রহিম ছিল গ্রামের এক দরিদ্র ছেলে। ছোটবেলা থেকেই তার একটাই স্বপ্ন—একদিন সে অনেক টাকা উপার্জন করবে। কিন্তু অভাবের কারণে স্কুলের পড়াশোনা বেশিদূর এগোয়নি।
বাবার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়ে। সে শহরে গিয়ে একটি চায়ের দোকানে কাজ নিল। সারাদিন পরিশ্রম করত, কিন্তু রাতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমানোর আগে মনে মনে বলত—
“আমার ভাগ্যটাই খারাপ। আমি কখনো বড় হতে পারব না।”
একদিন দোকানে এক বৃদ্ধ লোক এলেন। তিনি প্রতিদিন একই সময়ে চা খেতে আসতেন। একদিন রহিমকে জিজ্ঞেস করলেন,
—“তুমি কি পড়াশোনা করেছ?”
রহিম মাথা নিচু করে বলল,
—“না। গরিবের ছেলের আবার পড়াশোনা!”
বৃদ্ধ মুচকি হেসে পকেট থেকে এক মুঠো মাটি বের করে রহিমের হাতে দিলেন।
—“এটা কী?”
—“মাটি।”
—“ঠিক। এখন বলো, এই মাটি দিয়ে কী করা যায়?”
রহিম অবাক হয়ে বলল,
—“মাটি দিয়ে আবার কী হবে?”
বৃদ্ধ বললেন,
—“এই মাটিতে যদি তুমি একটি বীজ পুঁতে প্রতিদিন যত্ন নাও, একদিন সেখানে গাছ হবে। গাছ থেকে ফল হবে। কিন্তু যদি মাটিকে দোষ দিতে থাকো, তাহলে সেখানে কিছুই জন্মাবে না।”
কথাগুলো রহিমের মনে গভীরভাবে দাগ কাটল।
সেদিন রাতে সে প্রথমবার নিজের ভাগ্যকে দোষ না দিয়ে ভাবল—
“আমার পরিস্থিতি হয়তো আমার হাতে নেই, কিন্তু আমি কী করব—সেটা তো আমার হাতেই।”
পরদিন থেকে রহিম কাজের পাশাপাশি পড়াশোনা শুরু করল। দিনে কাজ, রাতে বই। প্রথম দিকে খুব কষ্ট হতো। অনেকেই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করত।
কেউ বলত,
—“এই বয়সে আবার পড়াশোনা!”
রহিম শুধু হাসত।
বছর কেটে গেল।
পরিশ্রম আর শেখার ইচ্ছায় রহিম ধীরে ধীরে নিজের একটি ছোট ব্যবসা দাঁড় করাল। পরে সেই ব্যবসা বড় হলো। একসময় সে গ্রামের দরিদ্র শিশুদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করল।
উদ্বোধনের দিন সেই বৃদ্ধ লোকটিও সেখানে এলেন।
রহিম তার পা ছুঁয়ে সালাম করে বলল,
—“আপনি সেদিন আমাকে এক মুঠো মাটি দিয়েছিলেন। আসলে আপনি আমাকে মাটি দেননি, নিজের জীবন বদলানোর শিক্ষা দিয়েছিলেন।”
বৃদ্ধ হেসে বললেন,
—“মাটি শুধু তখনই ফল দেয়, যখন কেউ তার যত্ন নেয়। জীবনও ঠিক তেমন।”
রহিম স্কুলের শিশুদের দিকে তাকিয়ে বলল—
“জীবন কখনো আমাদের হাতে সবকিছু দেয় না। কিন্তু যা আছে, তা দিয়ে কী তৈরি করব—সেই সিদ্ধান্তটা আমাদের।”
শিক্ষা
পরিস্থিতি আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না; আমাদের চেষ্টা, ধৈর্য ও সিদ্ধান্তই জীবনকে বদলে দিতে পারে।
আজ যে ছোট একটি পদক্ষেপ তুমি নেবে, সেটিই হয়তো আগামী দিনের বড় পরিবর্তনের শুরু।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!