প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসপ্রজেক্ট মিরর - প্রথম পর্ব

গল্প ও উপন্যাস

প্রজেক্ট মিরর - প্রথম পর্ব

প্রজেক্ট মিরর - প্রথম পর্ব

প্রজেক্ট মিরর

তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা।

শহরটা ঘুমিয়ে পড়েছে অনেক আগেই। রাস্তার দুপাশের পুরোনো ভবনগুলো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। দূরে কোথাও একটা গাড়ি চলে গেলে আবার চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন


কিন্তু এই নীরবতার মধ্যেই শহরের একটি গোপন জায়গায় শুরু হতে যাচ্ছে এমন এক অভিযান, যার কথা জানবে মাত্র কয়েকজন মানুষ।

আর সেই কয়েকজনের একজন—

আরিয়ান রহমান।

বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। শান্ত স্বভাবের মানুষ। তাকে দেখে কখনোই মনে হবে না যে লোকটা দেশের সবচেয়ে গোপন কিছু অভিযানের সঙ্গে যুক্ত।

আরিয়ানের একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল।

বিপদ যত বড়ই হোক, সে কখনো তাড়াহুড়ো করত না।

বরং বিপদের মুহূর্তে তার মাথা আরও ঠান্ডা হয়ে যেত।

সেদিন রাতেও তার হাতে ছিল একটি ছোট কালো ডিভাইস।


কানে ছোট ইয়ারপিস।

আর সামনে ছিল শহরের সবচেয়ে সুরক্ষিত ভবনগুলোর একটি।


ইয়ারপিসে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠ।

—“আরিয়ান, শুনতে পাচ্ছ?”

আরিয়ান খুব আস্তে বলল,

—“স্পষ্ট শুনছি।”

কণ্ঠটা ছিল রাশেদ করিমের।

রাশেদ ছিল তাদের দলের প্রধান। আরিয়ানের কাছে সে শুধু একজন কর্মকর্তা নয়—অনেকটা বড় ভাইয়ের মতো।


গত দশ বছরে অসংখ্য অভিযানে তারা একসঙ্গে কাজ করেছে।

রাশেদ কখনো আরিয়ানকে অযথা ঝুঁকিতে ফেলেনি।

আরিয়ানও রাশেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে কখনো প্রশ্ন করেনি।

আজও তার ব্যতিক্রম হওয়ার কথা ছিল না।

গোপন ফাইল

রাশেদ বলল,

—“ভেতরে একটা ডেটা সার্ভার আছে। সেখানে একটা ফাইল রাখা হয়েছে।”

—“কী ধরনের ফাইল?”

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর রাশেদ বলল,

—“যেটা তুমি জানলে তোমার কাজের চেয়ে প্রশ্নই বেশি হবে।”

আরিয়ান হালকা হাসল।

—“তাহলে প্রশ্ন না করাই ভালো।”

রাশেদও হেসে ফেলল।


—“এই জন্যই তো তোমাকে পছন্দ করি।”

কিন্তু রাশেদের গলার সেই স্বাভাবিক আত্মবিশ্বাসের আড়ালে যেন একটা অস্বস্তি ছিল।

আরিয়ান সেটা টের পেল।

তবু কিছু বলল না।

কারণ পেশাদার মানুষ হিসেবে সে জানত—

অভিযানের মাঝখানে আবেগের জায়গা নেই।

দলের বাকি সদস্যরাও নিজেদের অবস্থানে ছিল।

নীলা নজর রাখছিল বাইরের রাস্তায়।

সামির ছিল গাড়ির ভেতরে। প্রযুক্তিগত যোগাযোগের দায়িত্ব তার।


আর তানভীর ছিল ভবনের অন্য পাশে।

চারজন মানুষ।

একটি লক্ষ্য।

একটি রাত।

সবকিছু পরিকল্পনামতোই চলছিল।

কমপক্ষে তখন পর্যন্ত।

হঠাৎ সব বদলে গেল

আরিয়ান ভবনের ভেতরে ঢোকার কয়েক মিনিট পরই সামিরের কণ্ঠ কানে এলো।

—“আরিয়ান, তোমার অবস্থান বদলেছে।”

—“মানে?”

—“কেউ সিকিউরিটি সিস্টেমে হাত দিয়েছে।”

আরিয়ান থেমে গেল।

—“আমাদের কেউ?”

সামির এবার একটু নিচু গলায় বলল,

—“জানি না।”

এই ‘জানি না’ কথাটাই আরিয়ানের ভালো লাগল না।

কারণ সামির সাধারণত কোনো বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে কথা বলত না।


ঠিক তখনই—

বাইরে একটা শব্দ হলো।

তারপর আরেকটা।

নীলা চিৎকার করে উঠল,

—“আমাদের কেউ অনুসরণ করেছে!”

