পাড়ার রংবাজ
পুরান ঢাকার পাড়াগুলো এমনিতেই একটু অন্যরকম। সরু গলি, মাথার ওপর ঝুলে থাকা বিদ্যুতের তার, পুরোনো দালানের বারান্দা, গলির মুখে চায়ের দোকান—আর বিকেল হলেই একসঙ্গে দশ রকম শব্দ।
কোথাও রিকশার ঘণ্টি, কোথাও আজানের সুর, কোথাও আবার দোকানদারের চিৎকার—“ভাই, মালটা নিয়ে যান!”
এই ব্যস্ত গলিরই ছেলে বাবলু।
ছোটবেলায় বাবলু ছিল একেবারে সাধারণ। স্কুলে পড়াশোনায় খুব একটা ভালো ছিল না, আবার খারাপও ছিল না। তবে একটা জিনিস তার মধ্যে ছোটবেলা থেকেই ছিল—অন্যায় দেখলে চুপ করে থাকতে পারত না।
বাবলুর বাবা ছিলেন পুরান ঢাকার একটা ছোট মসলার দোকানের কর্মচারী। সংসার চলত কষ্টে। বাবা সবসময় একটা কথাই বলতেন,
“বাবলু, মানুষকে ভয় দেখিয়ে বড় হইস না। এমন মানুষ হইস, যাতে মানুষ বিপদে পড়লে তোর কাছে আসে।”
কিন্তু বাবলু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাড়ার পরিবেশও তাকে বদলাতে শুরু করল।
যেদিন বাবলুর নাম ছড়াল
বাবলুর বয়স তখন উনিশ-২০। গলির চায়ের দোকানে বসে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়, ফুটবল খেলে, মাঝেমধ্যে একটু-আধটু ঝামেলাতেও জড়িয়ে পড়ে।
সেই সময় পাশের পাড়ার কয়েকজন বখাটে প্রায়ই তাদের এলাকায় এসে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করত, দোকানদারদের কাছ থেকে জোর করে টাকা চাইত। কেউ প্রতিবাদ করলে বলত,
“এই রাস্তা দিয়ে চলতে হলে আমাদের কথা শুনে চলতে হবে।”
পাড়ার মানুষজন বিরক্ত হলেও সরাসরি ঝামেলায় যেতে চাইত না।
একদিন বিকেলে বাবলু চায়ের দোকানে বসে ছিল। এমন সময় পাশের গলির মুদি দোকানের কাদের ভাই দৌড়ে এসে বললেন,
“বাবলু, ওরা আবার আইছে। দোকানের সামনে দাঁড়ায়ে ছেলেপেলেদের ভয় দেখাচ্ছে।”
বাবলু চায়ের কাপটা নামিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“কয়জন?”
“চার-পাঁচজন।”
বাবলু উঠে দাঁড়াল।
সঙ্গে থাকা বন্ধুরা বলল, “কী করবি?”
বাবলু শুধু বলল,
“দেখি, কথা বলে বুঝানো যায় কি না।”
গলির মাথায় গিয়ে বাবলু দেখল, চারজন ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মধ্যে একজন সবচেয়ে বেশি হম্বিতম্বি করছে।
বাবলু সামনে গিয়ে বলল,
“ভাই, অন্য পাড়ায় গিয়ে দাদাগিরি করো, এখানে না।”
ছেলেটা হেসে বলল,
“তুই কে?”
বাবলু উত্তর দিল,
“আমি কেউ না। কিন্তু এই পাড়ার মানুষজন আমার আপন মানুষ।”
কথাটা শুনে আশপাশের কয়েকজন দোকানদারও বেরিয়ে এলেন।
বাবলু তখন আর একা ছিল না।
সে ছেলেগুলোকে বলল,
“আজকে চলে যাও। আবার যদি কারও দোকানে গিয়ে ভয় দেখাও, তখন কিন্তু পাড়ার সবাই মিলে বসব। তখন তোমাদের সঙ্গে কথা বলবে শুধু আমি না—আইনও কথা বলবে।”
বখাটেরা প্রথমে হাসাহাসি করলেও বুঝতে পারল, পরিস্থিতি তাদের পক্ষে নেই। তারা সেদিন চলে গেল।
ঘটনাটা সেখানেই শেষ হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু পুরান ঢাকার গলিতে খবর ছড়াতে সময় লাগে না।
পরদিন চায়ের দোকানে সবাই বলাবলি করতে লাগলো “বাবলু ছেলেগুলারে একা দাঁড় করাইছে!”
“বাবলু এখন কিন্তু অন্যরকম হইছে!”
