দুঃসাহসী, লড়াকু আর খানিকটা বদমেজাজি স্বভাবের জলাভূমির পাখি কালিম। ফকিরহাট-বাগেরহাট তথা বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলে এই পাখি ‘বুরি’ নামে পরিচিত। ইংরেজি নাম Purple Swamphen, বৈজ্ঞানিক নাম Porphyrio porphyrio। প্রায় ৪৫ সেন্টিমিটার লম্বা ও ৬৫০ গ্রাম ওজনের এই নাদুসনুদুস পাখিটির শরীর চকচকে নীলচে-বেগুনি। কপাল ও মাথাজুড়ে আলতা-লাল রঙের শক্ত বর্মের মতো ঢাল, লালচে পা ও লম্বা আঙুল এবং লেজের নিচে কার্পাস তুলোর মতো সাদা পালক—সব মিলিয়ে কালিমের চেহারা সত্যিই অনন্য।
একসময় বৃহত্তর খুলনার ফকিরহাট, চিতলমারী, মোল্লাহাট, তেরখাদা ও ডুমুরিয়ার বিভিন্ন হাটবাজারে প্রকাশ্যে কালিম বিক্রি হতো। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বন্দুক শিকারিরা গুলি করে এই পাখি শিকার করতেন। বাজারে বিক্রির সময় পাখিটির নাকের ভেতর দিয়ে তারই একটি ডানার পালক ঢুকিয়ে নাকের এপার-ওপার বের করে ঠোঁটের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হতো। এরপর ক্রেতারা মুরগির মতো পা ধরে উল্টো করে ঝুলিয়ে পাখিটি বাড়ি নিয়ে যেতেন। ২০১৭ সালেও কোথাও কোথাও গোপনে এর বিক্রির খবর পাওয়া গেছে। দেশের হাওরাঞ্চলেও ধরা, মারা ও বেচাকেনার ঘটনা এখনও ঘটে বলে জানা যায়।
মাংসের চাহিদাই কালিমের সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম বড় কারণ। অথচ বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইনে পাখি ধরা, মারা, বিক্রি কিংবা পোষা দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই কালিমকে রক্ষা করা শুধু আইন মানার বিষয় নয়, বরং আমাদের জলাভূমির জীববৈচিত্র্য রক্ষার দায়িত্বও।
কালিমের স্বভাবেও রয়েছে বিস্ময়। প্রজনন মৌসুমে দুটি পুরুষ পাখি মোরগের মতো তুমুল লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে। তখন তাদের লাল কপালের বর্মে বর্মে সংঘর্ষের শব্দ যেন জলাভূমিতে যুদ্ধের দামামা বাজায়। শিকারির গুলিতে পা আহত হলেও কালিম কখনো কখনো সেই পা মুখে কামড়ে ধরে উড়ে পালানোর চেষ্টা করে—তার বেঁচে থাকার অদম্য আকাঙ্ক্ষার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত।
কালিমের খাবারের তালিকায় রয়েছে জলজ উদ্ভিদের কচি পাতা ও ডগা, পদ্মফুলের ভেতরের অংশ, ব্যাঙের বাচ্চা ও ছোট মাছ। গ্রীষ্ম ও শরতে কচুরিপানা, জলজ গুল্ম ও ঝোপঝাড়ের আড়ালে ডালপালা দিয়ে বাসা বানিয়ে সাধারণত তিন থেকে সাতটি ডিম পাড়ে। ১৮ থেকে ২৩ দিনে ছানা ফুটে বের হয়। শ্লেটি-কালো ছানাদের মাথা ও কপালেও থাকে লালচে ঢাল। মা-বাবার সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর সময় তারা কখনো পিঠে চড়ে, আবার কখনো মায়ের ডানা ও বুকের নিচে আশ্রয় নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।
পঞ্চাশ বছর আগেও বাংলাদেশের বিল-ঝিল ও হাওরজুড়ে সহজেই দেখা মিলত কালিমের। এখন জলাভূমি ধ্বংস, শিকার ও অবৈধ বেচাকেনার কারণে তারা অনেকটাই কোণঠাসা। তাই জলাভূমির বুক থেকে ভেসে আসা কালিমের ডাক যেন আজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতিকে বাঁচাতে হলে তার বাসিন্দাদেরও বাঁচাতে হবে।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!