যোগাযোগ হঠাৎ কেটে গেল।


আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর দৌড় দিল।

কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

একে একে সবাই হারিয়ে গেল

বাইরের রাস্তায় পৌঁছে আরিয়ান দেখল গাড়িটা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

সামির নেই।

নীলার কোনো খবর নেই।

তানভীরের সঙ্গেও যোগাযোগ বন্ধ।

আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার—

রাশেদেরও কোনো সাড়া নেই।

আরিয়ান চারপাশে তাকাল।

কোথাও কোনো মানুষ নেই।

শুধু দূরে পুলিশের গাড়ির সাইরেন শোনা যাচ্ছে।

তার বুকের ভেতর একটা অজানা ভয় ঢুকে গেল।

এটা সাধারণ কোনো অভিযান ব্যর্থ হওয়া নয়।

কেউ পরিকল্পনাটা আগে থেকেই জানত।

কিন্তু কীভাবে?

তাদের পরিকল্পনা জানত মাত্র চারজন।

আর রাশেদ।


তাহলে—

তাদের মধ্যেই কি কেউ বিশ্বাসঘাতক?

ফিরে এসে পেল অন্য এক পৃথিবী

পরদিন সকালে আরিয়ানকে একটি নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়া হলো।

সে ভেবেছিল রাশেদের সঙ্গে দেখা হবে।

কিন্তু সেখানে গিয়ে সে বুঝল পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে।

কেউ তার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে না।

কেউ তার চোখের দিকে তাকাচ্ছে না।


শেষ পর্যন্ত একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সামনে এসে বললেন,

—“আরিয়ান, তোমার দলের সবাই কোথায়?”

আরিয়ান অবাক হয়ে বলল,

—“আমি জানি না।”

—“তুমি জানো না?”

—“শেষবার যখন যোগাযোগ হয়েছিল, সবাই নিজেদের জায়গায় ছিল।”

কর্মকর্তা টেবিলের ওপর একটি ফাইল রাখলেন।

—“এই অভিযানের পরিকল্পনা বাইরে গেল কীভাবে?”


আরিয়ান চুপ।

তিনি আবার বললেন,

—“তোমাদের পুরো পরিকল্পনা শত্রুপক্ষ আগে থেকেই জানত।”

আরিয়ানের বুকটা ধক করে উঠল।

তারপর টেবিলে আরেকটি ছবি রাখা হলো।

ছবিটা দেখে আরিয়ান স্তব্ধ।

সেখানে ছিল তার দলের গোপন তথ্য।

যে তথ্য বাইরে যাওয়ার কথা নয়।

এক মুহূর্তের জন্য তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরল—


“আমাদের মধ্যে কেউ কথা বলেছে।”

আরিয়ানকে সন্দেহ করা হচ্ছে

কিছুক্ষণ পর সে বুঝতে পারল—

সন্দেহের তালিকায় সবচেয়ে উপরে তার নিজের নাম।

কারণ অভিযানের সময় একমাত্র আরিয়ানই জীবিত অবস্থায় ফিরে এসেছে।

আর তার কাছে পাওয়া গেছে এমন একটি ডিভাইস, যেটা সাধারণ কোনো এজেন্টের কাছে থাকার কথা নয়।

আরিয়ান ব্যাখ্যা দিতে চাইল।

কিন্তু কেউ শুনতে রাজি নয়।

একজন কর্মকর্তা ঠান্ডা গলায় বললেন,

—“তুমি চাইলে এখনো অনেক কিছু সহজ করতে পারো।”

আরিয়ান তাকিয়ে রইল।

—“কীভাবে?”

—“যে তথ্য বাইরে গেছে, সেটা কোথা থেকে গেছে বলো।”

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—“আমি জানি না।”

—“তাহলে তোমাকে বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই।”


সেদিনই আরিয়ান বুঝে গেল—

তার বিরুদ্ধে শুধু সন্দেহ তৈরি হয়নি।

কেউ তাকে ফাঁসানোর জন্য পরিকল্পনা করেছে।

পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত

রাতের দিকে আরিয়ান একটি ছোট জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল।

তার মাথায় বারবার নীলার মুখ ভেসে উঠছিল।

সামিরের হাসি।

তানভীরের শেষ কথা।

আর রাশেদ—

যে মানুষটাকে সে জীবনে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করেছে।

রাশেদ কি সত্যিই মারা গেছে?

নাকি সে বেঁচে আছে?

আর যদি বেঁচে থাকে—

তাহলে কোথায়?

