প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসদায়িত্ব

গল্প ও উপন্যাস

দায়িত্ব

দায়িত্ব

নদীর ধারে ছোট্ট একটি গ্রাম। গ্রামের মানুষের জীবনের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক ছিল খুব গভীর। কেউ নদী পাড়ি দিয়ে বাজারে যেত, কেউ ওপারের হাটে ধান বিক্রি করত, কেউ আবার চিকিৎসার জন্য শহরে যেত। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র হলেও তাদের জীবন চলত পরস্পরের সহযোগিতায়।


বিজ্ঞাপন

সেই গ্রামের একজন সাধারণ মাঝি ছিল রশিদ। বয়স খুব বেশি নয়, প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি। ছোট্ট একটি কাঠের নৌকা ছিল তার সম্বল। নৌকাটিই ছিল তার জীবিকা, তার সংসারের ভরসা। স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে তার ছোট সংসার।


রশিদ খুব ধনী মানুষ ছিল না। প্রতিদিন যত মানুষ নদী পার হতো, তাদের কাছ থেকে সামান্য ভাড়া নিত। সেই টাকা দিয়েই চাল-ডাল কিনত, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাত এবং নৌকার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র মেরামত করত।


গ্রামের মানুষ তাকে পছন্দ করত। কারণ রশিদের একটি অভ্যাস ছিল—সে কখনো কারও অসহায় অবস্থার সুযোগ নিত না।


কেউ ভাড়া দিতে না পারলে সে বলত, “আজ থাক। আল্লাহ যখন তোমার অবস্থা ভালো করবেন, তখন দিয়ে দিও।”

কেউ বৃদ্ধ হলে তাকে উঠতে সাহায্য করত। গর্ভবতী নারী বা ছোট শিশু নিয়ে কেউ নদীতে এলে রশিদ বিশেষ সতর্ক থাকত।

কিন্তু রশিদের জীবনে এমন একটি রাত এসেছিল, যে রাত তার চরিত্রের আসল পরিচয় প্রকাশ করে দিয়েছিল।


সেদিন বিকেল থেকেই আকাশের অবস্থা খারাপ হতে শুরু করেছিল। পশ্চিম আকাশ কালো হয়ে উঠেছিল। নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে ফুলে উঠছিল। দূরে দূরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল।


গ্রামের অভিজ্ঞ মানুষরা বলছিল, “আজ রাতে নদীতে নামা ঠিক হবে না।”

রশিদও নৌকা ঘাটে বেঁধে বাড়ি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।


সন্ধ্যার কিছু আগে তার নৌকাটি ঘাটে ভালোভাবে বেঁধে সে বাড়ির দিকে হাঁটছিল। এমন সময় গ্রামের এক যুবক দৌড়ে এসে বলল, “রশিদ ভাই! ওপারের বাজার থেকে কয়েকজন মানুষ এখনো ফেরেনি। শুনেছি তারা শেষ নৌকাটাও মিস করেছে।”


রশিদ থেমে গেল।

সে আকাশের দিকে তাকাল। বাতাস তখন আরও জোরে বইছে।

“কতজন?” সে জিজ্ঞেস করল।

যুবক বলল, “ঠিক জানি না। সম্ভবত ছয়-সাতজন। তাদের মধ্যে একজন বৃদ্ধ আর দুইজন নারীও আছে।”

রশিদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তার মনে হলো, এখন নদীতে যাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। নিজের নৌকাটিও ডুবে যেতে পারে। জীবনও চলে যেতে পারে।


সে বলল, “অন্য কোনো নৌকা?”

যুবক মাথা নাড়ল। “কেউ যেতে রাজি হচ্ছে না।”

রশিদ বাড়ির দিকে আবার হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু কয়েক কদম যাওয়ার পর থেমে গেল।

তার মনে একটা প্রশ্ন ঘুরতে লাগল—“আমি যদি যেতে না পারি, সেটা এক কথা। কিন্তু আমি যদি শুধু নিজের নিরাপত্তার জন্য তাদের বিপদের মধ্যে রেখে দিই?”


