প্রথম পাতাজীবনধারাএকটি ছেলে

জীবনধারা

একটি ছেলে

একটি ছেলে


ছেলেটার নাম কেউ ঠিকমতো জানত না।

বিজ্ঞাপন


পাড়ার সবাই তাকে শুধু “ছেলেটা” বলেই ডাকত। বয়স হবে চৌদ্দ কি পনেরো। পরনে পুরোনো একটা শার্ট, পায়ে ছেঁড়া স্যান্ডেল আর কাঁধে একটা মলিন ব্যাগ। প্রতিদিন ভোরে তাকে দেখা যেত বাজারের রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে।


কেউ সবজি কিনলে ব্যাগ এগিয়ে দিত, কারও বাজারের ভারী ব্যাগ থাকলে বাড়ি পৌঁছে দিত। বিনিময়ে কেউ পাঁচ টাকা দিত, কেউ দশ টাকা। কেউ আবার কিছু না দিয়েই চলে যেত।


তবুও ছেলেটা কাউকে কিছু বলত না।


একদিন সকালে এক ভদ্রলোক বাজার থেকে বের হচ্ছিলেন। তাঁর হাতে বেশ কয়েকটি ব্যাগ। ছেলেটা দৌড়ে গিয়ে বলল,


— “চাচা, ব্যাগগুলো আমি নিয়ে যাই?”


ভদ্রলোক বললেন,


— “কত নেবে?”


ছেলেটা একটু হেসে বলল,


— “আপনার যা ইচ্ছা।”


ব্যাগগুলো নিয়ে ছেলেটা হাঁটতে শুরু করল।


বাড়ির সামনে গিয়ে ভদ্রলোক তাকে বিশ টাকা দিলেন। ছেলেটা টাকা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।


— “আর কিছু লাগবে?”


ছেলেটা মাথা নাড়ল।


তারপর ধীরে ধীরে বলল,


— “চাচা, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”


— “করো।”


— “আপনার কাছে পুরোনো বই আছে?”


ভদ্রলোক অবাক হয়ে বললেন,


— “বই? কেন?”


ছেলেটা মাথা নিচু করে বলল,


— “আমি পড়তে চাই।”


ভদ্রলোক কিছুক্ষণ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।


তারপর জিজ্ঞেস করলেন,


— “তুমি স্কুলে যাও না?”


ছেলেটা মৃদু হেসে বলল,


— “যেতাম। বাবা মারা যাওয়ার পর আর যাওয়া হয়নি। মা মানুষের বাসায় কাজ করে। ছোট বোনটা অসুস্থ। তাই কাজ করি।”


ভদ্রলোকের বুকটা কেমন যেন ভারী হয়ে গেল।


তিনি ছেলেটার হাতে বিশ টাকার বদলে একশো টাকা দিতে চাইলেন।


ছেলেটা টাকা নিতে চাইল না।


— “না চাচা, এত টাকা নিতে পারব না।”


— “কেন?”


— “আমি কাজ করেছি বিশ টাকার। একশো টাকা নিলে সেটা তো ভিক্ষা হয়ে যাবে।”


ভদ্রলোক কিছু বলতে পারলেন না।


সেদিন রাতে তিনি নিজের ছেলের পুরোনো বইগুলো বের করলেন। পরদিন সকালে ছেলেটাকে ডেকে বইগুলো দিয়ে বললেন,


— “এগুলো তোমার। পড়বে?”


ছেলেটার চোখ চকচক করে উঠল।


সে বইগুলো বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে বলল,


— “চাচা, আমি কি আবার স্কুলে যেতে পারব?”


ভদ্রলোক বললেন,


— “তুমি চাইলে অবশ্যই পারবে।”


ছেলেটা সেদিন অনেকক্ষণ কাঁদল।


তবে সেটা দুঃখের কান্না ছিল না।


সেটা ছিল বহুদিন পর স্বপ্ন দেখার কান্না।


কয়েক বছর পর সেই বাজারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ভদ্রলোক দেখলেন, একটি ছেলে কয়েকজন ছোট শিশুকে পড়াচ্ছে। পরনে পরিষ্কার জামা, হাতে বই।


ভদ্রলোক কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই ছেলেটা উঠে সালাম করল।


— “চাচা, আমাকে চিনতে পেরেছেন?”


ভদ্রলোক হেসে বললেন,


— “চিনব না? তুমি তো সেই ‘ছেলেটা’।”


ছেলেটা মৃদু হেসে বলল,


— “চাচা, তখন আমি শুধু একটি ছেলে ছিলাম। আপনি আমাকে মানুষ হওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন।”


ভদ্রলোকের চোখ ভিজে উঠল।


তিনি বুঝতে পারলেন, একজন মানুষের জীবন বদলাতে সবসময় অনেক টাকা লাগে না।


কখনো কখনো লাগে শুধু একটু বিশ্বাস, একটু সহানুভূতি আর একটি সুযোগ।


আর সেই সুযোগটাই হয়তো কোনো এক অচেনা “ছেলেকে” একদিন সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করে।

০ মন্তব্য · ২২ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!