প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসপ্রজেক্ট মিরর - দ্বিতীয় পর্ব

গল্প ও উপন্যাস

প্রজেক্ট মিরর - দ্বিতীয় পর্ব

প্রজেক্ট মিরর - দ্বিতীয় পর্ব

প্রজেক্ট মিরর

বাইরে তখন বৃষ্টি আরও জোরে নেমেছে।

নাভিদের ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে আরিয়ান দেখল, কালো রঙের দুটো গাড়ি রাস্তার পাশে এসে থেমেছে।

বিজ্ঞাপন

একজন লোক গাড়ি থেকে নেমে চারপাশে তাকাল।

তারপর আরেকজন।

নাভিদ পর্দা নামিয়ে দিল।

—“ওরা আমাদের খুঁজে পেয়েছে।”

আরিয়ান শান্ত গলায় বলল,

—“কতজন?”

—“জানি না।”

—“তাহলে জানার দরকারও নেই।”

নাভিদ অবাক হয়ে তাকাল।


—“কী করবে?”

আরিয়ান হালকা হাসল।

—“বের হব।”

—“সামনের দরজা দিয়ে?”

—“না। পেছনের দরজা দিয়ে।”

নাভিদ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল,

—“তোমার মাথায় সবসময় এত অদ্ভুত পরিকল্পনা আসে কীভাবে?”

আরিয়ান বলল,

—“ভয় পেলে মাথা কাজ করে না। তাই ভয় পাওয়ার সময় পাই না।”

দুজনেই নিচের পুরোনো গ্যারেজ দিয়ে বেরিয়ে গেল।


বাইরে তখন বৃষ্টির পানি রাস্তায় জমে ছোট ছোট নদীর মতো বয়ে যাচ্ছে।

তারা অন্ধকার গলির ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেল।

পেছন থেকে মানুষের দৌড়ানোর শব্দ শোনা গেল।

কেউ তাদের দেখে ফেলেছে।

আরিয়ান নাভিদের হাত ধরে বলল,

—“দৌড়াও!”

দুজন ছুটতে শুরু করল।

পুরোনো নিরাপদ ঘর

প্রায় এক ঘণ্টা পর তারা শহরের অন্য প্রান্তের একটি পুরোনো বাড়িতে এসে পৌঁছাল।


বাড়িটা বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত।

কিন্তু আরিয়ানের জানা ছিল—

এখানে একটা ছোট নিরাপদ ঘর আছে।

দরজা বন্ধ করে নাভিদ হাঁপাতে হাঁপাতে মেঝেতে বসে পড়ল।

—“আমি আর পারছি না।”

আরিয়ান হেসে বলল,

—“তুমি কম্পিউটারের সামনে বসে দশ ঘণ্টা থাকতে পারো। পাঁচ মিনিট দৌড়াতেই শেষ?”

—“কম্পিউটার আমাকে গুলি করে না।”

আরিয়ান এবার সত্যিই হেসে ফেলল।

কয়েক মুহূর্তের জন্য দুজনের মধ্যে অদ্ভুত একটা স্বাভাবিকতা ফিরে এল।


কিন্তু সেই হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।

আরিয়ান টেবিলে PROJECT MIRROR লেখা ফাইলটি রাখল।

—“এবার বলো, এটা কী?”

নাভিদ ল্যাপটপ খুলে বলল,

—“পুরো ফাইল আমি এখনো খুলতে পারিনি।”

—“কেন?”

—“কারণ এটা সাধারণ এনক্রিপশন নয়। তিন স্তরের নিরাপত্তা।”

আরিয়ান চুপ করে রইল।

নাভিদ বলল,

—“কিন্তু একটা জিনিস বুঝেছি।”

—“কী?”

—“এই প্রজেক্টের উদ্দেশ্য কাউকে হত্যা করা নয়।”

আরিয়ান তাকাল।

—“তাহলে?”

নাভিদ স্ক্রিন ঘুরিয়ে দিল।

সেখানে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নাম।

তাদের অবস্থান।

তাদের যোগাযোগের তথ্য।

তাদের দুর্বলতা।

আর প্রতিটি নামের পাশে একটি কোড।

নাভিদ বলল,

—“কেউ পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় থাকা গুরুত্বপূর্ণ লোকদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছিল।”

—“কেন?”

