিস, কিন্তু তোর মতো বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।”


রোমেল বলল,


— “বন্ধুত্বে ভাগ্য লাগে না। শুধু একজন আরেকজনকে ছেড়ে না গেলেই হয়।”


---


সত্য প্রকাশ


অবশেষে সবাই এক জায়গায় জড়ো হলো।


সেজান বলল,


— “আমি সান্তার সঙ্গে কথা বলেছিলাম তোমাকে কীভাবে বোঝাব, কীভাবে তোমাকে একটা সারপ্রাইজ দেব—সেটা নিয়ে।”


লাইজু স্তব্ধ হয়ে গেল।


সান্তা বলল,


— “আমি তোকে আগেই বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেজান আমাকে নিষেধ করেছিল।”


সুম্পা বলল,


— “এখন বুঝলি, সন্দেহ কতটা কষ্ট দিতে পারে?”


লাইজুর চোখে পানি।


সে সেজানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।


— “আমাকে ক্ষমা করবে?”


সেজান কিছু বলল না।


লাইজু কাঁদতে কাঁদতে বলল,


— “আমি তোমাকে হারানোর ভয় পেয়েছিলাম। সেই ভয়েই তোমাকেই কষ্ট দিয়েছি।”


সেজানের চোখও ভিজে উঠল।


সে বলল,


— “আমি শুধু চাই তুমি আমাকে বিশ্বাস করো।”


লাইজু মাথা নিচু করে বলল,


— “আমি বিশ্বাস করি।”


সেজান তার হাত ধরে বলল,


— “তাহলে আর কাঁদবে না।”


---


তিন মাসের শেষ দিন


তিন মাস পূর্ণ হওয়ার দিনে আটজন আবার সেই চায়ের দোকানের সামনে বসেছিল।


রেজোয়ান হাসছিল।


রোমেল আগের মতোই মজা করছিল।


সিফাত সেজানকে খোঁচা দিচ্ছিল।


মুকুল চুপচাপ সবাইকে দেখছিল।


সান্তা ও সম্পা পাশাপাশি বসে গল্প করছিল।


আর সেজান ও লাইজু একে অপরের দিকে তাকিয়ে ছিল।


সিফাত বলল,


— “তিন মাস আগে আমরা আটজন শুধু বন্ধু ছিলাম। এখন মনে হচ্ছে আমরা একটা পরিবার।”


মুকুল বলল,


— “পরিবার রক্তের সম্পর্কেই হয় না।”


রেজোয়ান যোগ করল,


— “কখনো কখনো মানুষকে নিজের করে নিতে তিন মাসই যথেষ্ট।”


রোমেল হেসে বলল,


— “তাহলে ঘোষণা করা হোক—আমরা আটজন আজীবনের বন্ধু!”


সান্তা বলল,


— “বন্ধুত্বের শর্ত কী?”


সুম্পা বলল,


— “যত ঝড় আসুক, কেউ কাউকে ছেড়ে যাবে না।”


সবাই একসঙ্গে বলল—


“কেউ কাউকে ছেড়ে যাব না।”


সেজান লাইজুর দিকে তাকিয়ে বলল,


— “আমাদের তিন মাস শেষ।”


লাইজু মৃদু হেসে বলল,


— “হ্যাঁ।”


— “কিন্তু গল্প?”


লাইজু তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,


— “গল্প তো এখনো শুরু।”


সন্ধ্যার আকাশে তখন শেষ আলোটুকু মিলিয়ে যাচ্ছিল।


আটজন মানুষ পাশাপাশি বসে ছিল।


তাদের জীবনের পথ আলাদা ছিল।


তাদের স্বপ্ন আলাদা ছিল।


তাদের কষ্টও আলাদা ছিল।


কিন্তু একটি জিনিস তাদের এক করে দিয়েছিল—


ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব।


আর সেই তিন মাস তাদের শিখিয়ে দিয়েছিল—


কিছু সম্পর্ক সময় দিয়ে তৈরি হয় না; বিশ্বাস, ত্যাগ আর একে অপরের পাশে থাকার মাধ্যমে তৈরি হয়।


তিন মাসের সেই ভালোবাসা তাই শুধু সেজান আর লাইজুর গল্প ছিল না।


এটা ছিল আটজন মানুষের গল্প—যেখানে প্রত্যেকের হৃদয়ে ছিল আলাদা একটি গল্প, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবাই ছিল একে অপরের গল্পের অংশ।

০ মন্তব্য · ৯ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!