আর সেদিন থেকেই বাবলুর নতুন নাম হয়ে গেল—
“পাড়ার রংবাজ বাবলু।”
রংবাজি শুরু
নামটা বাবলুর নিজেরও খারাপ লাগল না।
চায়ের দোকানে বসলে সে একটু গম্ভীর হয়ে বসত। কেউ চা চাইলে বলত,
“দে, লিকারটা কড়া হইব।”
বন্ধুরা হাসত।
“কী রে, এখন তুই রংবাজ?”
বাবলু সানগ্লাসটা চোখে দিয়ে বলত,
“পাড়া সামলাইতে গেলে একটু রং তো দেখাতেই হয়!” তবে বাবলুর রংবাজি ছিল অদ্ভুত।
কেউ দোকানদারের সঙ্গে ঝামেলা করলে বাবলু হাজির।কেউ রাস্তায় বৃদ্ধ মানুষকে ধাক্কা দিলে বাবলু হাজির।কেউ ছোট ছেলেপেলেদের ভয় দেখালে বাবলু হাজির।
এমনকি একবার পাশের বাড়ির রহিম চাচার রিকশা চুরি করার চেষ্টা হয়েছিল। বাবলু খবর পেয়ে বন্ধুদের নিয়ে আশপাশে খোঁজ করে চোরটাকে ধরে ফেলে এবং বিষয়টা পুলিশের হাতে তুলে দেয়।
এরপর থেকে এলাকায় একটা কথা চালু হয়ে গেল—
“বাবলুর সঙ্গে লাগিস না। ছেলেটা রংবাজ ঠিকই, কিন্তু অন্যায়ের পক্ষে না।”
আসল পরীক্ষা
কয়েক মাস পর এক রাতে বাবলুর নিজের এলাকাতেই বড় ঝামেলা হলো।
পাশের এলাকার কয়েকজন ছেলে এসে একটা দোকানে ঝামেলা শুরু করল। দোকানদার টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় তারা দোকানের জিনিসপত্র ফেলে দিতে শুরু করল।
বাবলু খবর পেয়ে ছুটে এল।
বন্ধুরা বলল,“আজকে কিন্তু ঝামেলা বড়।”
বাবলু কিছুক্ষণ চুপ করে পরিস্থিতি দেখল।
তারপর পকেট থেকে ফোন বের করে বলল,
“সবাই পিছনে থাক। কেউ হাত তুলবি না।”
একজন বন্ধু অবাক হয়ে বলল,
“কেন?” বাবলু হেসে বলল,
“রংবাজি মানে সবসময় মারামারি না। কখন কোথায় দাঁড়াতে হয়, সেটাই আসল রংবাজি।”
সে স্থানীয় কয়েকজন বড় ভাই, দোকানদার আর পরিচিত মানুষকে ডাকল। পাশাপাশি থানায় খবর দেওয়া হলো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে গেল।
বখাটেরা বুঝে গেল, এবার বিষয়টা আর পাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
একজন যাওয়ার সময় বাবলুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুই অনেক বড় রংবাজ হইছিস!”
বাবলু মুচকি হেসে উত্তর দিল,
“না ভাই। আমি শুধু আমার পাড়াটাকে নিজের মনে করি।”
রংবাজ থেকে আপনজন এরপর বহু বছর কেটে গেছে। বাবলুর মাথায় এখন আর আগের মতো সানগ্লাস থাকে না। চায়ের দোকানে বসে আগের মতো বড় বড় কথাও বলে না।
কিন্তু পাড়ায় নতুন কেউ এলে সবাই তাকে একটা গল্প শোনায়—“এই যে বাবলু দেখতেছিস, একসময় এই লোকরে পাড়ার রংবাজ বলা হইত!”
বাবলু দূর থেকে শুনে হাসে।
একদিন কাশেম চাচা তাকে বললেন,
“তুই জানিস, মানুষ তোকে রংবাজ কেন বলত?”
বাবলু বলল,
“জানি। ভয় পেত।”
কাশেম চাচা মাথা নেড়ে বললেন,
“না। এখন মানুষ তোকে ভয় পায় না। মানুষ তোকে বিশ্বাস করে। এইটাই তোর আসল রংবাজি।”
বাবলু কিছু বলল না।
শুধু গলির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
পুরান ঢাকার সেই সরু গলিতে আজও সন্ধ্যা নামে। চায়ের দোকানে আড্ডা বসে, রিকশার ঘণ্টা বাজে, ছেলেপেলেরা ফুটবল খেলে।
আর গলির এক কোণে বসে থাকা বাবলুকে দেখে কেউ আর ভয় পায় না।
কারণ সবাই জানে—
পাড়ার রংবাজ বাবলু আসলে রং দেখাতে শেখেনি; সে শিখেছে নিজের মানুষের পাশে দাঁড়াতে।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!