পুরোনো কাঠের ড্রয়ারটা পরিষ্কার করতে গিয়ে ধুলোবালি মাখা একটি মোটা ডায়েরি খুঁজে পেয়েছিল নীলা। খাতাটির কভারের ওপর বড় বড় করে নীল কালিতে লেখা—‘এলেবেলে’। নাম দেখেই নীলার কৌতূহল হলো। এই ব্যস্ত আর নিয়মে বাঁধা জীবনে ‘এলেবেলে’ বা অর্থহীন জিনিসের কোনো জায়গা নেই। সে ভাবল, এ আবার কেমন খাতা! পাতা উল্টাতেই সে দেখল, ভেতরে কোনো জরুরি হিসাব বা কাজের কথা নেই; কেবল অগোছালো কিছু ভাবনা আর অদ্ভুত সব মানুষের গল্প।
প্রথম পাতাতেই লেখা ছিল এক অদ্ভুত চরিত্রের কথা—হাবুল সাহেব। তিনি নাকি প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ডায়েরিতে নোট করতেন আজ কোন কোন দিক দিয়ে তিনি হাঁটবেন না। এরপর তিনি সেই বাদ দেওয়া রাস্তাগুলো এড়িয়ে উল্টো পথে চলতেন। হাবুল সাহেবের যুক্তি ছিল, চেনা ছকে চললে জীবনটা এলেবেলে হয়ে যায়, তাই অচেনা পথেই আসল আনন্দ। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, পথে যার সাথেই তার দেখা হতো, তাকেই পকেট থেকে একটা করে রঙিন মার্বেল উপহার দিতেন। মানুষ তাকে পাগল ভাবলেও, তার দেওয়া মার্বেল হাতে নিয়ে সবার মুখেই এক চিলতে হাসি ফুটত।
দ্বিতীয় পাতায় ছিল একটি বিড়াল ছানার গল্প। যে বিড়ালটি সাধারণ বিড়ালের মতো ‘মিউ মিউ’ না করে মানুষের মতো শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলত। যখনই নীলার মা রান্নাঘরে মাছ ভাজতেন, সে জানলার কোণে এসে এমন গম্ভীর ও দার্শনিক ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকত যে, মা শেষ পর্যন্ত তাকে মাছের বড় টুকরোটা দিতে বাধ্য হতেন। ডায়েরিতে লেখা ছিল, বিড়ালটির নাম ‘স্রাবন্তি’।
খাতার পাতাগুলো যতই উল্টাচ্ছিল, নীলা ততই মুগ্ধ হচ্ছিল। সেখানে কোনো বড় বড় উপদেশ ছিল না, ছিল বৃষ্টিভেজা বিকেলের অলস আড্ডা, মাঝরাতে হঠাৎ করে চা খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা, কিংবা কোনো পুরোনো বন্ধুর সাথে হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়ার মতো ছোট ছোট আনন্দের মুহূর্ত।
খাতাটি পড়তে পড়তে নীলার মনে হলো, আমরা প্রতিনিয়ত কত নিয়ম আর পরিকল্পনার পেছনে ছুটি। অথচ জীবনের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে এই সমস্ত এলেবেলে ও এলোমেলো মুহূর্তগুলোর মধ্যেই। ঘড়ির কাঁটা ধরে বেঁচে থাকার চেয়ে মাঝেমধ্যে একটু ‘এলেবেলে’ হওয়াও তো দরকার। নীলা খাতাটি আলতো করে বন্ধ করল এবং মুচকি হেসে নিজের পড়ার টেবিলের সবচেয়ে প্রিয় জায়গায় রেখে দিল—হয়তো কাল থেকে সে নিজেও এই খাতায় তার নিজস্ব কিছু এলেবেলে গল্প লেখা শুরু করবে।
আমার জীবন টাই এলেবেলে, তাই তো মন খুলে হাসি, বন্ধু দের সাথে মিশি 🤣