প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসহিংসা

গল্প ও উপন্যাস

হিংসা

হিংসা

#একটি ছোট্ট শহরের এক প্রান্তে থাকত এক যুবক। তার নাম ছিল হামজা। খুব ধনী ছিল না, আবার একেবারে দরিদ্রও ছিল না। বাবার রেখে যাওয়া ছোট একটি দোকান ছিল তার। দোকানে কাপড়, সুগন্ধি, টুপি, চাদরসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করত। হামজা ছিল শান্ত স্বভাবের মানুষ। শহরের লোকেরা তাকে পছন্দ করত, কারণ সে কারও সঙ্গে অযথা ঝগড়া করত না এবং ক্রেতা গরিব হলে অনেক সময় লাভ না করেও জিনিস দিয়ে দিত।


বিজ্ঞাপন

কিন্তু সেই শহরেই থাকত আরেক ব্যবসায়ী—রাশেদ। রাশেদের দোকান ছিল হামজার দোকানের ঠিক বিপরীত পাশে। ব্যবসায় সে হামজার চেয়ে অনেক পুরোনো ছিল। প্রথমদিকে দুজনের মধ্যে ভালো সম্পর্কই ছিল। একসঙ্গে বসে চা খেত, বাজারের খবর আলোচনা করত, প্রয়োজনে একে অন্যকে সাহায্যও করত। কিন্তু ধীরে ধীরে রাশেদের মনে একটি অদৃশ্য কষ্ট জন্ম নিল। সে লক্ষ্য করল, তার দোকানে অনেক পুরোনো ক্রেতা থাকা সত্ত্বেও মানুষ হামজার দোকানে বেশি স্বস্তি নিয়ে যায়। কেউ দাম কমানোর জন্য গেলে হামজা হাসিমুখে কথা বলত, গরিব মানুষ এলে তাকে অপমান করত না, আর কখনো কোনো পণ্যের ত্রুটি থাকলে নিজে থেকেই তা জানিয়ে দিত।


রাশেদের মনে হতে লাগল, “আমি এত বছর ধরে ব্যবসা করছি, অথচ এই যুবকটি অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই মানুষের এত ভালোবাসা পেল কীভাবে?”


এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার বদলে তার অন্তরে হিংসা বাড়তে লাগল।

একদিন বাজারে একজন দূর-গ্রামের ব্যবসায়ী এলেন। তিনি হামজার দোকান থেকে বেশ কিছু কাপড় কিনলেন। যাওয়ার সময় বললেন, “তোমার ব্যবহার খুব ভালো লেগেছে। ইনশাআল্লাহ, আবার আসব।”


কথাটি রাশেদের কানে গেল। তার বুকের ভেতর যেন আরও আগুন জ্বলে উঠল।

সেদিন রাতে সে এক বন্ধুকে বলল, “ওকে আমি ব্যবসায় টিকতে দেব না।”

বন্ধু বলল, “কিন্তু সে তো তোমার কোনো ক্ষতি করছে না।”

রাশেদ উত্তর দিল, “ক্ষতি না করলেও ওর কারণে আমার ব্যবসা কমে যাচ্ছে।”

বন্ধুটি বলল, “মানুষ যদি তাকে পছন্দ করে, তার জন্য তো তাকে দোষ দেওয়া যায় না।”

রাশেদ কোনো উত্তর দিল না।


কয়েকদিন পর সে হামজার বিরুদ্ধে বাজারে গুজব ছড়াতে শুরু করল। কারও কাছে বলল, “হামজার কাপড় নাকি নিম্নমানের।” অন্য কাউকে বলল, “সে বাইরে থেকে সস্তা জিনিস এনে ভালো বলে বিক্রি করে।” আবার কারও কাছে এমন কথাও বলল, “ওর হিসাব নাকি ঠিক নেই।”


হামজা প্রথমে এসব কিছুই জানত না। কিন্তু একদিন একজন পুরোনো ক্রেতা এসে বললেন, “ভাই, আপনার বিরুদ্ধে বাজারে কিছু কথা শুনছি। সত্যিই কি আপনার পণ্যের মান খারাপ?”


হামজা অবাক হয়ে গেল।

সে বলল, “আপনি নিজে পণ্য দেখে বিচার করুন। মানুষের কথায় বিশ্বাস করার আগে নিজের চোখে সত্য যাচাই করুন।”


ক্রেতা পণ্য পরীক্ষা করে বললেন, “আমি তো কোনো ত্রুটি দেখছি না।”

হামজা মৃদু হেসে বলল, “তাহলে আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ সত্যকে একদিন প্রকাশ করেন।”


সে কারও নাম নিল না।

কিন্তু কিছুদিন পর গুজব আরও বেড়ে গেল। কয়েকজন ক্রেতা দূরে সরে গেল। হামজার ব্যবসায় ক্ষতি হতে শুরু করল। তার ছোট ভাই বলল, “ভাই, আপনি কি জানেন কে এসব করছে?”