—“তাদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য।”

আরিয়ান ধীরে ধীরে বলল,

—“মানে, যার কাছে এই তথ্য থাকবে… সে চাইলে অনেক মানুষকে নিজের মতো চালাতে পারবে।”

নাভিদ মাথা নাড়ল।

—“ঠিক তাই।”

মায়া

এই তথ্যের সঙ্গে আরেকটি নাম বারবার সামনে আসছিল।

মায়া।

আন্তর্জাতিক তথ্য-ব্যবসার জগতে তার নাম নতুন নয়।

কেউ বলে সে ব্যবসায়ী।

কেউ বলে সে তথ্য পাচার করে।

আবার কেউ কেউ বলে—

মায়া এমন একজন মানুষ, যে কখনো নিজের আসল পরিচয় কাউকে জানতে দেয় না।

আরিয়ানের কাছে খবর ছিল, মায়া খুব শিগগিরই শহর ছাড়বে।

তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ একবারই।


আরিয়ান সিদ্ধান্ত নিল—

তাকে খুঁজে বের করতেই হবে।

রেলস্টেশনে সাক্ষাৎ

পরদিন সন্ধ্যায় শহরের প্রধান রেলস্টেশন।

হাজার হাজার মানুষের ভিড়।

কেউ অফিস থেকে ফিরছে।

কেউ বাড়ি যাচ্ছে।


কেউ আবার কারও অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।

এই ভিড়ের মধ্যেই আরিয়ান একজন কালো কোট পরা মহিলাকে দেখতে পেল।

চোখে কালো চশমা।

হাতে ছোট ব্যাগ।

সে চারপাশে এমনভাবে তাকাচ্ছে, যেন কাউকে খুঁজছে।

আরিয়ান বুঝল—

এটাই মায়া।

সে কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

—“মায়া?”

মহিলাটি তার দিকে তাকাল।


—“আপনি ভুল মানুষকে খুঁজছেন।”

আরিয়ান বলল,

—“তাহলে রাশেদ করিমের নাম শুনে চলে যাবেন না কেন?”

মায়ার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তে বদলে গেল।

সে নিচু গলায় বলল,

—“আপনি কে?”

—“যে মানুষটা এখন রাশেদের সত্যিটা খুঁজছে।”

মায়া কিছুক্ষণ আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

—“আপনি জানেন না আপনি কী খুঁজছেন।”

—“তাহলে আপনি জানেন?”

মায়া উত্তর দিল না।

শুধু বলল,

—“আপনার দলের মধ্যে একজন বিশ্বাসঘাতক ছিল।”

আরিয়ান বলল,

—“কে?”

মায়া এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল।

—“যাকে আপনি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করেন।”

আরিয়ানের বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল।

—“রাশেদ?”

মায়া কোনো উত্তর দিল না।

তার বদলে ব্যাগ থেকে একটি ছোট মেমোরি কার্ড বের করে আরিয়ানের হাতে দিল।

—“এখানে কিছু উত্তর আছে।”

—“আর বাকি উত্তর?”

—“বাকি উত্তর আপনার জন্য বিপজ্জনক।”

—“আমি ভয় পাই না।”

মায়া মৃদু হেসে বলল,

—“সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষ তারাই, যারা মনে করে তারা ভয় পায় না।”


ঠিক তখনই স্টেশনের অন্য প্রান্তে একটা বিস্ফোরণের শব্দ হলো।


মানুষ ছুটতে শুরু করল।

চিৎকার।

হইচই।

ধোঁয়া।

আরিয়ান মায়ার দিকে তাকাল।

কিন্তু মায়া নেই।

শুধু তার হাতে পড়ে আছে সেই ছোট মেমোরি কার্ড।

মেমোরি কার্ডের রহস্য

নাভিদ কার্ডটি কম্পিউটারে ঢোকানোর পর স্ক্রিনে মাত্র একটি ভিডিও ফাইল দেখা গেল।

ফাইলের নাম—

MIRROR_07

ভিডিও চালু হলো।

অন্ধকার ঘর।


ক্যামেরার সামনে বসে আছে একজন মানুষ।

মুখ দেখা যাচ্ছে না।

কণ্ঠটাও বদলে দেওয়া।

লোকটি বলল,

—“যদি তুমি এই ভিডিও দেখো, তাহলে ধরে নাও পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু হয়নি।”

আরিয়ান চুপ করে শুনছিল।

—“তোমাদের দলকে যে রাতে আক্রমণ করা হয়েছিল, সেটা দুর্ঘটনা ছিল না।”

তারপর লোকটি কয়েক সেকেন্ড থামল।

—“তোমাদের দলের মধ্যে বিশ্বাসঘাতক ছিল।”

নাভিদ বলল,

—“এটা তো আমরা জানিই।”


আরিয়ান চুপ করে বলল,

—“চুপ।”

ভিডিওতে লোকটি এবার বলল,

—“কিন্তু বিশ্বাসঘাতক একজন নয়।”

নাভিদ আরিয়ান দুজনেই স্থির হয়ে গেল।

একজন নয়?

