প্রথম পাতাগল্প ও উপন্যাসরুমাহ কুপ

গল্প ও উপন্যাস

রুমাহ কুপ

রুমাহ কুপ

ইতিহাসের এমন এক ঘটনা যা এখনো ভাবলে বিষ্মিত হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

একটি ঐতিহাসিক ঘটনা "রূমাহ কূপ" ক্রয়ের ঘটনা। যার নায়ক ইসলামের তৃতীয় খলিফা উসমান ইবনে আফফান (রাঃ)। যা ছিল ইসলামের ইতিহাসের টার্নিং পয়েন্ট। যা ইসলামের কঠিন মুহূর্তে আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত যা উসমান (রাঃ) এর মাধ্যমে করিয়ে নিয়েছিলেন। 

বিজ্ঞাপন


মদিনায় তখন পানির তীব্র সংকট। রাসূলুল্লাহ (সা:) এবং সাহাবিরা যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় আসলেন, তখন সেখানে পানির তীব্র সংকট দেখা দিল। মদিনায় মিষ্টি পানির একমাত্র উৎস ছিল ‘রূমাহ’ নামের একটি কূপ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সেই কূপটির মালিক ছিল একজন সংকীর্ণমনা ইহুদি।


সে কূপের পানি অত্যন্ত চড়া দামে মুসলমানদের কাছে বিক্রি করত। দরিদ্র মুহাজিরদের (যারা মক্কা থেকে সবকিছু ছেড়ে এসেছিলেন) পক্ষে প্রতিদিন চড়া দামে পানি কিনে পান করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।


সাহাবিদের এই কষ্ট দেখে আল্লাহর রাসূল (সা:) ঘোষণা করলেন, 'তোমাদের মধ্যে এমন কেউ কি আছো, যে এই রূমাহ কূপটি কিনে আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফ (দান) করে দেবে? যে এটি করবে, সে জান্নাতে এর চেয়েও উত্তম কূপ লাভ করবে।'


রাসূলুল্লাহ (সা:) এর এই ঘোষণার পর হযরত উসমান (রা:) কালবিলম্ব না করে সেই ইহুদির কাছে গেলেন। তিনি কূপটি একবারে পুরো কিনে নিতে চাইলেন। কিন্তু ইহুদি জানত যে পানি বিক্রি করে তার নিয়মিত বড় অঙ্কের আয় হয়, তাই সে পুরো কূপ বিক্রি করতে রাজি হলো না।


তখন উসমান (রা:) তার সামনে একটি চমৎকার ও লাভজনক ব্যবসায়িক প্রস্তাব রাখলেন। তিনি বললেন, 'ঠিক আছে, তুমি পুরো কূপ বিক্রি কোরো না। অর্ধেক বিক্রি করো। অর্থাৎ, কূপের মালিকানা আমাদের দুজনের মধ্যে ভাগ হবে। একদিন কূপের পুরো পানি তোমার, আর পরের দিন পুরো পানি আমার।'


ইহুদি ভাবল, এটি তো দারুণ প্রস্তাব! সে অর্ধেক মালিকানার বিনিময়ে উসমান (রা:) এর কাছ থেকে ১২,০০০ দিরহাম নিল এবং চুক্তিতে রাজি হলো। সে ভেবেছিল, তার নিজের দিনে সে আগের মতোই চড়া দামে পানি বিক্রি করে লাভবান হতে পারবে।


চুক্তি অনুযায়ী, যেদিন হযরত উসমান (রা:) এর দিন আসত, সেদিন তিনি মদিনার সবার জন্য কূপের পানি সম্পূর্ণ মুক্ত ও ফ্রি করে দিতেন। তিনি ঘোষণা করলেন, আজ যার যত ইচ্ছা পানি নিয়ে যাও, এক টাকাও দিতে হবে না।


মদিনার মুসলিম, অমুসলিম ও দরিদ্র সাধারণ মানুষ হযরত উসমান (রা:) এর দিনে এসে লাইন ধরে তাদের পাত্র ভরে পানি নিয়ে যেত। তারা উসমান (রা:) এর দিনে এত বেশি পানি সংগ্রহ করে রাখত যে, পরের দিন ইহুদির দিনে আর কারো পানি কেনার প্রয়োজন হতো না।


পর পর কয়েকবার এমন হওয়ার পর ইহুদি দেখল যে, তার দিনে পানি কেনার জন্য আর একজন মানুষও আসছে না। তার ব্যবসার পুরো বারোটা বেজে গেল! সে বুঝতে পারল উসমান (রা:) এর বুদ্ধিমত্তার কাছে সে হেরে গেছে।


উপায় না দেখে ইহুদি নিজেই উসমান (রা:) এর কাছে এসে বাকি অর্ধেক কূপও কিনে নেওয়ার অনুরোধ করল। হযরত উসমান (রা:) তখন আরও ৮,০০০ দিরহাম দিয়ে কূপের বাকি অর্ধেক অংশও কিনে নিলেন। মোট ২০,০০০ দিরহাম খরচ করে তিনি কূপটি চিরদিনের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মানবজাতির জন্য উন্মুক্ত করে দিলেন।" ( বুখারী, তিরমিজি, নাসাঈ, ইবনে শাব্বাহ)

*

উসমান (রা:) এর এই দান আজও বন্ধ হয়নি! শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেই কূপের চারপাশের জমিতে খেজুরের বাগান গড়ে ওঠে। অটোমান সাম্রাজ্যের আমলে এবং পরবর্তীতে বর্তমান সৌদি সরকারের শাসনামলে এই বাগান রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।


বর্তমানে এই বাগানে হাজার হাজার খেজুর গাছ রয়েছে। এই বাগান থেকে উৎপাদিত খেজুর বিক্রি করে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় হয়, তা উসমান (রা:) এর নামে মদিনার একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়। সেই টাকা দিয়ে মদিনার দরিদ্রদের সাহায্য করা হয়, বিভিন্ন দাতব্য কাজ করা হয় এবং মদিনার হারামের কাছে উসমান (রা:) এর নামে একটি বিশাল হোটেল ও বাণিজ্যিক ভবনও তৈরি করা হয়েছে।


ইসলামের ইতিহাসে একে বলা হয় "সদকা-এ-জারিয়া" বা প্রবাহমান দান, যা মানুষকে আজও সমানভাবে অনুপ্রাণিত করছে যা চলতে থাকবে কিয়ামত পর্যন্ত...।

০ মন্তব্য · ৭৭ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!