হামজা বলল, “আমি কিছুটা অনুমান করি।”

“তাহলে আপনি চুপ করে আছেন কেন?”

হামজা বলল, “কারণ আমি কারও বিরুদ্ধে এমন কথা বলতে চাই না, যার ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই।”

ভাই বলল, “কিন্তু সে তো আপনার ক্ষতি করছে!”

হামজা উত্তর দিল, “কেউ আমার প্রতি অন্যায় করলেই আমি তার মতো হয়ে যাব—এটা তো হতে পারে না।”


সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হামজার ক্ষতি আরও বাড়ল। একদিন সে জানতে পারল, রাশেদই এসব গুজব ছড়াচ্ছে। খবরটি শুনে তার বুক ভারী হয়ে গেল। কারণ রাশেদ ছিল তার পুরোনো পরিচিত।


সেদিন রাতে হামজা দীর্ঘ সময় ঘুমাতে পারল না। তার মনে রাগ হচ্ছিল। সে ভাবছিল, “আমি যদি চাই, আমিও তার বিরুদ্ধে কথা বলতে পারি। তার ব্যবসার অনেক গোপন বিষয় আমি জানি। আমি যদি সেগুলো মানুষের কাছে বলে দিই, তাহলে তারও ক্ষতি হবে।”


কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার অন্তর বলল, “তুমি কি মানুষের ভুলের জবাব আরেকটি অন্যায় দিয়ে দেবে?”


হামজা উঠে অজু করল। কিছুক্ষণ নফল নামাজ পড়ল। তারপর আল্লাহর কাছে দোয়া করল, “হে আল্লাহ, আপনি আমার অন্তরকে হিংসা ও প্রতিশোধের আগুন থেকে রক্ষা করুন। আমার অধিকার আপনি জানেন। আমি অন্যায়ের শিকার হলে আমাকে ধৈর্য দিন, আর যে আমার প্রতি অন্যায় করেছে তাকে সঠিক পথ দেখান।”


পরদিন সকালে সে দোকানে এসে দেখল, রাশেদ তার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। রাশেদের মুখে অস্বস্তি।


হামজা এগিয়ে গেল।

“কী হয়েছে?”

রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।”

“বলুন।”

রাশেদ নিচু স্বরে বলল, “আমি তোমার বিরুদ্ধে কিছু কথা ছড়িয়েছি।”

হামজা চুপ করে রইল।


রাশেদ বলল, “আমি তোমাকে হিংসা করেছিলাম। তোমার দোকানে মানুষ বেশি আসত, তোমার ব্যবহার সবাই পছন্দ করত। আমি মনে করেছিলাম, তুমি আমার ব্যবসার শত্রু।”


হামজা বলল, “তারপর?”

রাশেদ চোখ নিচু করে বলল, “আমি ভুল করেছি। কিন্তু এখন আমি আরও বড় বিপদে পড়েছি।”

“কী হয়েছে?”

রাশেদ বলল, “গত রাতে আমার গুদামে আগুন লেগেছে। অনেক পণ্য নষ্ট হয়ে গেছে। আমার ওপর ঋণ আছে। আমি বুঝতে পারছি না কী করব।”


হামজা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তার সামনে তখন অদ্ভুত এক সুযোগ ছিল। সে চাইলে বলতে পারত, “এটাই তোমার কাজের ফল।” চাইলে তাকে ফিরিয়ে দিতে পারত। চাইলে বাজারে তার করা অন্যায়ের কথা সবাইকে বলে দিতে পারত।


কিন্তু হামজা তা করল না।

সে বলল, “চলুন, আগে আপনার গুদামটা দেখি।”

রাশেদ অবাক হয়ে তাকাল।

“তুমি আমার সঙ্গে যাবে?”


হামজা বলল, “আপনি আমার প্রতি অন্যায় করেছেন, কিন্তু আপনার বিপদ দেখে আমি আনন্দিত হতে পারি না।”


দুজন গুদামের দিকে গেল।

সেখানে গিয়ে হামজা দেখল, সত্যিই অনেক পণ্য পুড়ে গেছে। রাশেদের কয়েকজন কর্মচারী অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে।


হামজা হিসাব করে দেখল, কিছু পণ্য এখনো উদ্ধার করা সম্ভব। সে নিজের কর্মচারীদের ডাকল এবং বলল, “যেগুলো বাঁচানো যায়, আলাদা করো।”


সারা দিন তারা কাজ করল।

দিন শেষে রাশেদ বলল, “তুমি কেন আমাকে সাহায্য করলে?”