লোকটি আবার বলল,

—“তোমাদের প্রত্যেকের ওপর নজর রাখা হচ্ছিল।”

তারপর স্ক্রিনে কয়েকটি ছবি ভেসে উঠল।

নীলা।

সামির।

তানভীর।

রাশেদ।

আরিয়ান।

সবাই।

শেষে একটি ছবি এসে থামল।

ছবিটা দেখে আরিয়ান চমকে উঠল।

সেখানে ছিল—

নাভিদ।

নাভিদ নিজেও হতভম্ব।

—“এটা কীভাবে সম্ভব?”

ভিডিওর লোকটি বলল,

—“যাকে তুমি এখন সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করছ, তার ব্যাপারেও সাবধান।”


স্ক্রিন কালো হয়ে গেল।

বন্ধুত্বের মধ্যে সন্দেহ

ঘরে নীরবতা।

আরিয়ান ধীরে ধীরে নাভিদের দিকে তাকাল।

নাভিদ বলল,

—“তুমি কি আমাকে সন্দেহ করছ?”

আরিয়ান কোনো উত্তর দিল না।

—“আরিয়ান!”

—“আমি কাউকে বিশ্বাস করছি না।”

নাভিদ কষ্ট পাওয়া গলায় বলল,

—“তাহলে এতক্ষণ আমাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরলে কেন?”

আরিয়ান তাকাল তার দিকে।

—“কারণ তোমাকে বিশ্বাস করতে চাই।”

এই কথার পর দুজনেই চুপ করে গেল।

কখনো কখনো সন্দেহ শত্রুর চেয়েও ভয়ংকর।

কারণ শত্রুকে চিনতে পারলে তার বিরুদ্ধে লড়াই করা যায়।


কিন্তু বন্ধুকে সন্দেহ করলে—

নিজের মনকেই আর বিশ্বাস করা যায় না।

সত্যের সবচেয়ে কাছাকাছি

নাভিদ আবার ভিডিওর শেষ অংশ পরীক্ষা করতে শুরু করল।

হঠাৎ সে চিৎকার করে উঠল,

—“পেয়েছি!”

—“কী?”

—“ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা শব্দ আছে।”

সে শব্দ পরিষ্কার করল।

একটি পুরোনো ঘড়ির শব্দ।

টিক…

টিক…

টিক…

নাভিদ বলল,

—“এই ঘড়িটা কোথায় আছে জানো?”

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

নাভিদ স্ক্রিনে একটি ছবি দেখাল।

একটি পুরোনো সরকারি ভবন।

আরিয়ানের চোখ বড় হয়ে গেল।

—“এটা তো…”

—“হ্যাঁ।”

নাভিদ বলল,

—“এটাই সেই জায়গা, যেখানে রাশেদ শেষবার তোমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল।”

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—“তাহলে রাশেদ সেদিন সেখানে ছিল।”

—“হ্যাঁ।”

—“আর যদি সে বেঁচে থাকে?”

নাভিদ ধীরে বলল,

—“তাহলে সে জানে আসল বিশ্বাসঘাতক কে।”

আরিয়ান উঠে দাঁড়াল।

—“চলো।”

—“কোথায়?”

—“রাশেদকে খুঁজতে।”

কিন্তু দরজার ওপাশে কে?

দুজন বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

ঠিক তখনই—


ঠক… ঠক… ঠক…

দরজায় তিনবার শব্দ হলো।

দুজনেই থেমে গেল।

আবার শব্দ।

ঠক… ঠক…

আরিয়ান নাভিদের দিকে তাকাল।

নাভিদ মাথা নাড়ল।

কেউ জানে না তারা এখানে আছে।

তাহলে দরজার ওপাশে কে?


আরিয়ান ধীরে ধীরে দরজার কাছে গেল।

হাত বাড়িয়ে দরজার লক ধরল।

তারপর থেমে গেল।

কারণ দরজার ওপাশ থেকে ভেসে এলো একটি পরিচিত কণ্ঠ—

“আরিয়ান… দরজা খোলো।”

আরিয়ানের শরীর জমে গেল।

এই কণ্ঠ সে হাজার মানুষের ভিড়েও চিনতে পারবে।

কারণ এই কণ্ঠ—

রাশেদ করিমের।

কিন্তু রাশেদ তো মারা গেছে!

নাকি—

এতদিন সবাইকে অন্য একটা গল্প বিশ্বাস করানো হয়েছিল?

আরিয়ান ধীরে ধীরে দরজার লক খুলতে শুরু করল।


চলবে…

০ মন্তব্য · ৫৬ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!