সে জানত, মানুষের জীবন তার হাতে দেওয়া হয়নি, কিন্তু আল্লাহ তাকে এমন অবস্থানে রেখেছেন যেখানে সে কিছু করতে পারে।

রশিদ বাড়িতে ফিরে স্ত্রীকে বলল, “আমাকে আবার ঘাটে যেতে হবে।”

স্ত্রী অবাক হয়ে বলল, “এই ঝড়ে?”

রশিদ মাথা নিচু করে বলল, “ওপারে কয়েকজন মানুষ আটকে আছে।”

স্ত্রী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “তুমি কি জানো, নদী এখন কতটা ভয়ংকর?”

“জানি।”

“নৌকা যদি ডুবে যায়?”


রশিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তাহলে আল্লাহর ওপর ভরসা করব। তবে আমি বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছি না। আমি যতটা সম্ভব সাবধানে যাব।”


স্ত্রী তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঘরের ভেতর থেকে একটি অতিরিক্ত দড়ি এনে তার হাতে দিয়ে বলল, “এটা সঙ্গে নাও। আর আল্লাহর নাম নিয়ে যাও।”


রশিদ নৌকা নিয়ে ঘাটে পৌঁছাল।

ততক্ষণে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বাতাস এত জোরে বইছিল যে নৌকা বাঁধা দড়ি বারবার টান খাচ্ছিল।


রশিদ নৌকায় উঠে প্রথমে সবকিছু পরীক্ষা করল। দড়ি ঠিক আছে কি না, বৈঠা ঠিক আছে কি না, নৌকার কোথাও পানি ঢুকছে কি না—সব দেখে নিল।


তারপর আল্লাহর নাম নিয়ে নদীতে নেমে পড়ল।

নদীর মাঝখানে পৌঁছাতেই ঢেউ নৌকাটিকে দুলিয়ে দিতে লাগল।

রশিদ বুঝতে পারল, সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না।

একবার তার মনে হলো, “ফিরে যাই।”

কিন্তু পরক্ষণেই সে মনে করল—ওপারে কয়েকজন মানুষ অপেক্ষা করছে।


সে বৈঠা শক্ত করে ধরল।

প্রায় আধা ঘণ্টা পর দূরে একটি মৃদু আলো দেখা গেল।

ওপারের ঘাটে কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল।

তারা রশিদের নৌকা দেখে চিৎকার করে উঠল।

“রশিদ! রশিদ এসেছে!”

রশিদ ঘাটে পৌঁছাতেই সবাই তাড়াহুড়ো করে নৌকায় উঠতে চাইলো।

কিন্তু রশিদ বলল, “একসঙ্গে সবাই উঠবেন না। নৌকা ভারী হয়ে যাবে।”


সে প্রথমে বৃদ্ধ লোকটিকে উঠাল। তারপর দুই নারীকে। এরপর একজন কিশোরকে। সবশেষে বাকিদের।

নৌকা ছাড়ার আগে রশিদ খেয়াল করল, এক বৃদ্ধ লোক বারবার নিজের বুকের কাছে কিছু আঁকড়ে ধরে রেখেছেন।


রশিদ জিজ্ঞেস করল, “চাচা, কী হয়েছে?”

বৃদ্ধ বললেন, “আমার কাছে কিছু টাকা আর কিছু কাগজপত্র আছে। এগুলো হারিয়ে গেলে আমি শেষ হয়ে যাব।”

রশিদ বলল, “ভয় করবেন না। আগে আপনাকে নিরাপদে পৌঁছাই।”


নৌকা মাঝ নদীতে আসতেই ঝড় আরও বেড়ে গেল।

বৃদ্ধ লোকটির হাত থেকে হঠাৎ একটি ছোট কাপড়ের পুঁটলি পানিতে পড়ে গেল।


তিনি চিৎকার করে উঠলেন, “আমার টাকা!”

তিনি নৌকার কিনারার দিকে ঝুঁকে পড়লেন।

রশিদ সঙ্গে সঙ্গে তাকে ধরে ফেলল।

“চাচা! আপনি নড়বেন না!”

বৃদ্ধ কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “ওটার মধ্যে আমার জীবনের সব সঞ্চয়!”