হামজা বলল, “কারণ আমি চাই না, তোমার ভুল তোমার পুরো জীবনকে নষ্ট করে দিক।”

রাশেদের চোখে পানি চলে এল।

“তুমি কি আমাকে ক্ষমা করেছ?”


হামজা কিছুক্ষণ চুপ করে বলল, “ক্ষমা করা সহজ নয়। আমি কষ্ট পেয়েছি। আমার ব্যবসার ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু আমি চাই না সেই কষ্ট আমার হৃদয়ে বিষ হয়ে জমে থাকুক।”


রাশেদ কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি তোমার সঙ্গে যা করেছি, তার কোনো অজুহাত নেই।”


হামজা বলল, “তাহলে আজ থেকে একটি কাজ করুন—মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করুন, কিন্তু মানুষের রিজিকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন না। আপনি ভালো ব্যবসা করুন। আমি ভালো ব্যবসা করব। যার রিজিক যতটুকু, আল্লাহ ততটুকুই দেবেন।”


রাশেদ সেই দিন থেকে বদলে যেতে শুরু করল।

সে বাজারের সামনে দাঁড়িয়ে যাদের কাছে হামজার বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা বলেছিল, তাদের কাছে গিয়ে নিজের ভুল স্বীকার করল। বলল, “আমি অন্যায় করেছি। হামজার পণ্যের বিরুদ্ধে যে কথাগুলো বলেছিলাম, সেগুলোর কোনো সত্যতা ছিল না।”


অনেক মানুষ অবাক হলো।

কারণ ভুল করা মানুষ অনেক আছে, কিন্তু নিজের ভুল সবার সামনে স্বীকার করার সাহস খুব কম মানুষের থাকে।


কয়েক মাস পর রাশেদের ব্যবসা আবার ধীরে ধীরে দাঁড়াতে শুরু করল। এবার সে আর হামজাকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখত না। বরং দুজনের মধ্যে আবার বন্ধুত্ব তৈরি হলো।


একদিন এক যুবক হামজাকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি চাইলে রাশেদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে পারতেন। নেননি কেন?”


হামজা বলল, “প্রতিশোধ নিলে হয়তো আমার রাগ কিছুক্ষণের জন্য শান্ত হতো। কিন্তু একজন মানুষের ভুলকে আরও বড় ভুল দিয়ে জবাব দিলে আমার অন্তর কি সত্যিই শান্ত হতো? আমি চেয়েছি, আল্লাহ আমাকে এমন মানুষ বানান, যে অন্যায়ের শিকার হলেও অন্যায়কারী হয়ে না যায়।”


তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “মনে রেখো, ক্ষমা মানে অন্যায়কে সঠিক বলে মেনে নেওয়া নয়। ক্ষমা মানে হলো—নিজের হাতে প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অন্তরকে প্রতিশোধের দাস না বানানো।”


সেদিন সেই যুবক দীর্ঘ সময় কোনো কথা বলতে পারল না।


গল্পের শিক্ষণীয় বিষয় হলো—মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা যাবে, কিন্তু হিংসা করা যাবে না। কেউ অন্যায় করলে তার অন্যায়ের জবাব একই অন্যায় দিয়ে দেওয়া কোনো মহত্ত্ব নয়। রাগের মুহূর্তে মানুষ অনেক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, কিন্তু শান্ত থাকার পর বুঝতে পারে—কথা দিয়ে যে ক্ষত তৈরি হয়, তা অনেক সময় অস্ত্রের ক্ষতের চেয়েও গভীর। তাই কারও ভুলের কারণে নিজের চরিত্র নষ্ট করা উচিত নয়। ক্ষমা দুর্বলতার লক্ষণ নয়; অনেক সময় ক্ষমা হলো নিজের রাগের ওপর বিজয়। তবে ক্ষমা করার অর্থ এই নয় যে অন্যায়কে চলতে দিতে হবে। প্রয়োজনে অধিকার রক্ষা করতে হবে, সত্য প্রকাশ করতে হবে এবং অন্যায় বন্ধ করতে হবে—কিন্তু অন্তরে প্রতিশোধের আগুন পুষে না রেখে সংশোধনের দরজা খোলা রাখতে হবে। কারণ আমরা জানি না, আজ যে মানুষটি আমাদের কষ্ট দিচ্ছে, কাল সে হয়তো সত্য উপলব্ধি করে আমাদেরই একজন ভালো বন্ধু হয়ে উঠবে। আর সবচেয়ে বড় কথা—মানুষের সঙ্গে আচরণের আসল সৌন্দর্য তখনই প্রকাশ পায়, যখন প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও একজন মানুষ আল্লাহকে ভয় করে নিজেকে সংযত রাখে।

০ মন্তব্য · ৫৩ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!