🌴 তালগাছের ভূত👿
ভাদ্র মাস এলেই আমাদের গ্রামের চেহারা বদলে যেত। চারদিকে কাঁচা-পাকা তালের গন্ধ, পুকুরের ধারে ব্যাঙের ডাক, আর সন্ধ্যা নামলেই ঝিঁঝিঁ পোকার কনসার্ট।
তবে এসবের চেয়েও বড় আতঙ্ক ছিল গ্রামের পশ্চিমপাড়ার সেই বিশাল তালগাছটা।
লোকমুখে শোনা যায়, গাছটার মাথায় নাকি একটা ভূত থাকে।
ভূতটা অবশ্য খুব একটা ভয়ংকর নয়—কিন্তু সমস্যা হলো, সে নাকি তাল খুব ভালোবাসে!
আর ভাদ্র মাসে তাল পাকতে শুরু করলেই তার নাকি মাথা খারাপ হয়ে যায়।
গ্রামের সবাই সন্ধ্যার পর ওই গাছের আশপাশ দিয়ে হাঁটত না।
কিন্তু গ্রামের সবচেয়ে সাহসী মানুষ ছিল কুদ্দুস মিয়া।
কুদ্দুস মিয়া প্রতিদিন চায়ের দোকানে বসে ঘোষণা দিত,
—“ভূত-টুত বলে কিছু নাই। মানুষ ভয় পায় বলেই ভূত দেখা যায়!”
একদিন রাতে চায়ের দোকানে বসে সবাই যখন ভূতের গল্প করছে, কুদ্দুস মিয়া তখন গলা উঁচু করে বলল,
—“আজ রাতে আমি ওই তালগাছের নিচে গিয়ে বসব। দেখি কোন ভূত আমার সামনে আসে!”
চায়ের দোকানের মালিক হাবুল বলল,
—“কুদ্দুস ভাই, ভূত যদি আসে?”
—“তাহলে তার লগে বসে চা খাব!”
সবাই হেসে উঠল। রাত প্রায় বারোটা।
কুদ্দুস মিয়া হাতে একটা হারিকেন আর একটা লাঠি নিয়ে তালগাছের নিচে গিয়ে বসল।
কিছুক্ষণ পর বাতাসে তালপাতা নড়তে লাগল।
সড়সড়… সড়সড়…
কুদ্দুস মিয়া একটু চমকে উঠলেও নিজেকে সামলে বলল,
—“এইসব বাতাস। ভয় পাওয়ার কিছু নাই।”
হঠাৎ ওপর থেকে একটা তাল এসে তার মাথার পাশে পড়ল।
ধপাস!
কুদ্দুস মিয়া লাফ দিয়ে উঠে বলল,
—“কে?”
কোনো উত্তর নেই। সে আবার বসে পড়ল।
এক মিনিট পর আরেকটা তাল এসে পড়ল।
ধপাস!
এবার কুদ্দুস মিয়া বলল,
—“এইটা কিন্তু বাতাসের কাজ না!”
ঠিক তখনই ওপর থেকে একটা কর্কশ আওয়াজ—
—“আমার তাল কে পাড়ে?”
কুদ্দুস মিয়ার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে কাঁপা গলায় বলল,
—“কে… কে কথা কয়?”
ওপর থেকে উত্তর এল,
—“আমি তালগাছের ভূত!”
কুদ্দুস মিয়া সাহস দেখানোর চেষ্টা করে বলল,
—“তুমি ভূত হলে আমি কুদ্দুস!”
ভূত বলল,—“কুদ্দুস হইছো ভালো কথা। কিন্তু আমার তাল খাইতেছো ক্যান?”
কুদ্দুস মিয়া নিচে পড়ে থাকা তালটার দিকে তাকাল।
—“আমি তো খাই নাই!”
ভূত বলল,
—“তাহলে তালটা তোমার পকেটে গেল কীভাবে?”
কুদ্দুস মিয়া পকেটে হাত দিয়ে দেখে—সত্যিই একটা তাল!
সে অবাক।
—“আরে! এইটা তো আমি রাখি নাই!”
ভূত বলল,
—“আমি রাখছি।”
—“ক্যান?”
—“তোমার সাহস পরীক্ষা করার জন্য।”
কুদ্দুস মিয়া একটু সাহস পেয়ে বলল,
—“পরীক্ষায় পাস করছি?”
ভূত বলল,
—“না। তুমি তো তালটা পকেটে ঢুকাইয়া বসে আছো!”
কুদ্দুস মিয়া এবার আর কথা না বাড়িয়ে দৌড় দিল।
পেছন থেকে ভূতের গলা—
—“এই কুদ্দুস! তালটা নিয়ে যাইও না!”
কুদ্দুস দৌড়াতে দৌড়াতে চিৎকার করল,
—“তোর তাল তুই রাখ!”
পরদিন সকালে কুদ্দুস মিয়া চায়ের দোকানে এসে ঘোষণা দিল,
—“আমি কাল রাতে ভূতের সঙ্গে কথা কইছি!”
সবাই অবাক।—“কী বলল ভূত?”
কুদ্দুস মিয়া গম্ভীর মুখে বলল,
—“ভূতটা খুব ভালো মানুষ।”
হাবুল বলল,—“কীভাবে বুঝলা?”
কুদ্দুস মিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—“আমারে শুধু তাল চুরি করতে নিষেধ করছে। আর কিছু করে নাই।”
সবাই হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগল।
এরপর থেকে গ্রামের লোকেরা আর তালগাছের ভূতকে ভয় পেত না।
বরং ভাদ্র মাসে তাল পাকলে গাছের নিচে একটা ঝুড়ি রেখে যেত।
ঝুড়ির গায়ে লেখা থাকত—
“ভূত ভাই, আপনার ভাগ আলাদা।
দয়া করে রাতের বেলা মাথায় তাল ফেলবেন না!”
কিন্তু সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো—
পরের বছর কুদ্দুস মিয়া আবার সাহস করে সেই তালগাছের নিচে বসেছিল।
সেদিন রাতেও ওপর থেকে আওয়াজ এল—
—“কুদ্দুস!”
কুদ্দুস মিয়া বলল,
—“কী?”
ভূত বলল,
—“চা আছে?”
কুদ্দুস মিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“চা নাই। তবে তাল আছে।”
ভূত বলল,
—“তাহলে বসো। আজকে আড্ডা হবে!
অনেক ভয় পেয়েছি পড়ে।🫣