রশিদ জানত, এই অবস্থায় পানিতে হাত বাড়ানোও বিপজ্জনক। কিন্তু সে নৌকার দড়ি দিয়ে নিজের কোমর বাঁধল। তারপর আরেক প্রান্ত একজন যাত্রীর হাতে দিয়ে বলল, “আমি একটু নিচু হচ্ছি। আমাকে শক্ত করে ধরে রাখবেন।”


সে নৌকার পাশে ঝুঁকে পানির মধ্যে হাত বাড়াল।

ঢেউয়ের আঘাতে তার হাত কয়েকবার পিছলে গেল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তার আঙুলে কাপড়ের পুঁটলিটি আটকে গেল।


সে সেটি তুলে নৌকায় ফিরিয়ে আনল।

বৃদ্ধ লোকটি পুঁটলিটি বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলেন।

“বাবা, তুমি না থাকলে আজ সব শেষ হয়ে যেত।”

রশিদ শুধু বলল, “চাচা, আগে জীবন বাঁচুক। টাকা পরে।”

অবশেষে তারা নিরাপদে গ্রামের ঘাটে পৌঁছাল।

সবাই একে একে নেমে গেল।

বৃদ্ধ লোকটি রশিদের হাতে কিছু টাকা দিতে চাইলেন।

“বাবা, এটা রাখো। আজ তুমি আমাদের জীবন বাঁচিয়েছ।”


রশিদ মাথা নাড়ল।

“না চাচা। আমি নৌকার ভাড়া নেব। কিন্তু এর বেশি কিছু নয়।”

বৃদ্ধ বললেন, “তুমি তো নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছ!”

রশিদ মৃদু হেসে বলল, “আমি যদি আপনার বিপদের সুযোগ নিয়ে বেশি টাকা নিই, তাহলে সেটা কি ঠিক হবে?”


বৃদ্ধ চুপ হয়ে গেলেন।

রশিদ নৌকার স্বাভাবিক ভাড়া নিল। তারপর নৌকা বেঁধে বাড়ির দিকে চলে গেল।

পরদিন সকালে গ্রামের মানুষজন ঘটনাটি জানতে পারল।

সবাই রশিদের প্রশংসা করতে লাগল।

কেউ বলল, “রশিদ না গেলে মানুষগুলো হয়তো রাতটা নদীর ওপারে আটকে থাকত।”

কেউ বলল, “এমন ঝড়ে যাওয়ার সাহস সবার নেই।”

কিন্তু রশিদ এসব কথা শুনে শুধু বলল, “আমার কী কৃতিত্ব? আল্লাহ আমাকে সামান্য একটা সুযোগ দিয়েছিলেন। আমি শুধু চেষ্টা করেছি।”

কয়েকদিন পর সেই বৃদ্ধ লোকটি আবার রশিদের কাছে এলেন।


তিনি বললেন, “তোমার জন্য আমি শুধু টাকা বাঁচাইনি। আমার গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাগজও বেঁচেছে। সেগুলো হারালে আমার ছেলেমেয়েরা বড় সমস্যায় পড়ত।”


তারপর তিনি রশিদকে একটি খাম দিতে চাইলেন।

রশিদ বলল, “এটা কী?”

“তোমার নৌকা মেরামতের জন্য কিছু টাকা। সেদিন ঝড়ে তোমার নৌকার বেশ ক্ষতি হয়েছে।”

রশিদ প্রথমে নিতে চাইছিল না।


কিন্তু বৃদ্ধ বললেন, “এটা তোমার উপকারের দাম নয়। এটা তোমার ক্ষতি পূরণের জন্য। তুমি না নিলে আমার মনে হবে আমি তোমার প্রতি অন্যায় করছি।”


রশিদ তখন গ্রহণ করল।

কিন্তু সেই টাকা নিজের জন্য খরচ না করে নৌকাটি মেরামত করার পর অবশিষ্ট টাকা দিয়ে ঘাটে একটি শক্ত কাঠের খুঁটি বসিয়ে দিল, যাতে ঝড়ের সময় অন্য মাঝিরাও নৌকা নিরাপদে বাঁধতে পারে।


একদিন গ্রামের একজন তাকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি নিজের জন্য টাকা রাখলে না কেন?”