হঠাৎ আরিয়ানের মাথায় একটা কথা এল।

অভিযানের আগে রাশেদ তাকে একটি কথা বলেছিল—

“সব উত্তর ফাইলে থাকবে না।”

তখন কথাটার কোনো মানে বুঝতে পারেনি সে।

এখন বুঝতে পারছে।

রাশেদ হয়তো তাকে কোনো ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু সেই ইঙ্গিত খুঁজে বের করতে হলে তাকে নিজের সংগঠনের বিরুদ্ধেই যেতে হবে।


আরিয়ান জানালার দিকে তাকিয়ে একটা সিদ্ধান্ত নিল।

সে পালাবে।

কিন্তু নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য নয়।

সত্যিটা বের করার জন্য।

নাভিদের সঙ্গে দেখা

আরিয়ান প্রথমে গেল তার পুরোনো পরিচিত নাভিদ হাসানের কাছে।

নাভিদ একসময় তাদের দলের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ছিল।

এখন সে সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করে না।

নিজের মতো থাকে।

কম কথা বলে।

আর কম্পিউটারের সামনে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতে পারে।

আরিয়ানকে দরজায় দেখে নাভিদ ভ্রু কুঁচকে বলল,

—“তোমাকে তো খুঁজছে সবাই।”

—“জানি।”

—“তাহলে এখানে এলে কেন?”

আরিয়ান বলল,

—“কারণ তুমি ছাড়া আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না।”

নাভিদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর দরজা খুলে দিল।

—“ভেতরে আসো।”

আরিয়ান ভেতরে ঢুকে বলল,

—“আমাদের দলের ওপর হামলাটা বাইরে থেকে হয়নি।”

নাভিদ তাকাল।

—“তুমি নিশ্চিত?”

—“প্রায়।”

—“প্রায় দিয়ে কাজ হবে না।”

আরিয়ান টেবিলের ওপর একটি ডিভাইস রাখল।

—“এটার ভেতরের তথ্য বের করতে হবে।”

নাভিদ ডিভাইসটা হাতে নিল।

কয়েক সেকেন্ড পর তার মুখের ভাব বদলে গেল।

—“এটা কোথায় পেলে?”

—“অভিযানের জায়গা থেকে।”

নাভিদ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

—“আরিয়ান… তোমাদের মিশনের আসল উদ্দেশ্য এটা ছিল না।”

আরিয়ান স্থির হয়ে গেল।

—“তাহলে কী ছিল?”

নাভিদ কোনো উত্তর দিল না।

সে শুধু স্ক্রিনের একটা ফোল্ডার খুলল।

সেখানে ছিল একটি নাম।

PROJECT MIRROR

আর তার নিচে কয়েকজন মানুষের নাম।

আরিয়ান ধীরে ধীরে স্ক্রিনের দিকে এগিয়ে গেল।

প্রথম নামটা দেখে তার বুক কেঁপে উঠল।

দ্বিতীয় নামটা দেখে সে নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেলল।

আর তৃতীয় নামটা—

রাশেদ করিম।

আরিয়ান কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না।

নাভিদ ধীরে বলল,

—“তোমার বন্ধু রাশেদ শুধু এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়।”

আরিয়ান তার দিকে তাকাল।

—“তুমি কী বলতে চাইছ?”

নাভিদ স্ক্রিনের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল,

—“এই প্রজেক্টের শুরু থেকেই সে এর মধ্যে ছিল।”

ঘরের ভেতর কয়েক সেকেন্ডের জন্য সম্পূর্ণ নীরবতা নেমে এলো।

আরিয়ানের মাথায় যেন হাজারটা প্রশ্ন একসঙ্গে ঘুরতে লাগল।

রাশেদ কি বিশ্বাসঘাতক?

নাকি কেউ ইচ্ছা করেই তার নাম এখানে বসিয়েছে?

আর নীলা, সামির, তানভীরের মৃত্যুর সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—

রাশেদ কি সত্যিই মারা গেছে?

ঠিক তখনই বাইরে একটি গাড়ির শব্দ হলো।

নাভিদ জানালার কাছে গিয়ে পর্দা সরাল।

তার মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

—“আমাদের খুঁজে পেয়েছে।”

আরিয়ান উঠে দাঁড়াল।

দূরে গাড়ির দরজা খুলছে।একজন নয়।

অনেকজন।

আরিয়ানের হাতে তখন কোনো অস্ত্র নেই।

সামনে অন্ধকার রাস্তা।

পেছনে বন্ধ দরজা।

আর তার মাথার মধ্যে শুধু একটা কথাই ঘুরছে—

“এখন থেকে এই মিশনে সে একা।”

কিন্তু আরিয়ান জানত না—

এই রাতের পর যে সত্যিটা তার সামনে আসবে, সেটা তার নিজের অতীতকেও বদলে দেবে।


চলবে…

০ মন্তব্য · ৮৬ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!