অম্বা আগুনে ঝাপ দিয়েছেন কিন্তু অম্বার প্রতিশোধের আগুন তখনও নিভে যায়নি। কিন্তু হস্তিনাপুরে আরেক বিপদ ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসছিল।
একটি সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ কখনও শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নির্ধারিত হয় না। কখনও কখনও তার ভাগ্য নির্ধারিত হয় রাজপ্রাসাদের নিঃশব্দ কক্ষে।
কুরুবংশের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। মহারাজ শান্তনুর মৃত্যুর পর প্রথমে চিত্রাঙ্গদ সিংহাসনে বসেছিলেন। কিন্তু অল্প বয়সেই তিনি যুদ্ধে নিহত হন।
তখন কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিচিত্রবীর্য হস্তিনাপুরের রাজা হন।
ভীষ্ম তাঁর প্রতিজ্ঞার কারণে সিংহাসনে বসেননি। তিনি অভিভাবকের মতো রাজ্য পরিচালনা করছিলেন।
আর বিচিত্রবীর্যের জন্য কাশীরাজের দুই কন্যা—
অম্বিকা ও অম্বালিকার সঙ্গে বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল।
(অম্বার কাহিনী তো আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি।)
সবকিছু যেন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছিল।
কুরুবংশের উত্তরাধিকার নিয়ে আর কোনো উদ্বেগ ছিল না। রাজা আছেন, দুই রানি আছেন। ভবিষ্যতে সন্তানও হবে। সাম্রাজ্যের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। কমপক্ষে সবাই তাই ভেবেছিল।
কিন্তু ভাগ্য যেন কুরুবংশকে অন্য পথে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর ছিল। বিচিত্রবীর্য দীর্ঘদিন রাজত্ব করতে পারলেন না। অল্প বয়সেই তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
মহাভারতের বিভিন্ন বর্ণনায় ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে তিনি ভোগবিলাস ও দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে পড়ছিলেন। অবশেষে কোনো সন্তান রেখে যাওয়ার আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করলেন।
এক মুহূর্তে হস্তিনাপুরে নেমে এলো শোকের ছায়া। কিন্তু শোকের চেয়েও ভয়ংকর ছিল একটি প্রশ্ন— এখন কুরুবংশের উত্তরাধিকারী কে?
চিত্রাঙ্গদ নেই।
বিচিত্রবীর্য নেই।
তাঁদের কোনো সন্তানও নেই।
আর যিনি সবচেয়ে যোগ্য— গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম। তিনি নিজের প্রতিজ্ঞার কারণে বিবাহ করতে পারবেন না। সন্তান জন্ম দিতে পারবেন না৷ সিংহাসনও গ্রহণ করবেন না।
সত্যবতী তখন বুঝতে পারলেন, বহু বছর আগে ভীষ্ম যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, তার ভয়ংকর পরিণতি এখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সেই প্রতিজ্ঞা একদিন তাঁকে রানি করেছিল। কিন্তু আজ সেই প্রতিজ্ঞাই কুরুবংশকে উত্তরাধিকারহীন করে তুলেছে।
প্রাসাদের এক নিঃশব্দ রাতে সত্যবতী ভীষ্মকে ডেকে পাঠালেন। তিনি বললেন— "পুত্র, কুরুবংশ ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তোমার প্রতিজ্ঞা মহৎ ছিল। কিন্তু আজ বংশরক্ষার জন্য তোমাকেই কিছু করতে হবে।
ভীষ্ম জানতেন সত্যবতী কী বলতে চাইছেন। তিনি জানতেন, কুরুবংশকে রক্ষা করার সবচেয়ে সহজ উপায় কী। কিন্তু তিনি মাথা নত করে বললেন—
"মাতা, আমি প্রাণ দিতে পারি।কিন্তু প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করতে পারি না।"
সত্যবতী স্তব্ধ হয়ে গেলেন, আবারও সেই প্রতিজ্ঞা আবারও সেই অটল সংকল্প। এখানেই মহাভারতের এক গভীর ট্র্যাজেডি লুকিয়ে আছে।
যে প্রতিজ্ঞা একদিন কুরুবংশকে রক্ষা করেছিল, আজ সেই প্রতিজ্ঞাই কুরুবংশকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
কিন্তু সত্যবতীর কাছে এখনও একটি গোপন পথ খোলা ছিল। একটি গোপন সত্য।
যে সত্যের কথা হস্তিনাপুরের অধিকাংশ মানুষ জানত না।
অনেক বছর আগে, শান্তনুর সঙ্গে বিবাহেরও আগে, সত্যবতীর জীবনে একটি অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল।
মহর্ষি পরাশরের সঙ্গে তাঁর এক পুত্র জন্মেছিল। এক অসাধারণ পুত্র। যিনি অলৌকক ভাবে জন্মের পরই বর হয়ে তপস্যার জন্য চলে গিয়েছিলেন।
সেই পুত্রই ছিলেন—কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস। পরবর্তীকালে যাঁকে আমরা ব্যাসদেব নামে জানি। মহাভারতের রচয়িতা।
সত্যবতী বুঝলেন, হয়তো তিনিই এখন কুরুবংশকে রক্ষা করার শেষ আশ্রয়। কিন্তু কীভাবে?
একজন ঋষি কীভাবে একটি রাজবংশের উত্তরাধিকার সংকট সমাধান করবেন? আর সেই সিদ্ধান্তই বা কেন পরবর্তীকালে জন্ম দেবে তিন ভিন্ন প্রকৃতির তিন সন্তানকে—ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু, এবং বিদুর?
কুরুবংশের ভবিষ্যৎ এখন ঝুলে আছে এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্তের উপর। একটি সিদ্ধান্ত, যা আজকের চোখে অস্বাভাবিক মনে হতে পারে, কিন্তু সেই যুগে ছিল রাজ বংশরক্ষার স্বীকৃত প্রথা।
পরের পর্বে —
ব্যাসদেব এবং ধৃতরাষ্ট্র-পাণ্ডু-বিদুরের জন্মরহস্য । কেন সত্যবতী নিজের পুত্র ব্যাসদেবকে ডেকে পাঠালেন?
কী ছিল সেই নিয়ম ? কেন একই ঋষির মাধ্যমে জন্ম নেওয়া তিন সন্তানের ভাগ্য ও স্বভাব এত ভিন্ন হলো?
চলবে.
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!