রশিদ হাসল।

“আমি একা নিরাপদ থাকলে কী হবে? আল্লাহ যদি আমাকে কোনো ভালো কাজের সুযোগ দেন, তাহলে সেটা শুধু আমার জন্য নয়—অন্যদের উপকারেও লাগানো উচিত।”


সেদিন থেকে গ্রামের মানুষ রশিদকে শুধু একজন মাঝি হিসেবে দেখত না। তারা তাকে একজন **দায়িত্বশীল মানুষ** হিসেবে দেখতে শুরু করেছিল।


রশিদের নৌকা ছিল ছোট, তার ঘর ছিল সাধারণ, তার সম্পদ ছিল সীমিত। কিন্তু মানুষের কাছে তার বিশ্বাসযোগ্যতা ছিল অনেক বড়।


বছর কয়েক পর তার ছেলে যখন বড় হলো, একদিন সে বাবাকে জিজ্ঞেস করল, “আব্বা, আপনি এত কষ্ট করেন কেন? আপনি চাইলে অন্য কোনো কাজ করতে পারতেন।”


রশিদ নদীর দিকে তাকিয়ে বলল, “বাবা, মানুষের জীবনে বড় হওয়া মানে শুধু বেশি টাকা উপার্জন করা নয়। কখনো কখনো আল্লাহ তোমার হাতে এমন দায়িত্ব দেন, যেটা অন্য কারও হাতে নেই। তখন সেই দায়িত্বকে আমানত মনে করতে হয়।”


ছেলে বলল, “আর যদি নিজের ক্ষতি হয়?”

রশিদ বলল, “নিজের ক্ষতি হলে হিসাব আল্লাহর কাছে। কিন্তু অন্যের হক নষ্ট করে লাভ করলে সেই লাভের হিসাবও আল্লাহর কাছেই দিতে হবে।”


ছেলেটি চুপ করে বাবার কথা শুনল।

রশিদ আবার বলল, “মনে রেখো, মানুষের চোখে সাধারণ হওয়া কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা হলো আল্লাহর দেওয়া দায়িত্বে অসৎ হয়ে যাওয়া।”


নদীর ওপর তখন সন্ধ্যার আলো পড়ছিল। রশিদ ধীরে ধীরে নৌকার দড়ি গুছিয়ে রাখছিল।


তার জীবনে কোনো বড় প্রাসাদ ছিল না, কোনো বিশাল সম্পদ ছিল না, মানুষের সামনে নিজের নাম প্রচার করারও কোনো চেষ্টা ছিল না।


কিন্তু তার কাছে একটি জিনিস ছিল—**আল্লাহর ভয় এবং মানুষের আমানতের প্রতি সম্মান।**


আর সেই কারণেই একজন সাধারণ মাঝির ছোট্ট নৌকাটি গ্রামের মানুষের কাছে একদিন বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।


### গল্পের শিক্ষা


এই গল্প আমাদের শেখায়, **দায়িত্ব শুধু সেই কাজের নাম নয় যেটার বিনিময়ে আমরা টাকা পাই; দায়িত্ব হলো এমন কোনো অবস্থান, যেখানে অন্য মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার বা বিশ্বাস আমাদের ওপর নির্ভর করে।**


মানুষ অসহায় হলে তার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে বেশি লাভ করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বরং সেই সময় তার পাশে দাঁড়ানোই উত্তম চরিত্রের পরিচয়।


আরেকটি বড় শিক্ষা হলো—**আমানত শুধু টাকা-পয়সার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।** কারও জীবন, বিশ্বাস, দায়িত্ব, গোপনীয়তা কিংবা অধিকার—সবকিছুর ক্ষেত্রেই আমানতদারি প্রয়োজন।


আল্লাহ আমাদের এমন মানুষ হওয়ার তাওফিক দিন, যাদের সম্পদ কম হলেও চরিত্র বড়, সুযোগ কম হলেও আমানতদারি বেশি, আর মানুষের চোখে সাধারণ হলেও আল্লাহর কাছে উত্তম হওয়ার চেষ্টা থাকে।


#আশেপাশে

০ মন্তব্য · ৩৫ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!